ব্রাজিল

রতন শিকদার

পাউলো কোয়েলহো (১৯৪৭- )

পাউলো কোয়েলহো একদিকে সঙ্গীতকার, অন্যদিকে উপন্যাসিক। তিনি অভিনয়, নাট্যপরিচালনা এবং সাংবাদিকতায় প্রভূত খ্যাতিলাভ করেন। তাঁর ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’-এ তিনি লিখেছিলেন,
“আমরা এক মহাজাগতিক পথে ভ্রমণকারী, নক্ষত্রধুলা অসীমকালের ঘূর্ণি এবং চক্রের মধ্যে পাক খাচ্ছে আর নৃত্য করছে। জীবন চিরন্তন। আমরা মুহূর্তের জন্য থেমেছি একে ওপরের মুখোমুখি হওয়ার জন্য, মিলিত হওয়ার জন্য, ভালবাসার জন্য, ভাগ করে নেওয়ার জন্য। এটি এক মূল্যবান মুহূর্ত। এটি অনন্তকালের মধ্যে ছোট্ট একটি অংশ”।

পাউলো কোয়েলহো একজন বাস্তববাদী দার্শনিক। তাঁর জীবনই তাঁর সাহিত্যে প্রতিফলিত। মানুষের প্রতি তাঁর অবিচল বিশ্বাসই তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির প্রেরণা। মানবতাবাদী, চরম বাস্তববাদী এই সাহিত্যিক জীবনকে দেখেছেন সম্পূর্ণ এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁর কথায়,
“যখন প্রত্যেকটা দিন ঠিক পরের দিনটির মতো, তার কারণ মানুষ মেনে নিতে পারে না যে ভাল জিনিস প্রতিদিন তাদের জীবনে ঘটছে অর্থাৎ সূর্যোদয় হচ্ছে।”

কোয়েলহো নিয়মিত ইন্টারনেটে ব্লগ লেখেন। এগুলিতে তাঁর দার্শনিক চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর ব্লগগুলিকে তিনি ১০ সেকেন্ড, ২০ সেকেন্ড বা ৩০ সেকেন্ড-এর গল্প বলে অভিহিত করেছেন। এর প্রত্যেকটিকে সার্থক অণুগল্প বলা যেতে পারে। সেইরকম তিনটি অণুগল্প এখানে অনূদিত হল।

**********

অচল পয়সা

বাগদাদের বাজারে একটা বুড়ো খেলনা বিক্রি করছিল। খদ্দেররা তার ক্ষীণ দৃষ্টির কথা জেনে মাঝে মাঝে তাকে অচল পয়সা দিয়ে চলে যেত।
বুড়ো লোকটা চালাকিটা ধরে ফেলত, কিন্তু কিছু বলত না।
প্রার্থনার সময়ে সে ঈশ্বরকে বলত, যারা তাকে ঠকাচ্ছে তাদের যেন তিনি ক্ষমা করে দেন।
সে নিজের মনে বলত, তাদের হয়তো বেশি টাকাকড়ি নেই এবং তারা তাদের বাচ্চাদের জন্য উপহার কিনতে চায়।
দিন চলে যায় এবং একদিন লোকটা মারা যায়।
স্বর্গদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে সে আবার প্রার্থনা করল, প্রভু, আমি পাপী। আমি অনেক বাজে কাজ করেছি। আমাকে দেয়া অচল পয়সাগুলো থেকে আমি কোনওমতেই ভাল নই। আমাকে ক্ষমা করে দাও।
সেই মুহূর্তে দরজা খুলে গেল এবং একটি কণ্ঠ জেগে উঠল, আমি কী ক্ষমা করব? আমি কীকরে একজনের বিচার করব যে সারাটা জীবন কারোর বিচার করে নি।


কী লেখা আছে?

একজন অন্ধ লোক মক্কার পথে ভিক্ষা করছিল। এক ধার্মিক ব্যক্তি এসে তাকে জিজ্ঞাসা করল যে কোরানের নির্দেশ মতো লোকে কি তাকে উদার হস্তে দান করছে। লোকটা তাকে টিনের কৌটোটা দেখাল। সেটা প্রায় খালিই ছিল। ভ্রমণকারী বলল :
- এসো, তোমার গলায় ঝোলানো কার্ডটাতে কিছু লিখে দিই।
কয়েক ঘণ্টা পরে ভ্রমণকারী ফিরে এল। ভিখারি অবাক, কারণ সে অনেক টাকা পেয়েছে।
সে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কার্ডে কি লিখেছিলে?
- আমি যা লিখেছিলাম তা হ’ল :
বসন্তের আজ এক সুন্দর দিন। সূর্য জ্বলজ্বল করছে, এবং আমি একজন অন্ধ।


কোপাকাবানার ভদ্রমহিলা

আটলান্টিকা এভিনিউয়ের পাশের পথে সে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে ছিল একটা গিটার আর হাতে লেখা একটা পোস্টার, যাতে বলা হচ্ছিল, আসুন, আমরা একসাথে গান গাই।
সে বাজাতে শুরু করল।
একজন মাতাল এল, তারপর একজন বৃদ্ধা মহিলা; এবং তারা তার সাথে গাইতে শুরু করল।
অল্প সময়ের মধ্যে একটা ছোট্ট ভিড় এক সঙ্গে গান গাইতে লাগল এবং অন্য আর একটা ছোট ভিড় শ্রোতার ভূমিকায়, প্রতিটি গান শেষ হবার পর তারা হাততালি দিচ্ছিল।
গানের মাঝখানে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি এরকম কর কেন?
সে বলল আমি একা হতে চাই না। জীবন আমার বড় নিঃসঙ্গ, ঠিক যেমন অন্য বৃদ্ধ মানুষদের।
আমি প্রার্থনা করছি সবাই যেন এভাবেই তাদের সমস্যার সমাধান করতে পারে।