স্বপ্নের অন্ধকার, স্বপ্নের আলো

প্রবুদ্ধ ঘোষ



স্বপ্নের ভিতরে আরো স্বপ্নের পথ খুলে গেলে সময় যা খুশি তাই হয়ে ওঠে। এমনকি, চেনা ইতিহাসের পলেস্তারা খসিয়ে, রঙ চটিয়ে অন্যতর গল্প খুঁড়ে তোলা যায়। কোনো এক ভূমিদাস চাষী রোদজ্বলা নোনা দুপুরের ক্লান্ত তন্দ্রায় দেখে নেয় জোতদারের জমি দখলের স্বপ্ন। কোনো এক পিচগলা রাস্তার রোডরোলার চালক রাতঘুমের গভীরে দেখে রোডরোলারে তার পাশে রঙ্গিন ওড়না উড়িয়ে বসে আছে আকাঙ্খিত প্রেমিকা। কোনো এক অবাধ্য তরুণ বহুরাত না-ঘুমানোর পরে হঠাৎ ঘুমানো আচমকা সন্ধ্যের স্বপ্নে দেখে বারাসাতের শহীদবেদী ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে আট তরুণ, বরানগরের গঙ্গা থেকে উঠে আসছে তিনশো যুবক আর শহর ফেটে পড়ছে কৃষ্ণচূড়ার আভায়। স্বপ্নের মধ্যে এক অবাধ্য রোম্যান্টিকতা আছে। কিছুতেই সেখানে ইচ্ছেমতো ক্রিয়া করা যাচ্ছে না অথচ ইচ্ছের মধ্যেই স্বপ্নের গতিপথ। স্বপ্নের রোম্যান্টিকতা অমোঘবাস্তবে ডানাভাঙ্গা পাখির মতো আছড়ে পড়তে পড়তেও ফিনিক্সের মিথ্‌ মনে পড়ে যাবে; পরের স্বপ্নে থেকে যাবে সেই রেশ। আর, কোনো বাস্তবও দমকা খুশিতে স্বপ্ন হয়ে যাবে এবং স্বপ্নেরা বাস্তব। স্বপ্নের ভিতরে ভিতরে আরো স্বপ্নের অনিয়ন্ত্রিত পথ খুলে গেলে, আর ঘুমিয়ে থাকা যায় না...

সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশে মারা গেল যে ৬ কৃষক, বহু মাস ধরে রাজধানীতে ভুখা-নাঙ্গা প্রতিবাদ করছে যে তামিল কৃষকেরা, বিদর্ভে কান পাতলে অনাহারে মৃত যেসব চাষীদের নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া যায়, তারা চ্যারকেটুর মতো জ্যোৎস্নারাতে সমস্ত অনাহার পেটে নিয়ে ফসলভরা মাঠে দাপিয়ে বেড়ায়। ‘চ্যারকেটু এখন দীর্ঘতর ক্ষুধার দিকে চলে যেতে পারে’ বলে যে স্বপ্নবাস্তবের চাবুকের দাগ পাঠকের পাঠচেতনায় রেখে যান লেখক, তা কিছুতেই মোছা যায় না। বেঙ্গু আর বৈশাখু, পাঁচ ও সাত বছরের নেহাতই দুই ভাতের ফ্যান গিলে অথবা স্রেফ জল গিলে বেঁচে থাকা বাচ্চা, স্বপ্নের ভিতরে ভিতরে নিজস্ব ক্ষিধের পথ এঁকে নেয়। পেটে তিনদিনের বাসি ক্ষিধে নিয়ে, ধানের দুধ শক্ত না-হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা নিয়ে তারা কী অকপটে স্বপ্নের গল্প বানিয়ে নেয়। তারা দুধের গল্প বলে, ভাতের গল্প বলে। সেই দুধ আর গরম ভাতের গল্পে তারা সকাল থেকে সন্ধ্যে কাবার ক’রে দেয়। গল্পের সুতোয় সুতোয় খাওয়ার গল্প তাদের পরিণত ক’রে তোলে। এত নিঁখুত ভাতের গন্ধ আঁকতে নৈপুণ্য লাগে। অথচ, ভাত আর দুধ আর খাবার এসবই বেঙ্গু-বৈশাখুর স্বপ্নের সারজল, বাস্তবে ক্ষিধে।
তমিজের বাপের খোয়াবে মুনসির শাসন। তমিজের খোয়াবে তেভাগা। আর, তমিজের বেটির খোয়াবে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া মাঠ-আকাশ সবই ভাতের মতো সেদ্ধ হতে থাকে। খোয়াবের আরো কিছু লৌকিকতা থাকে। ইসমাইল যেমন দেশভাগের আগে তার ভোটারদের খোয়াব দেখাত ভাগচাষীদের মধ্যে জমি বিলি করে দেওয়ার। কেরামত তার বানিয়ে তোলা গানে খোয়াবের স্বতঃস্ফূর্ত আখরমালা, সুর চাইত। তার গানবাঁধায় ঢুকে পড়ত তেভাগা, হিন্দু-মুসলিম মিলনের মায়াবী ভোর। কিন্তু, সেই খোয়াব ভেঙ্গে গেল মুসলিম লিগের আদেশে। সে শুধু তারপর চেরাগ আলির হিজিবিজি বইয়ের পাতা থেকে, কুলসুমের আগুন-মুখ থেকে শব্দমালা খুঁজত। পেত কই? বৈকুণ্ঠ তো মরবার মুহূর্তেও খোয়াবে বুঁদ হয়ে ছিল। তার খোয়াব জুড়ে মা-এর মতো কুলসুম, তার খোয়াব জুড়ে ভবানী পাঠক আর মজনু শাহের যুগলবন্দী লড়াই। সেসবই তো ঝুরঝুর ক’রে ঝরে পড়ল নায়েব পূর্ণ চক্রবর্তীর মতো লোকেদের হিন্দুয়ানির জাত্যাভিমানে। এই যে কত কত নিম্নবিত্ত মুসলিম চাষী, মজুরের খোয়াব ছিল যে, মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান হলেই সব শোষণ বিলুপ্ত হবে, সামাজিক স্তরবিভাগ থাকবে না আর- সেইসব খোয়াব তো ভেঙ্গেচুরে গেল পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রে। রাষ্ট্রের নাম বদলে গেলেও শোষণকাঠামো তো একই রইল, ইংরেজদের বদলে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হল স্থানীয় জোতদার, মুৎসুদ্দিদের হাতে। খোয়াবেরও নিজস্ব দুঃখকথন আছে। কোনো কোনো খোয়াব সম্মিলিত কথন হয়ে হয়ে ওঠে। কোনো খোয়াব লৌকিক থেকে অলৌকিক হয়ে যায় আবার কোনো খোয়াব অলৌকিকের শিহরণ-বাধা পেরিয়ে প্রাণপণে লোকায়ত ছুঁতে চায়। খোয়াবের নিজস্ব অধিকার আছে। খোয়াব অধিকার ক’রে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। খোয়াব মরে না।
রণজয়ের সেই স্বপ্ন-রাইফেল। দু’দশক পেছনে ফেলে, বিশ্বময় আর্থ-সামাজিক বাঁকবদলের হুল্লোড়কে অস্বীকার ক’রে সেই যে রাইফেল খুঁজে চলা? একটা রাইফেল খুঁজতে পাগলখানা থেকে পালানো; আর, জেনে যাওয়া যে, সমাজটাই নতুন পাগলখানা হয়ে গেছে। স্বপ্নবাস্তবের ঘোরে রণজয় এসে দাঁড়াচ্ছে লেনিনমূর্তির সামনে। তখন আর মূর্তি নয়, জীবন্ত লেনিনের সঙ্গে কথোপকথন; হেরে না-যাওয়ার আশ্বাস। তখন তো স্বপ্নের রাইফেলের ওপরে রিয়্যাল এস্টেট আর মতাদর্শের টুঁটি টিপে সিপিএম সরকার। কিন্তু একবার যে মুক্তির আদর্শে আকণ্ঠ বিশ্বাস রেখেছে, একবার যে জেনে গেছে কোন পথে আলো জ্বেলে ক্রমমুক্তি হবে, সে কি আর থেমে থাকতে পারে? তাই রাষ্ট্র আর তার প্রতিনিধিরা ইন্টেরোগেশন্‌ রুমে, অন্ধকারের তলানিতে নেমে, প্রকাশ্য ময়দানে স্বপ্নদর্শীদের বুলেটে বিঁধে দিতে চায়। তাদেরকে পাঠ দেয় দেয় সরকারি মগজধোলাইখানার সংস্কৃতির। স্বপ্ন মুছে দেওয়ার জাঁকালো বন্দোবস্ত। তবু, রাষ্ট্রের প্রতিভূ পুলিশ অফিসার বসাকের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়েই থেকে যায় স্বপ্ন ছুঁতে চাওয়া রণজয়রা। স্বপ্ন কি কখনো মরে? ‘স্বপ্ন এবং স্বপ্নদর্শীকে একসাথে হত্যা করা যায় না’- এই ক্রান্তদর্শী উচ্চারণের জন্যই স্বপ্নের শেষ হয় না। ঘুম ভেঙ্গে যায় বাস্তব আসে বাস্তব ভেঙ্গে ফেলে ঘুম আসে; তবু, প্রতিটা স্তরেই শুধু বোধ নয় কোনো এক স্বপ্নও খেলা করে। স্বপ্নেরও উত্তরাধিকার থেকে যায় যে!

যুদ্ধবাতাসে বিক্ষিপ্ত ফুটে আছে গোলাপ। বেঁচে আছে, ভাল নেই। আর, কিছু লগ্নবাতাস। আখর ফুটেছে। আমি তো চাইবই, স্বপ্ন আসুক। ভয়ের দিন পিছু হেঁটে ফিরে যাক। সাইরেন হয়ে যাক প্রেমজ বন্দিশ। মেধযজ্ঞ থেমে গিয়ে রক্তগোলাপের দিন গাঢ় হোক। দিনরাত বরফের মরা শীত গলে গলে সারজল পাক বিক্ষিপ্ত গোলাপ। তার মায়াগন্ধী এলোচুলের মতই ছড়িয়ে পড়ুক গোলাপেরা। যুদ্ধের মুখোমুখি, হাওয়ার সতেজ শরীরে আর স্পর্ধার ফিনিক্স-হৃদয়ে মাথা উঁচু ক’রে থাকুক গোলাপজঙ্গল। এইটুকু স্বপ্নই... স্বপ্নের ভিতরে আরো স্বপ্নের পথ, বানানো বাস্তবকে প্রত্যাখ্যানের পথ আরো গভীরে চারিয়ে গেলে স্বপ্নদর্শী জেগে ওঠে। বাস্তবের দহনকালীন সাঁকো পেরোয় স্বপ্ন। আর, স্বপ্ন চোখে নিয়েই সে জেগে থাকে।