ক্বীন ব্রীজে বৃষ্টি নামলো যখন

হাসান আহমদ



~ ~
‘ডাক্তার দেখাইছো?’ মোবাইলের ম্যাসেঞ্জারে শব্দ করে ভেসে উঠলো জুনিয়ার মেসেজ।
‘হ্যাঁ, এইতো। বেরুলাম মাত্র'। আমি চৌহাট্রা থেকে রিকশায় বসে লিখলাম।
‘কি বলেছে ডাক্তার?’ বাক্যের শেষে অনেকগুলো ইন্টারোগেশন দিয়ে উদ্বেগ ও কৌতূহল প্রকাশ করলো জুনিয়া।
‘তেমন কিছু বলে নাই। ওষুধ আর ড্রপ দিছে। আগেরগুলা খাইতে নিষেধ করছে। আর জানতে চাইছে আগে কখনো চশমা ইউজ করছি কিনা’। আমি জুনিয়ার উদ্বেগ ও কৌতূহল নিবৃত্ত করতে চেয়ে সাথে একটা সিলি ইমোটিকন দিই।
‘তোমার চশমাটা তো বাইকের চাকার নিচে পরে ভেঙ্গে গেছিলো, না?’ জুনিয়া লিখে চলল, ‘ওইযে, ভার্ড থেকে নিছিলা যে। পরে তো আর নিলা না। কত কইলাম নিতে!’
আমি বুঝলাম যে, তাঁর মেসেজের শেষ বাক্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যে পুনরায় চশমা নেওয়ার জন্য বারবার তাগাদা দেওয়া স্বত্বেও কেন নিলাম না, সেজন্য হালকা অনুযোগ ও হতাশা মিশ্রিত তাচ্ছিল্য ঝরে পড়ছে।
‘ভাল হয়ে গেছেগা মনে কইরা তো আর নেই নাই’। আমিও ক্ষোভ ঝাড়লাম। সাথে একটা এ্যাংরি ইমোটিকন দিলাম। ‘তাছাড়া চশমা দিয়া দুনিয়া দেখতে আমার ভাল্লাগেনা। তুমি জানো’।
‘সেতো ভাল্লাগবেনা জানি। চউখ দুইটা গেলে তো পরে বুঝবা। এখন তো বুঝবানা’।
‘তাতো বুঝবোই। যাওয়ার আগে তো আর কেউ কাউকে বোঝে না! গেলে পরে সবাই সবকিছু বোঝে’।
‘তোমার এখন বোঝা উচিৎ। তুমি এখন একা না। তোমার একটা মেয়ে আছে। আমি আছি’। শান্ত সমাহিত বাক্যে আমাকে জীবনের গুরুত্ব বোঝাতে চাইলো সে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো আছো। সে তো থাকবা। মেয়েটা কি করতেছে?’
‘ঘুমাচ্ছে আর দুদু খাচ্ছে’।
‘ঠিক আছে ওরে দুদু দ্যাও। পরে কথা বলি। খুব খিদা পাইছে'।
‘জিন্দাবাজার নেমে কিছু খেয়ে বাসায় চলে যাও’।
‘জিন্দাবাজার নামা হচ্ছে না ’। খানিকটা ভেবে আমি লিখলাম, ‘ক্বীন ব্রীজের নিচে অপু ওয়েট করতেছে। ওর সঙ্গে দেখা করবো। একসাথে খাবো’।
‘দেরি কইরো না। তাড়াতাড়ি চলে যেও। পরে গাড়ি পাবানা’।
‘ঠিকাছে। বাবার চুমুগুলো মেয়েটাকে দিও’।
‘আচ্ছা। বাই’।
‘বাই’।

রিকশা জল্লারপাড় রোডে ঢুকতেই যেন হঠাৎ করে শহরে একটা বিষণ্ণতা-জনিত-অন্ধকার নেমে এলো। সেইসাথে সড়কবাত্তি আর নিয়ন সাইনগুলোর একটা দাউদাউ করা হাহাকার। আর সব সময়ের মতোই একটা মাঝারি মানের ব্যস্ত শহরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে যেমন মনে হয়- বেড়ানো, কেনাকাটা, সান্ধ্যভ্রমন, প্রেম অথবা কফিপানের জন্য উৎকৃষ্ট একটা মুহূর্ত নিয়ে এসেছে এই সন্ধ্যা- তেমন নয়। এই সন্ধ্যাটা যেন এসবের থেকে কোথাও একটু অন্যরকম, একটু অচেনা। যেন একটা কৃত্রিম ও স্বঘোষিত বিষণ্ণতা যা আমি নিজে জোর করে আরোপ করে দিয়েছি এই শহরের ওপর। আর সে তাঁর অভাবনীয় রকমের বিশৃঙ্খলা ও হতাশার ভেতর দিয়ে টেনে নিয়ে চলেছে ক্লান্ত, ক্ষুৎকাতর ও বিবমিষাগ্রস্ত আমাকে।

চোখে ইউভিআইটিস এর সংক্রমন তো আমি ইচ্ছে করে ডেকে আনিনি। তবু আমাকেই এর দায়ভার গ্রহন করতেই হয়। সতর্কতার সঙ্গে আমাকে বারবার স্মরন করিয়ে দেয়া হয় যে, 'তুমি এখন আর একা নও। তোমার একটা মেয়ে আছে। আমি আছি'।

হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো আছো। সে তো থাকবেই। কোথাও পালিয়ে যাচ্ছোনা নিশ্চয়ই।

রিকশা গুলশান হোটেলের ডানপাশ দিয়ে ঘুরে ক্বীন ব্রিজের মুখে প্রবেশ করতেই বাতাসে চিংড়ি মাছ ফ্রাইয়ের গন্ধ ভেসে এল। এরকম গন্ধ শুধু সমুদ্র সৈকতের চিংড়ি ও কাঁকড়া ফ্রাইয়ের দোকানগুলো থেকে ভেসে এসে পর্যটকদের নাকে লেগে বীয়ার পানের তৃষ্ণা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমি রিকশা ভাড়া মিটিয়ে চিংড়ি ফ্রাইয়ের উৎস বের করতে গিয়ে দেখলাম যে একটা ভ্রাম্যমান ভ্যানগাড়ির মধ্যে মসুর ডালের পুরের সঙ্গে চুড়ান্ত রকমের ছোট সাইজের দেশীয় চিংড়ি মিশিয়ে গরম তেলের মধ্যে ফ্রাই করা হচ্ছে! ভগ্নস্বাস্থের গালভাঙ্গা ও চক্ষু কোটরাগত দোকানি যুবক লোকটা ভাটি অঞ্চলের ভাষায় কথা বলছে। অকাল বন্যায় হাওরে তাঁর জমির সব ধান তলিয়ে গেছে কিনা কে জানে? পাশে তাঁর পাঁচ ছয় বছরের শিশুপুত্র কাস্টমার ব্যাবস্থাপনার কাজে ব্যস্ত।
কত করে?
পাঁচ টাকা।
দুইটা দ্যাও।
আলুর চপ দেব?
হ্যাঁ, দুইটা।
পিয়াজু দেব?
না।
চিংড়ির চপটা খুবই শক্ত, কিন্তু স্বাদটা অতুলনীয়। হালকা বিটলবনের মিশ্রণ আর বিলাতি ধনেপাতার গন্ধ দাঁতের শ্রমটাকে স্বার্থক করেছে। ব্রিজের নিচের বামপাশের পথ ধরে পথচারীদের ব্যস্ততা ঠেলে, মাতাল আর নৈশ ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে সদ্য অবস্থান নেওয়া বেশ্যাদের বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি ভরা জটলা পেছনে রেখে, চিংড়ি চপ খেতে খেতে সুরমার তীরে আমাদের পূর্ব নির্ধারিত চা দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম। অপু আসেনি। সচরাচর আমরা যে দুটো চেয়ারে বসতাম, সেখানে দুটো মেয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে আড্ডা দিচ্ছে। অন্য চেয়ারগুলোও খালি নেই। অন্যান্য দোকানগুলোর সামনেও প্রচন্ড ভীড়। নিজেকে আলতো করে সেধিয়ে দেওয়ার মত একটু শূন্যস্থান কোথাও নেই। নদীর তীরে বাঁধানো স্টীলের রেলিঙের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে হাতে খাবারের ঠোঙ্গাটা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষন পর দেখা গেল, নদীর ওপার থেকে খেয়ানৌকা পার হয়ে শেখঘাটের দিকের রাস্তা ধরে অপু এগিয়ে আসছে। অপুর চেহারা খুবই বিধ্বস্ত। হাঁটার সময় পা দুটো একটা আরেকটার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাঁর সুদর্শন শারীরিক গঠন ও নিরীহ চেহারার সঙ্গে একদম বেমানান। আগে কখনো তাঁকে এভাবে এমন বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখা যায়নি।

আমি হাত তুলতেই অপু কাছে এসে আমার পাশে দাঁড়ালো। আমরা মৃদু হাসলাম। আমাদের মুখের অগ্রভাগে জমা হওয়া সাক্ষাৎকার পর্বের প্রাথমিক অভিব্যাক্তিগুলো অনুচ্চারিত থেকে গেল। শুধু হাত দিয়ে আমরা একে অন্যের কাঁধ স্পর্শ করলাম। আর এই সামান্য স্পর্শটুকুর মাধ্যমেই আমাদের ভেতরে কেমন একটা বিদ্যুৎ তাড়িত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো। আমি উপলব্ধি করলাম, একটা গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ আলিঙ্গনও সম্ভবত কারো শরীর ও মনে এমন উত্তেজনাপূর্ণ অনুরণন ছড়িয়ে দিতে অপারগ। আমি ঘুরে হাত দুটো জড়ো করে রেলিঙের ওপর রেখে থুতনিটা তার ওপর ঠেকিয়ে নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়ালাম। নদীর ওপারটা এপারের তুলনায় বড় বেশি অনুজ্জ্বল, ম্লান। আর এপারের পুরোটা জুড়েই বাহারি আলোর আধিক্য। যে কোনো শহুরে নদীর পক্ষে সন্ধ্যার অব্যাবহিত পরের এই মুহুর্তটা খুবই মনোরম। পাথরে বাঁধাই করা ঝকঝকে তীর, তীরের চত্বর ও সংলগ্ন বুলভার্দ এর কালো এ্যাস্ফল্ট জুড়ে মানুষের মুখর পদচারনা। ওপরে আলো ঝলমলে শতাব্দী প্রাচীন ধণুকাকৃতির লোহার ব্রীজের ওপর থেকে ভেসে আসছে মানুষ ও যানবাহনের ব্যস্ততা- রিকশার ঘন্টা, সিএঞ্জির হর্ন, ট্র্যাফিকের বাঁশি। পাশের সারদা হল থেকে ভেসে আসছে রাধারমন দত্তের গান। নদীতে যাত্রীর অপেক্ষায় ছেড়ে যাবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে লাল নীল আলো সজ্জিত ছোটখাটো একটা ক্রুজ শিপ রেস্তোরাঁ। ওপরে সন্ধ্যার মেঘমন্দ্রিত আকাশ ও ঠান্ডা হাওয়ার পটভূমি জুড়ে রচিত হচ্ছে বৃষ্টির কূটাভাস।

ঠোঙ্গাটা অপুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, 'তোমার জন্য চিংড়ি মাছের বড়া আর আলুর চপ নিয়ে এসেছি। খাও'।
'আমার খিদা নাই। খেয়ে আসছি'।
'চিংড়ির চপটা খাও। ভাল লাগবে'।
অনিচ্ছা স্বত্বেও সে চিংড়ির চপটা নিয়ে চিবুতে লাগল। এমন ভাবে চিবুতে লাগল যেন তার দাঁতে কোনো শক্তি নেই, খুবই অন্যমনস্ক ভাবে- আমার পাশে থেকেও যেন সে নেই।
আমি বললাম, 'কী হয়েছে অপু?'
'বাচ্চার পজিশন ভাল না রে। মনে হয় আর বাঁচানো যাবে না'। মুখের ভেতরের গ্রাসটুকু ফেলে দিয়ে আবার কামড় দিয়ে বলতে লাগল, 'সাড়ে সাত মাসের দিকে অপারেশন করে বের করে ফেলতে হবে। ডাক্তার বললো'।
'এখন কয়মাস?'
'ছয়মাস'।
'কেন এমন হল?'
'চিকনগুনিয়া জ্বর। আজকে দুই সপ্তাহ সে পাগলের মতো বিছানাতে ছটফট করছে'।
'আর ভাল ট্রিটমেন্ট নাই?'
'ট্রিটমেন্ট খালি এন্টিবায়োটিক। বাচ্চার জন্য সহনশীল হয় এমন এন্টবায়োটিক'।
'এ তো দুশ্চিন্তার কথা'। আমি বললাম, 'তোমার বউ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে তাহলে'।
'বাচ্চার আশা আমি ছেড়ে দিয়েছি’ সে বিড়বিড় করে বলল, ‘এখন ওরে বাঁচাতে হবে, যেভাবে হোক'। তারপর অপু খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, 'বাচ্চাটা আমার নাহলেও চলবে, বুঝলা! কিন্তু তাঁকে ছাড়া... ভাবতে পারো একবার? ' এতটুকু বলেই আমার নিরীহ চেহারার সুদর্শন বন্ধুটি ডানদিকে মুখ ঘুরিয়ে হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে কান্না আড়াল করতে চাইল।

ক্রুজ শিপ রেস্তোরাঁটি নোঙ্গর তুলে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে জেটি ছেড়ে চলে যেতে লাগলো। আমি পকেট থেকে সিগারেট বের করে জ্বালিয়ে সেদিকে নির্বিকার তাকিয়ে রইলাম। তিন বছর আগের স্মৃতি আমার মনে পড়ে গেল। আমাদের প্রথম সন্তানটিকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। জন্মানোর তিনদিন আগেই সে তাঁর মায়ের পেটে মৃত্যুবরন করেছিল। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে গিয়েছিল জুনিয়া। সন্তানের অকাল মৃত্যুতে যতোটা না শোকাহত হয়েছিলাম তাঁর চেয়ে বেশি ভেঙ্গে পড়েছিলাম জুনিয়াকে হারানোর আতঙ্ক ও বেদনায়। হাসপাতালের স্যাঁতস্যাঁতে প্রসূতি কক্ষে একটা মৃত কন্যা সন্তান ভুমিষ্টের কিছুদিন আগেও কী ভীষন সুখি আর স্বপ্নগ্রস্তই না আমরা ছিলাম! সেদিনই আমি জেনেছিলাম, মানুষের জীবনে মৃত্যুর মত ব্যর্থতা আর কিছু নেই। কিছুদিন আগেও আমরা দুজন এই পৃথিবীতে একটা নতুন জীবনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, একটা অনাগত মানব শিশুকে ঘিরে যে পদ্ধতি, প্রক্রিয়া ও স্বপ্নের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম, যা ছিল বাস্তব ও সত্য, অথচ আজ তাঁর সবকিছুই মিথ্যে। তাই আমি আর অপুকে সান্ত্বনা দিয়ে পরিহাসের উপলক্ষ হতে যাইনি। এসব ক্ষেত্রে আপনি সান্ত্বনা দিয়ে নিজের কাছে কতটুকু নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবেন, যখন আপনি নিজেই একইরকমের যন্ত্রনাবোধের অভিজ্ঞতায় আক্রান্ত? তাঁর স্ত্রীর শান্ত ও লাজুক মুখটি ভেসে উঠলো মনের মধ্যে। কী সুন্দর আর নিরহংকারী একটি মেয়ে। একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্রী। দারুন গান গাইতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্টেজ প্রোগ্রামে গান করার জন্য ডাক আসতো। কখনো অপু কখনো অপুর শ্বশুর তাঁকে সেইসব প্রোগ্রামগুলোতে অংশগ্রহনের জন্য নিয়ে যেত। প্রায়ই তারা দুজন সেইসব গানের অনুষ্ঠানে তোলা ঝলমলে যুগল ছবি নিয়ে ফেসবুকে আত্মপ্রকাশ করতো। আমি আর জুনিয়া তাদের ছবি দেখে মজা করে মন্তব্য লিখতাম- “তোমরা কত সুখি! তবে আমাদের মত নও নিশ্চয়ই!”

আলি আমজদের ঘড়িঘরে আটটার ঘন্টা বেজে উঠলো। মৃদু বৃষ্টির ফোটা পড়ছে আমাদের ওপর। আশেপাশের লোকজনদের মধ্যে বৃষ্টিজনিত ত্রস্ততা লক্ষ করা গেল; কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো ব্যস্ততা নেই; আমরা ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে ব্রিজের দিকে চললাম। বেশ দীর্ঘ সময় পর আমি নিরবতা ভাঙলাম, বললাম, “অপুর সংসার” নামের একটা সিনেমা আছে, তুমি কি সেটা দেখেছো, অপু?

অপু জবাব দিল না। আমরা পাশাপাশি হেঁটে নাগরিক ব্যস্ততা ঠেলে ব্রিজের ওপর উঠে এলাম। আমি ভাবছিলাম “অপুর সংসার” সিনেমার সেই অপুটির কথা। আহা, এই জগত সংসারে তাঁর আপন বলতে আর কেউই ছিলনা, একমাত্র সদ্য বিবাহিতা বধূটি ছাড়া। বধূটিকে পেয়ে জীবনটা তাঁর সত্যিকার অর্থে জীবনের মতো রঙিন হয়ে উঠেছিলো তখন। পিতৃ-মাতৃহীন, ভ্রাতা-ভগ্নিহীন, আত্মীয়-পরিজনহীন এই পৃথিবীতে সে ভালবেসেছিল একমাত্র বধুটির শরণ। যখন সে সন্তান সম্ভবা হলো, অধিকতর সেবা শুশ্রূষার জন্য তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো গ্রামে, পিত্রালয়ে। একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সাঙ্গ হলো বধূটির ইহলীলা।

অনেকদিন পর, সাত আট বছর হবে কি? ততদিনে সন্তানটি দুরন্ত শৈশব নিয়ে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু অপু কোনোদিন তাঁকে দেখতে গেলোনা। পিতা জীবিত থাকা স্বত্বেও সন্তান দেখতে পেলোনা পিতার মুখ।

একদিন শহরের রাস্তায় আচমকা কোন এক বন্ধুর মুখোমুখি হলো রুক্ষসুক্ষ উন্মাদপ্রায় উদ্ভ্রান্ত অপু। একমাত্র সন্তানকে একটিবারও দেখতে না যাওয়ার কৈফিয়ত যখন বন্ধুটি তলব করলো, অপু পালিয়ে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু নাছোড় বন্ধুটির দৃঢ়তার কাছে পরাস্ত হয়ে অপু কারন দর্শালো- Because of this child, She is dead!

প্রবল বেগে ঝড়োবৃষ্টি বইতে লাগল। একটু আগের আলো ঝলমলে ক্বীন ব্রিজ মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারে ছেয়ে গেল। অন্যান্য ভীত পথচারীদের সঙ্গে আমরা দুইজন, দুই রকমের ভাগ্যের বর অথবা পরিহাস দিয়ে নিয়তি যাদের আলাদা করেছে- হেঁটে চললাম- ঝড়ের মধ্যে, দুই রকমের পরস্পর বিরোধী অনুভবের মধ্যে।

“অপুর সংসার” সিনেমার অপু, আমার বন্ধু অপু এবং আমি- এই তিনজনের মধ্যে তুলনামুলক ভাবে আমিই সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান। প্রথমজন পৃথিবীর চিরায়ত নিঃস্ব মানুষদের একজন। দ্বিতীয়জন পিতামাতা থাকার পরও জাগতিক কোনো সংক্ষুব্ধতাহেতু এই শহরে স্বেচ্ছা নির্বাসিত এবং স্ত্রী ও সন্তানের জীবন-সঙ্কটের মুখে সংশয়গ্রস্ত। আর আমি, তৃতীয়জন, দ্বিতীয়বারের মত সন্তানের জনক! স্ত্রী ও কন্যা সমেত জীবনের পথে আয়ু রচনা করি। ভাবতেই শরীরের ভেতর এই বৃষ্টির মধ্যেও কেমন একটা অপার্থিব উষ্ণতা জেগে উঠলো।