স্বপ্ন অথবা স্বপ্ন

আশরাফ জুয়েল



‘নায়ক এক তরুণ ব্যবসায়ী, বিবাহেচ্ছু, কিন্তু বৃদ্ধ পিতা তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে- পিতা দ্বারা পরিত্যাজ্য তরুণ একেই মৃত্যুদণ্ডের রায় হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে নিজে নিজেই সেই রায় বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সাঁকো থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।’ কোন এক গল্পে পড়েছিলো শায়ন, গল্পের পরের অংশটুকু আর মনে আসছে না, আগের টুকুও না, হয়ত এটুকুও মনে আসত না, যদি না গতরাতের স্বপ্নটা শায়নকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলত, ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেই ক্ষ্যান্ত হয়নি বরং পুরোটা রাত আর ঘুমাতেই দ্যায়নি। অথচ গল্পের অংশটির সাথে স্বপ্নটার বিষয়বস্তুর কোন সংযোগ বা সাযুজ্য নেই।
সারাটা দিন ঘুরে ফিরে স্বপ্নটা কোনভাবেই মুক্তি দ্যায়নি শায়নকে, অফিসের কাজের ফাঁকে, মিটিং চলাকালীন সময়ে - ইনফ্যাক্ট গত সাতাশটা ঘণ্টা গতরাতের স্বপ্নের বিষয়বস্তুকে তার চিন্তার বাজার থেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি শায়ন। এমন এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য কিভাবে স্বপ্নে আসে? আসলোই যদি, এমনভাবে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেই বা ক্যানো? এমন এক তীর ভাঙা জোয়ারের ঢেউ, এমন এক অশুভ শক্তির তাড়নায় ভাসিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে শায়নকে, শায়ন নিজেকে গহীন সমুদ্রের খাপ ছাড়া বিশাল কোন বরফখণ্ড ভাবছে, যেন সেই বরফখণ্ডের ভেতরে বসে আছে বিচ্ছিন্ন অন্তঃস্রোত।
এই স্বপ্নের মানে কী হতে পারে? এখন রাত সাড়ে চারটা, শায়নকে আজকেও ঘুমাতে দ্যায়নি গতরাতের সেই স্বপ্ন। ঘুমুতে দ্যায়নি কথাটা ঠিক না, আসলে শায়নই ঘুমানোর চেষ্টায় করেনি, যদি স্বপ্নটা আজ আবার আসে?
- ‘ হ্যালো,হ্যালো,হ্যা-লো দোস্তো অনেক রাতে ফোন দিলাম তোমাকে। তুমি ঘুমাচ্ছিলে? তাহলে রেখে দেই, কাল আবার কল দেবো, না যখন এতো রাতে ফোন দিয়েইছি তাহলে বলে ফেলি দোস্ত?’ হাতের সেলফোনটা নিয়ে সুমিতের নাম্বারগুলোতে ছোঁয়া দ্যায় শায়ন। উত্তরের প্রত্যাশা না করেই কলটা কেটে দ্যায় সে, খামোখা এতো রাতে মানুষকে পেইন দিয়ে কী লাভ?
একটা সিগারেট ধরায়, টান দিতে ভুলে যায় সিগারেটে, এর মধ্যে সিগারেটটা নিভে গেছে, নিভে যাওয়া সিগারেটটাকে দুই আঙুলের ফাঁকে ধরে রাখে শায়ন, অনিচ্ছার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সে, কোন এক অজানা ঢেউ তার বর্তমানকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। তার ঘুম প্রয়োজন। এতো রাতে সহজে ঘুম আসবে না, উপায়? হ্যাঁ, শাওয়ার নেয়া যেতে পারে। বিছানায় এলিয়ে পড়ে সে, কিন্তু ঘুমানোর সমস্ত প্রচেষ্টা বিফলে যায়, ঘুম কী তাহলে আর ধরা দেবে না? সাধারণত ঘুমের ঔষুধ খাওয়া লাগে না তার, কিন্তু গত দুইরাত থেকে সে ঘুমায় নি, আজ তাকে ঘুমাতেই হবে, সবকাজ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, কত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফাইলে চাপা পড়ে আছে, তার বিজনেসের খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। প্রপোজালটা প্লেস না করলে অর্ডারটা মিস হয়ে যেতে পারে। খুব লস হয়ে যাবে তাহলে, একবার গ্রামের বাড়ি যাওয়াও খুব প্রয়োজন। না এভাবে আর নয়, আগামীকাল ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে, এভাবে চলতে থাকলে তো নিজেকে বাঁচানোই মুশকিল হয়ে যাবে! গত তিন দিন কোন ঘুম নাই, অসম্ভব, না মোটেও সম্ভব না। কিন্তু স্বপ্নটা যদি ফিরে আসে?
গত তিনদিন সাবা ফোন ধরেও না, ফোন করেও না- এমনতো হবার কথা নয়, গত সাত বছরে এমনটা হয়নি যে, সাবা তাকে পরপর দুইদিন ফোন করেনি। আগামী উইকে তাদের বিয়ে, মানে তারা নিজেরাই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই অনুযায়ী দুইজনের পরিবার সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছে, যেন বিয়ের আয়োজনে কোনধরনের কোন ত্রুটি না থাকে। কয়েকবার ফোন দিয়েও পাইনি সাবাকে, সাবা ফোন বন্ধ রেখেছে? না হতেই পারে না। তাহলে? কী মুশকিল? বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন কথা ছিল সাবার সাথে। হয়ত কাজিনরা সব এসেছে, নিশ্চয় তাদের নিয়েই ব্যস্ত আছে। আচ্ছা থাক, কয়েকটা দিন নিজের মত করে কাটাক না। সারাজীবনের জন্য তো সে শায়নের জীবনেই চলেই আসছে।
ঘুমটা খুব প্রয়োজন, পরপর তিনদিন না ঘুমানোর ফলে চেহারার বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা, চোখের নীচে কালো দাগ পড়ে গেছে। কাল ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে। সিজারকে আগামীকাল জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে কোন ডাক্তারের কাছে যাওয়া যায়।
শায়ন কাজ পাগল ছেলে, অল্প বয়সেই ব্যবসায় খুব ভালো করেছে। এই জন্যই কিনা মাঝে মাঝে অন্য বন্ধুদের ঈর্ষার কারন হয়েও দাঁড়ায় সে। না সেগুলো কোন প্রবলেম না, সেগুলো শায়ন ঠিক সামলে নেবে? কিন্তু সবগণ্ডগোল পাকিয়েছে সেই রাতের সেই স্বপ্নটা? কোনভাবেই স্বপ্নটাকে মন থেকে তাড়ানো যাচ্ছে না। এমন চলতে থাকলে তো সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে। নাহ এভাবে চলতে দেয়া যায় না, আগামীকাল সাবা’র সাথে একবার দেখা করতেই হবে। তার আগে সাইকিয়াট্রিস্ট? না ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বরং ভাল।
প্রফেসর ডঃ নাহার। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট। নিজের ফ্লাটেই কাউন্সিলিং করে থাকেন তিনি। সাধারণত প্রত্যেক ক্লায়েন্টরা ফোন করে এপয়েন্টমেন্টের টাইমটা শুনে নেন, নিদৃষ্ট সময় অনুযায়ী ক্ল্যায়েন্ট আসে। কার কাছে যেন শুনেছিল ডঃ নাহারের কথা? বেইলি রোডের গ্রিন টাওয়ারে ডঃ নাহারের বাসা, মানে বাসা কাম চেম্বার। প্রায় একচল্লিশ মিনিট ধরে শায়নের কথাগুলো শুনলেন ডঃ নাহার, শুনলেন মানে বলিয়ে নিলেন, শায়নকে দিয়ে, শায়নের মনে হলো শায়ন না, শায়নের ভেতর থেকে অন্য কেউ একজন বেরিয়ে এসে কথাগুলো বলছে।
- শায়ন, আপনি একা এসেছেন? আপনার সাথে আর কেউ আসেনি? একদৃষ্টিতে শায়নের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলেন প্রফেসর ডঃ নাহার শামশাদ জাহান।
- কী হয়ছে আমার? আমি ক্যানো হাসপাতালে এডমিশন নিতে যাবো? কী বলছেন আপনি? আমি আপনার কাছে একটা পরামর্শ নিতে এলাম! ইম্পসিবল, কী বলছেন আপনি? একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গ্যালো শায়ন।
- গত কয়েকদিন ধরে আপনার সাথে যা কিছু ঘটছে তা স্বপ্ন নয় মিস্টার শায়ন, এগুলো সব সত্য। এগুলো বাস্তবেই ঘটেছে। আপনার মনে হচ্ছে আপনি স্বপ্নে দেখেছেন।
- ডঃ নাহার, হ্যাঁ সেই রাতে সাবা আর নাফিসকে আমি আমার ফ্ল্যাটে খুব ঘনিষ্ঠভাবে দেখে ফেলেছিলাম, ঘনিষ্ঠ মানে, মানে ওরা, মানে ওরা, আই মিন দে হ্যাভ এন... আপনিই বলুন, এটা এনে নেয়া যায়, আগামী সপ্তাহেই আমার আর সাবার বিয়ে, গত সাত বছরের সম্পর্ক। হ্যাঁ, আমি ভয়ানক রেগে গিয়েছিলাম, রাগে প্রায় অন্ধ হয়ে গেছিলাম, হবো নাই বা কেন? ডু ইউ নো, ওরা ওরা, মানে, দে আর মেইনটেনিং এন ইল্লিগ্যাল ফিজিক্যাল রিলেশন! আমি, আমি ... সাবা? সাবা! তারপরেই আমি ব্যাপারটা স্বপ্নে দেখি। আমি আপনাকে যা কিছু বললাম, তার পুরোটাই খুলে বলেছি, তারপর থেকেই তো আমার ঘুম উধাও, আমি কার সাথে কথা বলতে পারছি না, ক্যানো যেন মনে হচ্ছে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছি, এই জন্যই তো আপনার কাছে আসা, ইউ নো আগামী সপ্তাহে আমার আর সাবা বিয়ে। না এটা হতেই পারে না, কিছুতেই না। না, কিছুতেই এটা হতে পারে না, আমিতো ব্যাপারটা স্বপ্নে দেখেছিলাম মাত্র। আমি ক্যানো সাবাকে খুন করতে যাবো...