দেখা না-দেখায় মেশা

সংহিতা সান্যাল




একটা লোক-গাদাগাদি ঘরের মধ্যে আমি ঘুম ভেঙে জেগে উঠলাম। তারা কেউ জেগে নেই। এ-ওর গায়ে হেলান দিয়ে দিব্যি অচেতন। সাড়া দিল না ডাকে। আমি তাদের পেরিয়ে পেরিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে থমকে গেলাম। গায়ে ফুটে উঠল বিন্দু বিন্দু ঘাম। আতঙ্কে। ঘরের বাইরে হা হা করছে খাদ। আকাশে ক্রমশ এগিয়ে আসছে সূর্য, গিলে খাচ্ছে চাঁদ-তারা, অজস্র নক্ষত্র চোখ ধাঁধান বিস্ফোরণে পলকে কৃষ্ণগহ্বর হয়ে উঠছে। দিগন্তে আগ্নেয়গিরি আগুন উগরে দিচ্ছে, মাটি চিরে গিয়ে পৃথিবীর বুকের ম্যাগমা উঠে আসছে, ছাইয়ের বৃষ্টি আর ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে অবিরাম। হ্যাঁ, জাজমেন্ট ডে। আর এই দিনের কথা জানতে পেরে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী আত্মহত্যা করেছে বা পরস্পরকে খুন করেছে। তাদেরই পেরিয়ে পেরিয়ে আমি বাইরে এসেছি। এখন আমি একা, মহাবিশ্বের একমাত্র জীবন্ত অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি, কীভাবে আমার গ্রহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।
আবারও ঘুম ভেঙে উঠলাম, আবারও ঘাম। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম। নাঃ, চেনা ঘর, চেনা রাস্তায় শান্তিময় হলদে বাল্‌ব। সব ঠিক আছে। নিছক স্বপ্ন ছিল ওটা। কিন্তু ওই বীভৎস একাকীত্ব, আমার নিজস্ব জগৎ ধ্বংস হতে দেখার এমন অভিজ্ঞতা শান্ত হতে দিচ্ছে না! মনে মনে ভাবতে শুরু করলাম, কাল অফিস যাব। কতগুলো কাজ জমা আছে, অফ ডে আসতে আর দু’দিন। ছুটি পেলে গঙ্গার ধারে যাব, কতদিন যাই না... জলের গন্ধ নেব বুক ভরে, পা ভেজাব, মেঘ জমতে দেখব আকাশে। নৌকো দুলবে অল্প অল্প। দু’কলি গান এল গলায়। চোখ বুজে এল। নিজের তৈরি করা এই আবহে স্নিগ্ধ হতে হতে আবার ফিরে গেলাম ঘুমের অতলে।
স্বপ্ন দু’রকম। একটা অবচেতনের কবিতা। অন্যটা নিজের। নিজস্ব ভয়, নিরাপত্তাহীনতা দুমড়ে মুচড়ে আনকোরা রূপক দিয়ে চেতনা একরকম কোডেড মেসেজ বানায় আর ভাসিয়ে দেয় আলতো করে। আবার সেই ভয় আর নিরাপত্তাহীনতাকেই উপেক্ষা করতে সচেতন মন ইচ্ছেমত স্বপ্ন বানায়। এই দু’রকম স্বপ্নের মাঝখানেই আমাদের বেঁচে থাকা। ছোট থেকেই এই দুই ধরন পাশাপাশি বাড়তে থাকে। সহাবস্থান বোঝা যায় নানাভাবে। আমার আঁকার খাতা ভরে থাকত ল্যাভেন্ডার রঙের হিজিবিজিতে, জামা কিনতাম ওই রঙের। কারণ মাঝেমাঝেই আমার স্বপ্নে একটা শান্ত, ঢেউহীন গাঢ় বেগুনি সমুদ্র দেখা দিত যার দু’ধারে ল্যাভেন্ডার ঝোপ। তার ওপর স্থির হয়ে আছে সাদা নৌকা। কোনও এক ক্যালেন্ডারে দেখা একটা সমুদ্রে নৌকা ভাসার স্থিরচিত্র আমার মনে একটা অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতার, প্রশান্তির অনুভব এনেছিল। রঙের অনুষঙ্গটা কেন, বলতে পারব না। আবার এই আমিই ক্লাসে বানিয়ে বানিয়ে রচনা লিখতাম, প্রিয় বেড়ানোর জায়গা হল জঙ্গল। সেখানে তাঁবু খাটিয়ে বসে বৃষ্টির শব্দ শোনার ইচ্ছেস্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকতাম। ছুটির ঘণ্টা বেজে যেত। আস্তে আস্তে বানানো স্বপ্নে অন্যের স্বপ্ন কামড় বসায়। পছন্দ বদলে যেতে থাকে সুবিধাজনক নির্বাচনে। তখন ভাললাগাগুলো কিছুটা ছেঁটে, কিছুটা কেটে খাপে খাপ করে নেওয়া। আর যত ঘা পড়ে নিজস্ব স্বপ্নে, ততই আরও স্পষ্ট, আরও বিচিত্র হয়ে ওঠে অবচেতনের কারিকুরি। যা বাদ দিচ্ছি, তা অ্যাকোয়েরিয়ামের এক্কেবারে তলায় রঙিন মাছ হয়ে জমতে থাকে। আলো নিভলেই তার গা থেকে বিচ্ছুরিত হয় আশ্চর্য আলো, কাচের গায়ে কাটাকুটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বাস্তবে আমি নিত্যদিনের ডায়রি তাকে তুলে দিয়ে পড়তে বসি আকবরের কৃতিত্ব। আর স্বপ্নে শাবল হাতে নিয়ে ভাঙা দুর্গে কী যেন খুঁড়েই চলি, খুঁড়েই চলি। সাদা পেঁচারা অন্ধকারে এদিক-ওদিক উড়ে যায়। আমি বাস্তবে পুড়িয়ে ফেলি প্রেমের চিঠি। বিশ্বাসঘাতকতায় ধ্বস্ত মন শান্ত করি পেশাদারি নৈপুণ্যে। আর স্বপ্নের ভেতর কমলা রঙের মেপল বনে কী যে ঝড় ওঠে, বলার কথা নয়! ঘুম থেকে উঠে একটু ভাবলেই বারবার আমার হেরে যাওয়া, মেনে নেওয়া, আপস করে নেওয়া ধরা পড়ে যায়। আরও আরও বানানো স্বপ্ন দিয়ে তাকে ধামাচাপা দিই...আরও হিংস্র হয় অবচেতন... আরও মরিয়াবৃত্তি... আরও রক্ত জমে মেঘের ভেতর। এই যুদ্ধ লড়তে লড়তে একদিন আমরা ক্লান্তি চিনে যাই, ঘুমের ওষুধ চিনে যাই। স্বপ্নহীন ঘুমের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বালিশে আশ্রয় নিই। একদিন শিখে যাই নানারকম কৌশল। শিখে যাই, যা নিয়ে আমি গভীরে ভাবব তাই নিয়েই স্বপ্ন গড়া হবে। শিখে যাই, ভয়ের স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করলে বা তার যুক্তি খুঁজলে সে স্বপ্ন আর ফিরে আসে না। এভাবেই আমরা সত্যি স্বপ্নের হাত এড়িয়ে পালাই আর ‘স্বপ্ন’ শব্দটাকে ‘ইচ্ছে’-র সমার্থক করে তুলি।
অথচ অন্যরকম হতে পারত। আমাদের আশাকেও তো স্বপ্ন বলা যেত! সমাজ পালটে দেওয়ার স্বপ্ন, মাথা তোলার স্বপ্ন, সন্তানের স্পর্শের স্বপ্ন, ভালবাসার স্বপ্ন – এসবও তো লেগে থাকতে পারত অবচেতনের গায়ে গায়ে! কিন্তু তেমন তো হয় না। আমাদের জেগে থাকার প্রহরে প্রহরে সুখ এত বেশি জায়গা নিয়ে ফেলে যে অবচেতন তাকে আর দরজা খুলে দেয়নি। সে যত্ন করে বেছে নিয়েছে সুখ হারিয়ে ফেলার আতঙ্কটুকু। বিপন্নতাটুকু। যা আমরা জোর করে না দেখার ভান করি, সে তাই দেখায়। আমরা যেন স্নো-হোয়াইটের গল্পের দুষ্টু মা – স্বপ্নের আয়না আমাদের কুৎসিত রূপটা দেখায়। জীবনের মেকআপের নীচে বিজবিজে ক্ষত দেখায়। এই দেখানো আর দেখতে না চাওয়ার লড়াই লড়তে লড়তেই আরেক ঘুম এসে যায় – যা আর ভাঙে না। তাকে মৃত্যু বলে। তার মধ্যে কোনও স্বপ্ন নেই।
তার আগে পর্যন্ত – এক স্বপ্ন থেকে অন্য স্বপ্নে জেগে ওঠার পালা চলতেই থাকে।