টিকটিকির খাঁচা

ফজলুল কবিরী




একটা টিকটিকি দরজার একেবারে মাঝ বরাবর চিৎ হয়ে পড়ে আছে।
আমার মনে হচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে আমি শুয়ে ছিলাম। চোখের পাতাগুলো ঘুমের পর্দায় ঢাকতে না ঢাকতেই একটা আশ্চর্য রকমের অনুভূতি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। । দূর থেকে দেখে আমি প্রথমে ভেবেছিলাম একটা ছোট ডাইনোসর খুব আয়েশ করে আমাকে পাহারা দিচ্ছে। আমি খানিকটা কৌতূহলী হয়ে ঢুলু চোখে একপলক তাকাতেই শরীরের আলস্য মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে যায়। দেখি আমার সারা বিছানায় অনেকগুলো টিকটিকি কিলবিল করছে। আমি জোরে চিৎকার করে উঠে একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। আমার মনে হচ্ছিল রাতের অনিদ্রার পর যখন আমার চোখে খানিকটা ঘুম আসি আসি করছিল তখন কেউ জোর করে আমাকে একটা ছোট্ট ডায়নোসরের খামারে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
একটা জলজ্যান্ত মানুষকে টিকটিকির খামারে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর নির্লিপ্তভাবে তাকিয়ে আছে দর্শনার্থীরা।
কিন্তু খাঁচার ভেতরের এই মানুষটাকে আমি চিনতে পারি না। আগের আমি আর এই মানুষটা এক মনে হয় না। তীব্র
ভয় ও আতঙ্কে বদলে যাওয়া একটা খাঁচার প্রাণীকে দেখে আমার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। বাইরের দর্শনার্থীদের
দেখে আমার বুক আরো শুকিয়ে যায়। তাদেরকে ঠিক স্বাভাবিক মানুষ মনে হয় না। এমন মানুষ আগে কখনো
দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কেমন রক্তচক্ষু নিয়ে আমার দিকে তারা তাকিয়ে থাকে। আমার আতঙ্কিত মুখ দেখে তাদের
মধ্যে তীব্র আনন্দ জেগে ওঠে। তাদের মনোরঞ্জনের চূড়ান্ত উপাদান বানাতেই হয়তা একদল ব্যবসায়ীর হাত বদল
হয়ে আমাকে টিকটিকির খামারে ঢুকতে হয়েছে। আমি নিজের গায়ে চিমটি দিয়ে চেষ্টা করি ঠিক আছি কি না। আমার
শরীরে চামড়া দিয়ে পেঁচিয়ে থাকা মানুষটার চেহারা হুবহু আমার মতো কিনা একবার ভাবার চেষ্টা করি। খুব স্পষ্ট করে
কিছু বুঝতে পারি না। এই মানুষটাকে কখনো সশরীরে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তার শরীরে যেসব জামাকাপড়
জড়ানো আছে তা আমারই। তবু কেমন আবছাভাবে মানুষটা আমার চোখে ধরা দেয়। মানুষটাকে আমি চিনতে পারি
না। বিরক্ত লাগে। মাথা গরম হয়ে ওঠে।
নিজেকে সংযত রেখে সে জিজ্ঞেস করে, কে তুমি?
প্রশ্নটা করে একটু বিব্রত বোধ করি। এই রকম প্রশ্ন আগে কখনও কাউকে করিনি।
মানুষটা কোনো উত্তর দেয় না। তার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। চোখে ভয়ের লক্ষণ স্পষ্ট। চোখ দুটোতে খেলা করছে অস্থিরতা। মনে হচ্ছে সে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে। অপ্রস্তুত মনে হয় নিজেকে। একটু সহজ হওয়ার জন্য সময় দিই তাকে। তার মধ্যে নিজেকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার লোভ জাগে। নিজের অজানা সৌন্দর্য আবিষ্কার করতে ইচ্ছে করে।
খাঁচার ভেতরের মানুষটা চুপ করে থাকে। আমি আবার তার দিকে আবার তাকাই।
তারপর তাকে প্রশ্ন করি, মানুষ কি একে অপরের আয়না হতে পারে?
সে প্রশ্নটা বুঝতে না পেরে অসহায়ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। মানুষের সাথে আয়নার সম্পর্ক কি তার মাথায় ঢোকে না। আয়নার কি কোনো প্রাণ আছে? হাত আছে? মাথা, নাক, চুল এইসব আছে? এক ধরণের অস্বস্থির ভেতর সে ঘুরপাক খায়।
আমার মাথা ভারি হয়ে উঠতে শুরু করে আবার। আমি কে? তার ছায়া? তারই অন্যরূপ? নাকি অন্য কিছু? মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে তার।
মনে হচ্ছে আমি কেউ না। সেও কেউ না। পরক্ষণে মনে হয় আমার ভেতরে বাস করে আরেকটা মানুষ।
আমার মানসিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে।
আমি কি ভয় পাচ্ছি? মানুষের কি অনেক রূপ থাকে? প্রতিটি মানুষই এমন এক জটিল দার্শনিকতার ভেতরে ঘুরপাক খায় কিনা মনে মনে ভাবার চেষ্টা করি।
মানুষটার কথা আমি বুঝতে পারি না। আমার মনে হচ্ছে লোকটা এমন একটা জটিল অবস্থানে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে যাতে আমি তার কথার মর্মোদ্ধার করতে না পারি।
একটু থেমে আমি তাকে বলি, শোনো, মানুষের নিজের বলে কিছু নেই। মানুষ যা দেখতে চায় তা-ই সে দেখতে পায়। পৃথিবীটা আমাদের নিজের মতো। আমরা যেভাবে দেখতে চাই, সেভাবে দেখি। আমরা প্রতিদিন নিজেদের মাপি। প্রতিনিয়ত।
মানুষ প্রতিদিনই নিজেকে ভাঙ্গে। মানুষের স্বভাব, দোষ-গুণ সব কিছুতে একটা পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই কথা তোমাকে বিশ্বাস করতেই হবে। তুমি যতদিন বেঁচে থাকবে আমিও তোমার এইসব পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকব। তুমি বিশ্বাস কর বা না কর, কথাটা সত্যি।
আমার কথা তার ভেতর কোনো পরিবর্তন আনে কি না একবার পরখ করার চেষ্টা করি। মনে হচ্ছে সে ক্লান্তি অনুভব করছে। আমি তবু তাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি। মানুষের তো অনেক রকম পরিবর্তন আসে। প্রতি মুহূর্তে ঘটে। সব পরিবর্তন বলে-কয়ে আসে না। কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি থাকতেই হয়।
এসব কথা বলি আর নিজের গায়ে একটু পরপর নখ ঢুকিয়ে পরখ করি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে আছি কি না। নিজেকে এত অভয় দেওয়ার পরও এমন অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। সারাক্ষণ পেছনে কেউ যেন একটা অদৃশ্য ক্যামেরা নিয়ে অনুসরণ করে যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার কী করণীয় সে-ফয়সালা চট করে মাথায় আসে না। একটা হতাশা আগের মতই ঘিরে রেখেছে।
আমার শরীরে ঘাম জমতে শুরু করেছে। আমার ভেতর উসখুস করছে কিছু একটা। আমি ধরতে পারছি না। আমার নিঃশ্বাস আটকে যেতে চায়। মুক্ত বাতাসে মুখ হা করে শ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে সুযোগ আমার নেই। পারি না। দম বন্ধ হয়ে আসে। হঠাৎ তীব্র হাসি পায়। হাসির দমকে পুরো শরীরটা কেঁপে ওঠে।
ক্ষোভ ও হাতাশায় আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তীব্র শ্লেষমাখা হাসি।
হঠাৎ মনে হয় খাঁচাটা যেন ভীষণ নড়ে ওঠে। তারপর ভেতর থেকে আমাকে কেউ উত্তর দেয়, মানুষের সারভাইবাল পাওয়ারই এই ভূগোলের মূল শক্তি। সুতরাং বেঁচে থাকাই ধর্ম। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও।
সারা শরীরে প্রচণ্ড শীত অনুভব করি আচমকা। কোনো কিছুই সহ্য হয় না। ঠান্ডায় জমে যেতে চায় শরীরের সব কলকব্জা। শরীর কাঁপতে থাকে। প্রত্যেকটা শব্দ আমার কানে এক একটা বরফের দলা হয়ে আছড়ে পড়তে থাকে।
চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে। কোনো কথাই মগজে ঢোকাতে ইচ্ছে করে না। প্রাণপনে নিজের ভেতর ওৎ পেতে থাকা মানুষটাকে ভুলে থাকতে চাইছি খানিকটা সময়ের জন্য। ভাবনা থেকে আড়াল করতে ইচ্ছে করে তাকে।
নিজের আপাদমস্তকে একবার চোখ বুলানোর চেষ্টা করি।
এই দেহ আমার। কী ভয়ঙ্কর আর পরমুখাপেক্ষী একটা দেহ। সারা শরীর রি রি করে ওঠে। মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। পা দুটো আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। শত চেষ্টায়ও সাড়া দেবে না বলে মনে হয় না। আর কখনো দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে এই মাথা উঁচু করে আকাশটা একবার দেখা সম্ভব হবে না একবার ভাবি। অসহায় বোধ করি । কী বিশাল পৃথিবী। অথচ আমার পৃথিবীটা কত ক্ষুদ্র। টিকটিকির শরীরের সমান। একটা টিকটিকি পা দিয়ে ঢলার সামর্থও আমার নেই। কেবল চোখ দুটো এই দুর্বোধ্য জীবনের সকল গ্লানির সাক্ষী। জীবনের অর্থহীন মুহূর্তগুলো স্মৃতির ভেতর চালান করে দিয়ে যাচ্ছে সযতেœ। কিন্তু আজ এই চোখ দুটোও যেন আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। বারবার উপহাস করছে।
খুব দ্রুত একটা সীদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি আমি। একটা বোঝাপড়া আজ আমাকে করতে হবে। আর কোনো দায় আমি নিতে পারব না। আর কোনো গ্লানি বয়ে বেড়াতে চাই না। হাতের পাশে থাকা ক্র্যাচ দুটো নিজের আয়ত্তে নেয়ার চেষ্টা করি। আমাকে ছুটতে হবে। এখান থেকে পালাতে হবে। কোথায় পালাব তা আমি জানি না। তবু পালাতে হবে। সবার অস্তিত্বের বাইরে চলে যাওয়া ছাড়া আমি থামব না।
এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরে নিজের মধ্যে এক ধরণের পুলক অনুভব করি হঠাৎ। আহ্।
একটা বিরাট পাথর বুকের উপর থেকে নেমে গেল। কিন্তু কোথায় পালাব আমি? জীবনের অন্য কোনো মোড়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে কি কোনো সুসংবাদ? এই ক্লান্তিকর দিনগুলো থেকে কীভাবে মুক্তি মিলবে? আনমনে নিজের দিকে পুনরায় চোখ রাখি। নিজের ভেতরের মানুষটা এখনো দিকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখের পাতায় নড়চড় নেই। পরনের কাপড়গুলোর দিকে আরেকবার ভাল করে চোখ বোলাই। চেহারাটা আগে কখনও দেখেছি কিনা আরও একবার মনে করার চেষ্টা করি। নাক, চোখ, কানের লতি এমনকি থুতনির নিচের বিশেষ কালো দাগটাও খুটিয়ে খুটিয়ে দেখি। কোনো কিছুই আমিআন্দাজ করতে পারি না। একটা অপরিচিত লোক আমার দিকে ভয়ানক নির্লিপ্ততা নিয়ে তাকিয়ে আছে। ছায়ার মতো অনুসরন করছে। ধীরে ধীরে চোখ দুটো সরিয়ে নিই। আলগোছে অসাড় পা-দুটোকে হাতের ক্র্যাচ দিয়ে সচল করার চেষ্টা করি। ক্র্যাচের উপর শরীরের ওজনটা দিয়ে খুব সতর্কভাবে উঠে দাঁড়াই। আর কখনো তার দিকে চোখ ফেরাব না মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি। তার অদ্ভুত শরীরের মুখোমুখি হবো না।
খাঁচার চক্কর থেকে সহসা মুক্তি পাচ্ছি ভেবে এক ধরণের সুখ অনুভব করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে আচমকা একটা অট্টহাসি খাঁচাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। হাসির দমকে কেঁপে কেঁপে ওঠে সবকিছু। সভয়ে আমি পুনরায় তার দিকে তাকাই। নিজের প্রতিজ্ঞার কথা মুহূর্তেই ভুলে যাই। একটা অদ্ভুত দৃশ্য আমাকে হতভম্ব করে দেয়।
আমার শরীরটা চোখের সামনে বড় হতে থাকে ক্রমশ। ধীরে ধীরে সারা খাঁচায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পুরো খাঁচা আমার শরীরে ঢেকে যায়। অনেকগুলো দর্শনার্থী খাঁচার বাইরে থেকে মাথাটা বের করে আমার দিকে বিহ্বল নয়নে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে কোনো নড়চড় নেই।
নিজেকে আর চিনতে পারি না। নিজের শরীরটাই আমার কাছে ক্রমশ একটা গোলকধাঁধা হয়ে ওঠে। প্রাণপনে এই গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। ক্র্যাচে ভর দিয়ে কী করব বুঝতে উঠতে না পেরে হঠাৎ দৌঁড়াতে থাকি। সাথে সাথে সারা খাঁচাজুড়ে প্রচন্ড রকমের ভাঙ্গনের শব্দ হতে থাকে। একটানা অনেকক্ষণ ধরে এই শব্দ কানে আসে। পুরো খাঁচা যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। খাঁচার ভেতর থেকে একের পর এক বেরিয়ে আসতে থাকে অসংখ্য টিকটিকি। প্রত্যেকটা টিকটিকির একই রকম চেহারা।
আমি প্রাণপনে দৌঁড়াতে থাকি। খাঁচার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা টিকিটিকিগুলো আমার পলায়নপর শরীরটা এক নজর দেখে আমার পিছু নিতে থাকে।
খাঁচার প্রাণীদের আর্তি ও বেদনাই যাদের মনোরঞ্জনের হাতিয়ার সেইসব অপেক্ষমান দর্শনার্থী তীব্র সুখ ও উল্লাসভরা চোখে আমাদের পলায়নপর শরীরটা অনুসরণ করতে থাকে।

ঘুম ভাঙার পর দেখি একটা টিকটিকি আমার ঘরের দরজার একেবারে মাঝ বরাবর চিৎ হয়ে পড়ে আছে আর বিছানার পাশেই মলিন দুটো ক্র্যাচ আমার শরীরের কান্তি নিজেদের শরীরে চেপে চুপ করে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে আমাকে।
...