তৃষ্ণা কিংবা স্বপ্নপুরাণ

এমদাদ রহমান



দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক
এই দুনিয়া ঘোরে বন-বন-বন-বন
ছন্দে ছন্দে কত রঙ বদলায়... রঙ বদলায়...
কখনো পিঙ্গল কখনো সবুজ
কখনো বুঝি আর কখনো অবুঝ
হৃদয় দিলে যার হৃদয় মেলে
হৃদয় যাবে সে কাল পথে ফেলে
গোলকধাঁধা রে ভাই, তাই লেগেছে তাক
এই দুনিয়া ঘোরে বন-বন-বন-বন
ছন্দে ছন্দে কত রঙ বদলায়... রঙ বদলায়
এই ঘুরন্ত নাগরদোলায়
কখন কাঁদায় আর কখন ভোলায়
কখন শাদা আর কখন কালো
কখন মন্দ হে কখন ভালো
জীবন জুয়ায় বীর- জিতে গেলে
বোকার হদ্দ যদি হেরে গেলে
কপাল মন্দ আজ, কাল চিচিংফাঁক
এই দুনিয়া ঘোরে বন-বন-বন-বন
ছন্দে ছন্দে কত রঙ বদলায়... রঙ বদলায়... কোথা থেকে ভেসে আসে এই গান! দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক... কেমন এক ঘোর যেন! অন্ধকার। আশ্চর্য প্রতিমা। নশ্বর স্রোত। নাগরদোলা! আমি আচ্ছন্নের মতো সমুদ্রকে ডাকি... আমার হাতে পুরোনো চিঠি। এই চিঠিগুলি... পুরোনো এই চিঠিগুলি...
হলদে পাতা। বিষণ্ণ। পুরোনো। আমার কাছে জমিয়ে রাখা চিঠি, মানে শব্দে শব্দে বিলুর অদ্ভুত সব স্বপ্ন। স্বপ্নপুরাণ। এখন কেমন মনোটনাস।
একটায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের বৃষ্টি। আবার শ্যামলের গল্প। গল্পের বেশকিছু ভাললাগা লাইন। বিলুর প্রিয় ছিল। কোনওকোনওটায় হার্ট ক্রেনের কবিতার উল্লেখ, সঙ্গে শক্তিও।
ট্রেন ডাকছে।
কোন এক স্টেশন থেকে ভেসে আসছে এক দূরগামী ভোঁ... বিলু কোথা থেকে এত প্রাজ্ঞতা কুড়িয়ে এনেছিল? কীভাবে লিখল সে আশ্চর্য এই কথাগুলি-
এই যে বসে আছি আমরা, আমাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে গেছে যে আশ্চর্য সময়, তারাই কি পাথর হয়ে পড়ে থেকেছে প্রান্তরে! এই যে নিঃসঙ্গতায় বসে আছি আমরা, আমরা কি তবে পাথরের মূর্তি? আমাদেরকে গড়েই কি তবে ঈশ্বরের মনে নশ্বরতার ধারণা এসেছিল? ঈশ্বরের মনে হয়েছিল তিনি তবে রূপকার... তারপর আরও কি কি সব অদ্ভুত কথা লিখেছিল বিলু। একটা চিঠির শেষে এরকম একটা লাইন লেখে বিলু। নাটকের আগাগোড়াই মানুষ।
তারপর সেই গান- দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক
এই দুনিয়া ঘোরে বন-বন-বন-বন
ছন্দে ছন্দে কত রঙ বদলায়... রঙ বদলায়... আমি শূন্যতায় ভাসি। ভেসে ডুবে খাবি খেতে খেতে তোমাকেই ডাকতে থাকি। সঙ্গে নাও। সঙ্গে নাও। শব্দটিকে নিঃসঙ্গতা বলে! নিঃসঙ্গতা। আমি তাকিয়ে থাকি। জুনের আগেই, মানে এপ্রিলের শুরু থেকেই রাত ছোট হয়ে এসেছে অনেক। আলো ফুটতে শুরু করেছে। মেলকিয়াদেসকে মনে পড়ে? আমার পড়ে। লোকটিকে মনে পড়ছে খুব। সে ফিরে এসেছিল। আমি তার সঙ্গে কথা বলছিলাম। মার্কেজের শত বছরের নিঃসঙ্গতার সেই বুড়ো জিপসি। ফিরে এসেছিল। আরাকাতাকায়। আমি নিরুদ্দেশ যাত্রার রঞ্জুর মতো হয়ে যাই। ট্রেন ডাকছে। আবারও। ইলিয়াসের এই গল্পে কি বৃষ্টি ছিল? নেমে এসেছিল? খুব তীব্র ইচ্ছা করে একটা গান শুনি, ইউটিউবে। তুমি রবে নীরবে- বুকটায় তুমুল হাহাকার। হঠাৎ এই গান কেন? বিড়াল ডাকছে। এক চুমুক ওয়াইন। চোখ জড়িয়ে আসছে। ধীরে ধীরে, ধীরে রোহিনী, ধীরে-
জাগিবে একাকী তব করুণ আঁখি,
তব অঞ্চলছায়া মোরে রহিবে ঢাকি।
মম দুঃখবেদন মম সফল স্বপন
তুমি ভরিবে সৌরভে নিশীথিনীসম... আবারও সেই ট্রেন। এত ট্রেন। এত যাত্রা। সেই সন্ধাগুলি। কী অদ্ভুতভাবেই না নেমে এসেছিল। ডানার রোদের গন্ধ মুছে ফেলে চিল। অন্ধকার। আমি নিকোটিনে ডুবে যাই। তীব্র একটা টানে আমি যেন পাতালে নামি। এক চুমুক ওয়াইন। তুমি রবে নীরবে... বিলু রে... প্যারিস রিভিউয়ে হোর্হে লুইস বোর্হেসের সাক্ষাৎকার। অনুবাদ করতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু কি একটা যেন ভেঙে পড়ে গেল। শব্দ না স্বপ্ন টেরই পেলাম না। বোধ হয় ইতিহাসেরই স্বপ্নভঙ্গ হলো। গত রাতে স্তেপের উপাখ্যানে গুলসারির মৃত্যুর পর সেই যে এক হতাশা। সব কিছু ভেঙে পড়ে। কিছুই কি থাকে না?
বৃষ্টি। আকাশ কালো হয়ে নামা বৃষ্টি। পড়তে থাকুক। বেঁচে আছি। অদ্ভুত লাগছে। কীভাবে বেঁচে আছি? স্বপ্নে? স্বপ্নে পাওয়া দিনে বেঁচে থাকে কেউ? পারে? সাক্ষাতকারী রোনাল্ড ক্রিস্টকে বোর্হেস জিজ্ঞেস করছেন-
: Where are you from?
: From New York.
বোর্হেস বলছেন : Ah, New York. I was there, and I liked it very much-- I said to myself: 'Well, I have made this; this is my work.'... ক্রমাগত এক ধাঁধার ভিতর ঢুকে যাওয়া... সেই যে খেয়ে না খেয়ে কিনে ফেলা অজস্র বই, কত দূর ফেলে এসেছি! অপঠিত থেকে গেছে কত। আর না শোনা গানগুলি! অক্ষরগুলি বুঝি স্বপ্নে ভেসে ভেসে বেড়ায়। স্বপ্নে আসে। পাহাড় আর স্তেপের উপাখ্যান। গুলসারির মৃত্যু। আহা মৃত্যু। মৃত্যু কি? জীবনের শেষ? জীবনের বুঝি কোনও শেষ আছে? আহা, কাঁটায় আটকে থাকা চুল। মাজেদির সিনেমায় দেখা। হঠাৎই বৃষ্টি নামে। ঝুপ করে নামে... ছোট্ট গোলাপ, আমার হৃদয়কে দেখো, এখানে ব্যথা। আজ কী মনে করে কয়েকবার দেখে ফেলা ছবিটি আবারও দেখতে শুরু করলাম। নো ম্যান'স ল্যান্ড... স্বপ্ন। বেঁচে থাকবার অদ্ভুত স্বপ্ন, স্বপ্নের চক্কর, যেন অবিরাম এক সাইকেল চালাচ্ছি। ভায়োলেট এভিনিউ থেকে চিলটার্ন কোর্ট- অবিরাম সাইকেল। আমি যেন জয় গোস্বামী। বৃষ্টি পড়ছে। ছত্রিশ বছরের জীবনের ওপর ঝরে পড়ছে জল। আবেগে না আক্রোশে বোঝা যায় না। ডুবে যাবে সব। আমি সমুদ্রকে ডাকছি... বিলুর কথাও যেন অবিরাম স্বপ্ন দেখার মতো বেজে চলেছে- নাটকের আগাগোড়াই মানুষ... কে যেন গাইছিল- দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক
এই দুনিয়া ঘোরে বন-বন-বন-বন
ছন্দে ছন্দে কত রঙ বদলায়... রঙ বদলায়... স্বপ্ন। দেখলাম- আমরা সব পাথরের মূর্তি। আমরা কারা বুঝতে পারছিলাম না। দেখলাম, পার্কের বেঞ্চিতে আমি ও বিলু। দেখলাম- বৃষ্টিতে ভিজছি। ঘুম ভাঙতেই চমক। এত ভোরে আমি কীভাবে ম্যাগনোলিয়ার কাছে এলাম!