হাকিক্‌ত কে উস পার মে

শুভ আঢ্য



তাহলে ধরা যাক আপনি হারবার্ট কিংবা গাণ্ডু, অথবা দুটোই। আপনি আলো জ্বালিয়ে শোন না। আপনি শুলেই আলো আপনাআপনি নিভে আসে। সুতরাং হেজিমনি সেটাকে অন্ধকার বলতেই শিখিয়েছে। আর প্লিজ হাসাবেন না আপনি অন্ধকারে ভালো দেখতে পান বলে, কারণ চোখের রেটিনায় ফসফরাসের আধিক্য আপনার অতটাও নেই। এবার শুনুন, ভালো স্বপ্নের কথা প্রথমেই গোর দিয়ে দেওয়া যাক। এখন আপনাকে হারবার্ট সরকার আর গাণ্ডু দুজনেই কিছুটা পেড়ে ফেলবে। দেখার মধ্যে শুধু ধোঁয়া ছাড়া আর কি’ই বা দেখে থাকি আমরা। সুতরাং ধোঁয়াটে দেখা হোক। উল্লাসের শব্দ আমার আপনার কানে পৈশাচিক ছাড়া অন্য কিছু ভাবে যেন ধরা না দেয়।
আদপেই, তিনটে স্তরে আপনি তলিয়ে যাচ্ছেন, একা সমুদ্রপাড়ে শোওয়া হলিউড বা বলিউড মুভির মত। কেউ নেই পাশে, যে আপনার হাত ধরে আপনাকে পোপার বাক্স থেকে বের করে আনবে। সুতরাং আপনি দেখছেন, হলের চারদিকে অন্ধকার আর শ্যালো জলের স্তর আপনার ঘুমে জড়িয়ে পড়ছে, তার থেকে সামান্য গভীর জল আপনার তলপেটের ওপরটাকেও দেখতে দিচ্ছে না আপনাকে। অথচ, জল সবচেয়ে গভীর হলে আপনি দেখে উঠছেন একটি মেয়ে আপনাকে ঘেরাও করেছে। আপনার মাথায় থাকছে খারাপ স্বপ্নের যাবতীয় প্রকরণ, যদিও আর দু’ঘণ্টা তেইশ মিনিট পর আপনি কিছুই মনে রাখতে পারবেন না। মনে থাকবে না ওই মেয়েটার স্তন, পাকা আপেলের রঙের মত মেয়েটির স্টিলেটো, গম ভাঙ্গানোর দোকানে পড়ে থাকা আটার মত মেয়েটার গায়ের রঙ। শুধু কিছু ধোঁয়া মনে থেকে যাবে। দৃশ্য আপনার বাগ মানছে না, সে বালির মত আপনার মুঠো ছেড়ে শুধুই নীচের দিকে পড়ছে, আর আপনি দেখছেন, যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তার রঙ কালচে আকাশী। হেজিমনি এটাকে সন্ধের আকাশ বলে চিনিয়েছে আপনাকে। বাই দ্য ওয়ে আপনি নিশ্চয় সিগারেট খান! আপনি নিশ্চয় কাকের গলার রঙ চেনেন, আপনি নিশ্চয় কাকটি উড়ে যাবার পর তাকে আর খুঁজে পান না। অন্য কাকটিকে তার মত মনে হলেও আপনি বিচক্ষণ বোঝেন সেই কাক আর এই কাক এক নয়। তো আপনাকে খানিকটা ভদি বলে ভাবা নিশ্চয় খুব অন্যায় হবে না!
কি সেই কঠিন ব্যাপার! মেসোপটেমিয়ার পলিতে আপনি আঁকেন রাত গেলে তার ছবি। আপনি পয়দা করেন ভাবী ছবি, আপনার পেটের ভেতরে দৃশ্য আর দৃশ্যকল্প ভাড়া বাঁধে, আপনি তাতে প্লাস্টার করেন। সেই গ্রীক ভাস্কর্যের ভাঙ্গা হাত ভেনাস, যার কোমর থেকে কাপড় স্তরে স্তরে খুলে আসছে সে’ই তো আপনার ঘুম। তা’ই তো স্বপ্ন আপনার, শুধু নিউরোনে খেলা করে যায় অন্য নিউরোনের বিদ্যুৎ। আপনি ভগবানের কথা ভাবলে দেখেন একজন কেউ আপনার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে পুং না স্ত্রী আপনি জানতে পারছেন না, তার মুখ কোনো ফোটনের স্পর্শ পায়নি। আপনি ঘটনার কথা ভাবছেন, ভাবছেন সেক্সের সময় ঠিক কোথায় চুমু খেলে অর্গাজম হায়েস্ট লেভেলে পৌঁছায়, অথচ মনে রেখেছিলেন কি যে আদৌ আপনি চুমু খেয়েছিলেন তো, মেয়েটিকে!
রাস্তায় পড়ে থাকা এককোণ থেকে ভয়টাকে দেখে আপনি পাশ কাটিয়েছিলেন, যথার্থই ডজ আপনি জানেন মারাদোনার মতই প্রায়। অথচ এখন দেখতে পাচ্ছেন আপনার চোখের ওপর ফিনান্সিয়াল ক্রাইসিস আপনার টুঁটিতে হাত বসিয়েছে। আপনি কব্জি শক্ত করছেন, ধরার চেষ্টা করছেন তার মুঠো, কিন্তু বাতাস ধরার খেলায় আপনি হেরেই যাচ্ছেন, মুদ্রা গলে গলে আপনার মাথার পাশে পড়ছে, কানে বাজছে উইণ্ডচার্মের মত, যদিও তা শুনতে আপনি চাইছেন না। স্বাভাবিকই আপনার উত্তম কুমারের কথা মনে পড়ছে, টেলিফোনের কথাও আর রিসিভার রাখতে ওই হাতের কঙ্কাল। না আপনি বিখ্যাত নন, ফেমের আলো আপনার অণ্ডকোষ লক্ষ্য করে ফেলেনি কেউ। তবু ‘একবার বলো – আমি উত্তম কুমার’ এটা কেন যে ইকো হচ্ছে আপনি ধরতে পারছেন না, আপনি সাদাকালো ছেলেবেলার ছবির কথা ভাবছেন, ইজেরে ফুটোর কথা ভাবছেন, স্কুলের গেটে ভাঙ্গা কারেন্ট নুনের কথা মনে পড়ছে, আর দেখছেন কমল মিত্রের মত আপনার বাপ ঘাড়ে রদ্দা ঝাড়ছেন। আপনি সম্মান করতে শিখছেন সাদাকালো ছবি হয়ে যাওয়া সেইসব স্মৃতিদের যারা বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টেই আপনার থেকে জোর জুলুম চাঁদার বিল কেটে যাচ্ছে। এসব স্বপ্নের ধারেকাছে আপনি বেড়ে উঠছেন হাফ প্যান্ট ছেড়ে, সিগারেট ধরতে শিখছেন, একটি মেয়েকে ডানপাশে কিভাবে রেখে মার্লন ব্যাণ্ডো স্টাইলে পেলভিস ধরতে হয়, শিখছেন। আপনাকে লজ্জায় ফেলে ফুটে উঠছে ব্লাউজের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া আপনার হাত ও আঙুল – ঠিক ওই ফুটফুটে মেয়েটির মতই।
অর্থাৎ এতক্ষণ আপনি যা যা দেখে উঠলেন তা কিছুটা ফ্রয়েডীয়, কিছুটা পাতি আমার ইচ্ছে - যা আপনার ভেতর চালান করে দিলাম। স্বপ্ন আসলেই এক কুয়াশায় হেঁটে চলা রাস্তা মাত্র, যে রাস্তার দু’ ধারেই খাদ, আপনি বুঝে ওঠার আগেই পাশ দিয়ে হাজারটা জিপ আপনাকে কাটিয়ে বেরিয়ে যায়, তারা আলো ফেলে আপনার কর্নিয়ায়, আপনার কর্নিয়া এই অন্ধকারে সিজিনড হয়ে ওঠা ফুলের মত অত ফোটন কণা একেবারে নিতে পারে না, সংকুচিত বা প্রসারিত হয়ে ওঠার পরে সেই জিপগুলোকে আর দেখতে পান না, শুধুই তাদের ইকো গানের মত কানে বাজে। এই সেই কুয়াশা কেবিন যেখানে আপনি স্বপন রায়ের সাথে যতটা দেখা করেন, অঞ্জন দত্তের সাথেও ততটাই দেখা হয় আপনার। শব্দকে ধ্বনির দিকে পাঠানোর সময় ধ্বনিও শব্দ হয়ে ফিরে ফিরে আসে। যা আমি আপনাকে দেখালাম তার চেয়েও বেশী আপনি বলে ওঠেন কখনও আমায়, এই দু’তরফা মনের বিক্রিয়া আপনাকে মনে করায় আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ আসলে নন, আপনার ঘুমের প্রয়োজন আরও। কিছুটা যে গাঢ় ঘুমে আমার মত এক অবয়ব আপনার পাশে দাঁড়াবে, চোখের কনীনিকায় টর্চ ছাড়া ফেলার আর যার কিছুই নেই। আপনি দেখে উঠবেন ছবি আর ছায়া, অর্থাৎ আপনি সিনেমাওয়ালা হয়ে উঠবেন। এখন মনে করুন তো, গাণ্ডুর ওই স্বপ্নাদেশ! চেষ্টা করুন তো দেখার - হারবার্ট সরকার কাঠের চিতায় পুড়ছে! দেখুন, খাদের ধার ডেকে নিয়ে যাচ্ছে আপনাকে দার্জিলিং! আর আপনি চিৎকার করছেন, তাই’ই কবিতা হয়ে উঠছে... আপনি লিখছেন
‘রা দিয়ে শুরু
রু-তে রূপোমা স্টিকার

বৃষ্টি-স্তেপল দৌড়ল
শহরের লরীচুপ ঝক্কি বৃষ্টি-চলা দরজা
আর গানে নীল লাগানো
খুনের বদলে চার-চাঁদ লাগানো
মিষ্টি ব্রেক’
(আমি চোরা, কুয়াশা কেবিন)
আর জানছেন, কুয়াশা কেবিনের সেই লেখা, অনেক দিন আগেই লেখা হয়ে গেছে। এনিওয়ে আমায় এতটা সময় দেবার জন্য ধন্যবাদ, যদিও আপনি না দিলেও ঘুম ও স্বপ্ন আমি হাইহ্যাক করতেই অভ্যস্ত... ভালো থাকুন, খারাপ স্বপ্নে, নিরন্তর।

(ঋণ – সিনেমা – গাণ্ডু - কিউ; হারবার্ট - সুমন মুখোপাধ্যায়; নায়ক - সত্যজিৎ রায়
বই – কুয়াশা কেবিন - স্বপন রায়; কাঙাল মালসাট ও হারবার্ট - নবারুণ ভট্টাচার্য
গানের আবহ – অঞ্জন দত্ত)