মরফিউস ও একটি ঐশ্বরিক ব্যাখ্যাঃ শয়নে ফ্রয়েডে জাগরণে

প্রশান্ত সরকার



no guarantees at all, and yet we bow more often than is objectively to the compulsion to believe what it says”
Sigmund Freud, The Interpretation of Dreams

কিজানি এতক্ষণ ধরে কিসের একটা ঘোর কাজ করছিল, কিন্তু এখন স্মৃতিরা আপাতত নিষ্ক্রিয়... কিছুটা সিজোফ্রেনিক। একটা সহজ যুক্তির উপমা খুঁজতে খুঁজতে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছিলাম ব্যঞ্জনায়, একটা বিস্মরণ কীভাবে একটা সমাধান হয়ে উঠতে পারে, একটা পরিমণ্ডল কীভাবে একটা গোটা পৃথিবী। যেখানে আর কিছুই সেভাবে মনে পড়ছে না সেখানেই বৃষ্টি হচ্ছে দেদার... ধুলোর পরত সরিয়ে সম্ভাবনাগুলো ক্রমশ জেগে বসছে। আর আমি পিছিয়ে পড়ছি একে একে দিন, মাস, সাল, তারিখ, ঋতু, জন্ম... কোনও অনুলিখন নেই তবু নিয়মমাফিক যেন ফিরে ফিরে যাচ্ছে সব। ফিরে যাচ্ছে যেন অলৌকিক ট্রেন এক, যার কোনো তাড়া নেই ফিরে যাবার অথচ ফিরে যাওয়াটুকু আছে। আর তার প্রত্যেকটা ফিরে যাওয়ার অভিঘাত একটু একটু করে পেয়ে বসছে আমাকে। অথচ আমার কোনও স্মৃতি নেই আর নিদেনপক্ষে কোনও জন্মদাগ বা আর অন্যকিছু যা শুধু একটা মানুষের প্রবৃত্তি হয়ে উঠতে পারে অনায়াসে...
সিগন্যালে এসে মুছে যাচ্ছে এখন সমস্ত প্রত্যয়... আর একটা ঘোরের বিকল্প ঘোর হয়ে উঠছি আমি।

“Dreams are never concerned with trivia”
Sigmund Freud, The Interpretation of Dreams

ধরা যাক এও এক ব্যতিক্রম। ধরা যাক স্বপ্ন কোনো সমীকরণ নয়... শুধুই একটা নিশ্চয়তার থেকে আরেকটা নিশ্চয়তা বা অনিশ্চিতের দিকে হেঁটে যাওয়া। এক্ষেত্রেও আমরা ততটাই অপারগ যতটা পরিমিতি। রাস্তাগুলো এখানে একেকটা প্যারামিটার হয়ে ঝুলে আছে শূন্যে। আমি দেখতে পাচ্ছি পাখিগুলো ফিরে আসার পথ ছেড়ে আরও দূরে সরে সরে যাচ্ছে... আর আমরা যতটা পারছি দূরত্ব বজায় রাখছি বয়নক্ষমতার সাথে। প্রতিটা ঘেরাটোপ ছেড়ে জানলার সামর্থ্য নিয়ে বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছি সমস্ত ব্যর্থতা, যেখানে আকাশ কোনও সীমারেখা নয়, বরং শুধুমাত্র একটা চৌহদ্দি বলা যেতে পারে। সহজ শীৎকার থেকে উড়ে যাচ্ছে অনিদ্রার আলোচ্য আভাসটুকু, যেখানে আর অন্য কোনো মাধ্যম নেই, রাস্তাগুলো ক্রমশ মায়ের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যন্ত্রণার দিকে, তৃপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে... অথচ তুমি বলছ এ সবই ব্যতিক্রম।
প্রসঙ্গান্তরে যদি ধরেও নিই এর কিছুই আসলে ব্যতক্রম নয়, আসলে পাঠ বহির্ভূত, তাহলে দেখতে পাবে শেষমেশ কোনো ভাগশেষই রইল না আর, যা আবারও একটা জন্ম দ্বারা বিভাজ্য হতে পারে।

“The dream is the liberation of the spirit from the pressure of external nature, a detachment of the soul from the flatters of matter.”
Sigmund Freud, The Interpretation of Dreams

একটা সম্ভাবনা ফুরিয়ে আসছে ক্রমশ। বিরক্তির দিকে হেঁটে যাচ্ছে একটা পরিচিত উষ্মা। বস্তুত একটা সাদামাটা জীবন তখনই স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠতে পারে যখন আর কোনো চাওয়া পাওয়া এক্সিস্ট করে না। শুধু পারিপার্শ্বিক বোঝাপড়াগুলো আমাদের খিদে বাড়িয়ে দেয় ক্রমশ। আর আমরা প্রত্যেকেই এস্কেপিস্ট হয়ে উঠি কোথাও না কোথাও। তবু ট্রপোস্ফিয়ার থেকে নেমে আসে বিসদৃশ পাখিদের ঝাঁক। যেখানে আলোর কোনো অভিঘাত নেই সেখানে ডানার ভরবেগ শূন্য ধরে নিলেও মিলে যাবে সিঁড়ির সমাধান। আসলে স্বপ্ন একটা মোহ, একটা সান্ত্বনা, একটা ক্ষয়। বিশেষত যেখানে সব সিঁড়িগুলোই কেন্দ্রাতিগ, একটাই ছায়াকে অনুকরণ করতে করতে মুছে ফেলছে তার অতিভুজের ধারণা। এখানে সব কোণগুলোই সমকোণ হলেও হতে পারত অথচ একটা ভূমির যৌক্তিকতা সেটা কিছুতেই হতে দিচ্ছে না। তাই পারতপক্ষে এখানে সব কোণের মানই শূন্য। যখন ঘুমের আর কোনো নামান্তর নেই। যেখানে নাম শুধুমাত্র একটা কাল্পনিক অনুরণন।
কয়েকটা মুহূর্ত বাজতে বাজতে সমস্বরে বেজে যাচ্ছে ঘড়িদের চাহিদা। সময় এখন আর ততটাও নির্দিষ্ট নয় যতটা তার বিন্যাস। অতএব হে অযান্ত্রিক, তুমিও প্রসব করো আরো কিছু শূন্যের ব্যবধান যারা একযোগে মহাশূন্যের সুত্র হতে পারে, যাতে সমীকরণের মানই একরৈখিক না হয়ে যেতে পারে। যেখানে আমরা সকলেই জানি পৃথিবীতে ধ্রুব বলে কিছু নেই, তথাপি যেটুকু ধ্রুবক বলে জানি সে কেবল পূর্বনির্ধারিত কিছু মুহূর্তের ফেনা। এসো আমরাও সমাধানে আসি, পৃথিবীর সমস্ত আত্মার... হাত গুণে দেখে নিই পূর্বজন্মে কোথাও কোনো পাপ রাখা ছিল কিনা।

“The dream has no way at all of expressing the alternative ‘either…or’. It usually takes up the two options into one context as if they had equal rights.”
Sigmund Freud, The Interpretation of Dreams

সমস্ত আলোরই তবে একাধিক অভিমুখ থাকে। নির্দিষ্ট আলোড়নে শুধু ভেসে যায় সমস্ত মুখ কিম্বা মুখের আদলেই কিছু রেখে যাওয়া অনুমানটুকু, কোনও এক শর্তসাপেক্ষে। অথচ সে সমস্তটাই আপেক্ষিক জেনেও প্রকৌশলে বুঝে নিই বিকল্প চেনার উপায়। পিঁপড়েরা যেরকম... আলোটুকু খুঁটে খুঁটে নিয়ে যায় নিজের উঠোনে, আলো ভরে রাখে নিজেদের ঘরদোর। দেখো এর কোনো বিকল্প নেই অথবা এই সমাধান এতটাই সরলরৈখিক যে আলাদা করে কোনো বিকল্পের প্রয়োজন পড়ে না। উৎস দ্বিপাক্ষিক হলে সমাধানও বহুগামী হয়। এ তো সহজ নিয়ম। স্বপ্নের যে বহুগামিতা আছে আর আছে বলেই ঘুমের ভেতর টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছ ক্রমশ। আলো থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে চলছে অতিলৌকিক রেখাচিত্র অথচ এ সমস্তটাই কিন্তু একটা সম্ভাবনা মাত্র। নির্দিষ্ট কোনো সমাধান পেতে হলে নতজানু হয়ে হয় সময়ের কাছে, আলোর প্রতিটা ফ্যাক্টরের কাছে, ঘটনাপ্রবাহের কাছে আর শরীর ক্রমশ কথা বলে ওঠে।

রাস্তাগুলো এখনও পড়ে আছে দ্বিধায়... আর পাখিরা কোনদিকে যাবে সেটা ঠিক করতে পারেনি এখনো। একটা ঘুম... ঘুমের ভেতরকার শ্বাস... তার অন্তর্বর্তীকালীন শব্দসমূহ... আরো আরো বেশী বহুগামী করে দিচ্ছে আমাকে। যখন আলোর উপমা ছেড়ে ডানার নির্ভরতা শুধু ভেসে থাকে স্থানীয় নির্ভারে। জানলা থেকে সহজলভ্য হয় যত পিঁপড়ের সঞ্চিত আলো।

“The process of dreaming transfers physical intensity from what is important, but also objectionable, onto what is insignificant.”
Sigmund Freud, The Interpretation of Dreams

কথা ছিল এভাবেই স্থানান্তর করে দেবে শরীর তার অজস্র যোগ্যতা। সমস্ত অভিসন্ধি যেখানে অপ্রয়োজনীয় সেখানে আর অন্য কোনো অবকাশ নেই। শুধুমাত্র কিছু ভ্রান্ত ছায়াপথ কখনোই পথ হতে পারে না কারো, বরং নির্ধারিত দিনে সরে যাওয়া ভালো, যা কিছু প্রতিসরণযোগ্য... যা কিছু ঈষৎ প্রদাহময়। একসময় ঘুম চলে এলে... কী নিঃস্পৃহ, চলে যাবে ব্যক্তিগত শয়ানের খেদ। একজন বয়স্ক যুবক শুধু হ্যাট-কোটে পেরিয়ে যাবে নিরস্ত্র মানুষের ঢল। স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে করতে মুছে যাবে তন্দ্রার সমস্ত উপকরণ। যেটুকু মায়াবী সেটুকুকেও নাকচ করে রেখে যাবে তারও সহজ সমাধান। এখন দুপুরের কাছেই যতটা গ্রহণযোগ্যতা আমার, ততটা আর কারো কাছে নেই। তাপমাত্রা জুড়ে জুড়ে আরও কিছুটা বড়ো মনে হচ্ছে ছাদ, পিঠোপিঠি বসে যাচ্ছে প্রতিবেশীর গার্হস্থ অসুখ... মাংস সুঘ্রাণে। এখানে যদি বলো এসবই আসলে প্রত্যক্ষ খরতা আমার তাহলে এতকিছুর পরেও আমি আপত্তি করব না এতটুকু। হতেই পারে যখন প্রত্যেকটা রুগ্ন দুপুর আমার কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে উঠছে তখন কোনোকিছুই আর তুচ্ছ নয়। এমন প্রত্যয় নিয়ে জেগে থাকাও স্বপ্নের আরেকটা নামান্তর হতে পারত। ধূসর অবিচুয়ারি থেকে ভেসে আসত বহমান পাখিদের নির্জনতা। ততক্ষণ এসবের কিছুই আর ততটা প্রান্তিক নয় যতটা মনে হয়েছিল সেই সময়। এক একদিন এমন ভেসে থাকতে থাকতেও তো কতবার মাছের স্বপ্ন দেখেছি, দেখেছি চোখ খোলা একটা মাছ... গভীরে যেতে চেয়েও যেতে পারছে না। একটা আধখোলা জানলা তাকে এতটাই মায়া করে রেখেছে।

“Dream-displacement and dream-condensation are the two foreman in charge of the dream-work, and we may put the shaping of our dreams down mainly to their activity.”
Sigmund Freud, The Interpretation of Dreams

কখনো কখনো তো স্বপ্নও বেঁধে দেয় ঘর। চার দেওয়ালের মধ্যে থেকে ডিসকোর্স হয় চূড়ান্ত সম্মোহন, মেঝে জুড়ে অধক্ষেপ পড়ে থাকে তার। চ্যাটচ্যাট করে অবচেতনের উদ্বৃত্তে, এমন অভিযোজন নিয়ে কখনো কখনো ঘুম চলে আসে। তখন বারোমাস খাটের নীচে জল, চিলেকোঠায় কারা যেন বুনে যায় বাতাসের অগণিত স্তর। অথচ একটা স্বপ্নের ভেতর বাড়তে বাড়তে কখন বেলা বেড়ে যায় খেয়াল থাকে না। তবু কোথাও না কোথাও একটা ঘোর থেকেই যায়... আলোর বশবর্তী।

শুধু বারবার মনে পড়ে একটা সহজ যুক্তির উপমা খুঁজতে খুঁজতে এই আমার এতদূর আসা... কতগুলো জন্ম কাটিয়ে শুধুমাত্র একটা তীব্রতা লক্ষ্য করে বহুজন্মের রেশ ধরে শুধু এই হেঁটে হেঁটে যাওয়া... যার নিজস্ব কোনো অভিঘাত নেই, আসলে ছিলই না কখনো। হয়তো এই আমাদের স্থায়ী পরিসর... আসলে কোনো রাস্তাই ঠিক কোথাও পৌঁছায় না... অন্তত যতক্ষণ মাথাভর্তি আলো রয়ে গেছে।