সমর্পিত নৈঃশব্দের আত্মকথা

সূর্য্যমুখী




চোখজুড়ে অবয়ব নামে- জোয়ারের মতন নিবিড় অবয়ব; পুরনো ছাতিম গাছের ঘ্রাণের মতন দীর্ঘ আর গাঢ় যেন অবিকল মৃত আমি অথচ পৃথিবীতে তখনও বালিকা চোখের সন্ধ্যা নামেনি। গড়াইয়ের জলে ঢেউ জাগেনি; জাগেনি সুতীব্র শালিকের ডানা- ঘুম ভেঙে উঠে বসেনি পাশ ফিরে শুয়ে থাকা জীবন। অবাঞ্ছিত অন্ধকার সাক্ষী, কামিজের পাঁজরে লেগে থাকা রক্তের বুদ্বুদ জানে মুখোশের মাঝে কেনো জমে থাকে বারো শতাব্দীর ঘ্রাণ ; তবুও আত্মা নয়, প্রতিটি আয়নার বিপরীতে কেবলি খুঁজে পেয়েছি বিবর্ণ আত্মহনন; মুখোশের বিপরীতে ঢলে পড়া জোছনার স্নান।
অন্ধকার আর আয়নার কথা বলি; অযাচিত মুখোশের বিষণ্ণ রুপকথা। সন্ধ্যা হলে বুকের পাশে আয়না খেলা করে- অন্ধকার যার শর্তাধীন দয়িতা। একে একে বালিকার দৈর্ঘ্যে নিভে যায় আয়না খেলার দিন, শিরীষের ডানা বা অকথিত বেলগাছ। নগরীর আত্মহত্যার পথে তবু পড়ে থাকে জোছনার ঢল, সমর্পিত বকুল- কখনো নৈঃশব্দের ভুল অথবা অন্ধকারের এগারোটি নাম। এভাবে বড় হয় শীতের আয়ু-জানালার গ্রিল-কামিজের ধার আর গল্পের নামে ভুলে যাওয়া বাড়ির পথ। শুরু হয় নির্জন শালিকের গল্প। পরিচিত জীবনজুড়ে পড়ে থাকে কেউটের বিষ কখনোবা নির্বন্ধ কবচ। মনে পড়ে শীতকালীন কথা। গোটা শীতকালজুড়ে যৌথ স্বপ্নের খামারে জেঁকে বসে কীর্তিনাশা ব্যকরণ। নির্ধারিত জানালা থেকে খসে পড়ে কামিজের আলো, নিশ্ছিদ্র অন্ধকার এবং দূরের বাতিঘর- লাল লাল ক্ষরণ আর শোকের আয়ু ঘেঁটে কেউ কেউ তুলে আনে অনন্য আঁধার; কেউটের বিষে উপচে পড়া নীল নীল অন্ধকার- ঘুঙুরের জলে মিলিয়ে যাওয়া জলজ অন্ধকার- নখের ডগায় লেগে থাকা আটপৌরে অন্ধকার- অশোকের বুকে জমে থাকা আত্মজ অন্ধকার। একটি গাঢ় ও স্থির স্বপ্নের মতন একান্ত অন্ধকার- ফিরে পাওয়া থোকা থোকা বকুলের অন্ধকার।
রাত হলে পাঁজর বেয়ে একটা সাপ আসে- খুঁজে ফেরে পুরনো মৃতদেহ; অবিকল আয়নায় দেখা মেলে পরিচিত মৃত অবয়ব- চোখের ভ্রান্তিবিলাস; শুরু হয় স্বপ্নের প্রথম অধ্যায়। ঠোঁটের ডগায় তখনও ঠিকঠাক লেগে আছে শ্যাওলার ছায়া; নখের কোণে অনির্ধারিত ইতিহাস; চিবুক ঘিরে বরফ যুগে হারিয়ে যাওয়া যত গল্প।
কোন কোন আঁধারে নিজের দেখা মেলে, পাঁজর খুলে বেড়িয়ে আসে হিমশীতল আমি। অতপর চোখজুড়ে স্বপ্ন উঠে, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মতন- আত্মসমর্পনের নিঃসঙ্গ স্বপ্ন। উরু বেয়ে স্বপ্নের দল ফিরে যায় হারিয়ে যাওয়া নগরীর দিকে। অথচ পেছনের আমবাগান থেকে উড়ে আসে পেঁচার কান্না- মাতামুহুরির মতন পুরাতন এক জমাট রক্তের প্রতিচ্ছবি; শরীরী ভেবে খেলা করা প্রাত্যহিক ভিটার ছায়া। নিঃশ্বাস চিড়ে বের হওয়া এক একটি বালিহাঁস জানে বিচ্ছিন্ন অবয়ব নিয়ে জেগে থাকা শাদা পাখিদের উড়াল- আনন্দ নয় যার অভ্যস্ততা বেদনায়। বুকের মাঝে তবু বালিকা খেলা করে- আমৃত্যু বাড়ি ফেরার নামে যে দেখে জোছনার ভাঙন। শালিকের ডানায় ভর করে উড়তে শেখে- একে একে পোয়াতি হয় মুন্সি বাড়ির আমলকী বাগান, পুরনো ভিটার চন্দ্রবোড়া আর পশ্চিমের শিরীষ গাছটা। উদোম রাতের বিল ভরে যায় শাপলার ঢলে অথচ স্বপ্ন দেখার নামে ডুবে যায় বালিকা নাভির বিনিদ্র যাপন। সেই থেকে উঠানের পেছনে থেকে থেকে পাখি কাঁদে। পাখি, নির্জন স্বপ্নের ডাকনাম; অবয়ব আঁকড়ে ধরে পাড়ি দেয়া আন্দালুসিয়ার হ্রদ, উষ্ণ পাথরে ঠোঁট ভিজিয়ে এঁকে ফেলা স্বপ্নের ইকারুস, বিনিদ্র রমণীর নিশ্ছিদ্র উড়াল শেষে হাতড়ে বেড়ানো আকণ্ঠ হেমলক। উত্তুরে দীঘিতে তখনও ডুবতে থাকে পৃথিবীর মতন পুরাতন এক কামিজের দেহ...।
অথচ অন্ধকার আর আয়নার অযাচিত সমুদ্রযাত্রা শেষে হায়ারোগ্লিফিক পারদে ভেসে উঠে একান্ত মৃতদেহ। হেমন্তের শেষ বীজ ঝরে গেলে যমুনার মতন চোখ নিয়ে পরিচিত পাখি হাসে। চোখ নেমে যায় দীঘির জলে। দিঘী ছুটে চলে বুনো ঝাউয়ের গন্ধ ভারাক্রান্ত বাতাস ভেঙে- নিবিড় অরণ্যের ডাকে। তবু রয়ে যায় মীনকুমারীর নিঃসঙ্গ গল্প- অন্ধ ঘুঘুর নির্বাসন- আয়নার জলে খুঁজে ফেরা নামহীন প্লাবন; অজস্র মৃত্যু আর মুখোশের শেষে রয়ে যায় হারিয়ে যাওয়া আত্মজার পৃথিবী ভ্রমণ।