প্রিয় পরকীয়া এবং দ্বিতীয় জগত আমার

রাসেল রায়হান




আজ রিংকিকে স্বপ্ন দেখলাম।
রিংকির প্রেমে আর ইন্টারমিডিয়েটে আমি একই সাথে পড়তে শুরু করেছিলাম। সেসব কৈশোরকাল এবং কৈশোরকালীন প্রেম ফুরিয়ে গেছে দশ বছর আগে। এখন পাশে স্ত্রীর নাক ডাকার শব্দ শুনতে শুনতে আমি উৎপল কিংবা সিকদার পাঠ করি। হয়তো একটা পঙক্তি এক মুহূর্তের জন্য সেসব কৈশোরকালীন বাইসাইকেল আর বারান্দার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমকে মনে করিয়ে দেয়, নস্টালজিক হতে হতে ঘুমিয়ে পড়ি। আমি জানি আমার স্ত্রী কোনো স্বপ্ন দেখে না, যেহেতু একই সাথে নাক ডাকা আর স্বপ্ন দেখা সম্ভব নয়, একইভাবে আমি জানি যে আমি কখনো নাক ডাকি না, যেহেতু অজস্র স্বপ্ন দেখি ঘুমে। আজ দেখলাম রিংকিকে। দশ বছর বড় হয়ে গিয়েছি, অথচ রিংকি এখনো ষোল বছরের রয়ে গেছে। আরও দশ বছর পরেও রিংকি ষোল বছরের থাকবে, তার দশ বছর পরেও, যদি না এর মধ্যে তার সাথে আমার দেখা হয়ে যায় কখনো।
আমি চাই না দেখা হোক। এখনো স্বপ্নে তাকে আমি ষোড়শী দেখতে চাই, এখনো কালো ফ্রেমের চশমায় তাকে আমার তেমনই ভালো লাগে। আর ভয় হয়, বাস্তবে তার চশমার ফ্রেম পালটে গেছে কি না। ভয় হয়, এই সুন্দর সীমাবদ্ধ স্বপ্ন ছিনতাই হয়ে যাবে কি না।

জীবন্ত একজন মানুষের আসলে জগত দুইটা। একটি ঘুমের জগত, একটি জাগরণের। জাগ্রত অবস্থায় একটি জগতকে দীর্ঘ মনে হয়, ঘুমন্ত অবস্থায় অন্যটিকে। ঘুমন্ত জগতটি, মানে যেটিকে আমরা স্বপ্ন বলি, সেটিকেই বেশি ইন্টারেস্টিং এবং লাভজনক নিরাপদ মনে হয় আমার কাছে। জাগ্রত জগতে টানা দু-তিন বছর হাবুডুবু খেয়েও আমি রিংকিকে একবার বলতে পারিনি ভালোবাসার কথা, অথচ স্বপ্নে তাকে আমি লক্ষ লক্ষ ভালোবাসার বাক্য বলে গিয়েছি নির্দ্বিধায়।
এমনিতে ঘুমের মধ্যে লেখা পাওয়ার বাস্তব অনেক ইতিহাস আছে। মুসলিম সমাজে অসাধারণ একটি দরুদ আছে, প্রায় সব মিলাদ-মাহফিলে ভক্তি এবং ভালোবাসাভরে পাঠ করা হয়, ভয়াবহ জনপ্রিয় চারটি পঙক্তি : বালাগাল উলা বি-কামালিহি/ কাশাফাদ্দুজা বি-জামালিহি/ হাসুনাত জামিয়ু খিসালিহি/ সাল্লু আলায়হে ওয়া আলিহি। সাড়ে আটশ বছর আগে বিখ্যাত সাধক-কবি শেখ সাদি’র লেখা। এই রুবাইয়াৎটির তিনটি পঙক্তি লিখে চতুর্থ পঙক্তিতে এসে আটকে যান তিনি। মাসের পর মাস অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়ান, চতুর্থ পঙক্তিটির জন্য। কিছুই মনমতো হয় না। যেটাই লেখেন না কেন, অপূর্ণ মনে হয়। কথিত আছে যে এমন এক অস্থির সময়ে রাসুল (স) তাকে স্বপ্নে দেখা দেন এবং নিজে চতুর্থ পঙক্তিটি বলে দেন। লেখা হয় মুসলিম জাতির মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় এবং বহুলপঠিত এই দরুদটি।
স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙলে তৎক্ষণাৎ ‘ড্রিম ডায়েরি’ নামের একটা খাতায় সেটি লিখে রাখতেন গ্রাহাম গ্রিন, জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। মেরি শেলির ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’- র প্লট স্বপ্নে পাওয়া, স্টেফেনি মেয়ারের বেস্ট সেলার ‘টোয়াইলাইট’-এর থিম স্বপ্নে পাওয়া। এমন অজস্র উদাহরণ টানা যাবে। রিংকির সাথে স্বপ্নে যা যা বলেছি, তা নিয়েও অমন অসাধারণ একটি মহাকাব্য লেখা যায় অনায়াসে। দুর্ভাগ্য যে দশ মিনিটের মধ্যে একেকটি স্বপ্নের নব্বই ভাগই ভুলে যায় মানুষ। আর আমার ঘুম ভেঙেই স্বপ্নের রেশটা ধরে রাখতে ভালো লাগে, লিখতে না।

জাগ্রত জগতে কম্পিউটার ক্লাসে রিংকিকে একবার দেখার জন্য তার বসার জন্য স্থায়ী আসনটির পেছনে ঝোলানো জনতা ব্যাংকের দেওয়া ক্যালেন্ডারে বারবার তারিখ দেখার ভাণ করতে হতো। এনার্জি কোম্পানির সৌজন্যমার্কা ঘড়িতে বারবার তাকাতে হতো। কম্পিউটার টিচার বিরক্ত হয়ে বলতেন, বারবার ঘড়ি দেখছ কেন? শুধু ক্লাসের বাইরে মন! এদিকে মন দাও!
একটু সময় স্যারের দিকে মনোযোগী হয়ে আবার আমার মনোযোগ চলে যেত রিংকির পেছনের ঘড়ি আর ক্যালেন্ডারে। অথচ স্বপ্নে আমি তার দিকে বেহায়ার মতো তাকিয়ে থাকতে পারি, সেজন্য ক্যালেন্ডার বা ঘড়ি দেখার বিচ্ছিরি এবং চরমভাবে অনিরাপদ অভিনয়টা করতে হয় না। অন্যরা কেউ আমাকে তখন দেখতে পায় না, কিংবা দেখলেও কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করে না। রিংকিও আমার দিকে তাকিয়ে আস্কারামূলক হাসি দেয়। আমি আরও তাকিয়ে থাকি। বেহায়ার মতো তাকিয়ে থাকি, লোভীর মতো তাকিয়ে থাকি, লালসাসক্ত অসভ্য পুরুষ, যাকে নারীবাদীরা পেলে ছিঁড়ে ফেলবে, তার মতো তাকিয়ে থাকি।
স্বপ্নে সবকিছু আমার জন্য বৈধ। এমনকি রিংকির বাস্তব প্রেমিকটিকে আমি চাইলে হত্যাও করতে পারি, যার বদলে আমার ফাঁসিতে ঝোলার সামান্যতম ভয়ও নেই। অথচ ভিক্ষে দেওয়ার ভঙ্গিতে আমি তার প্রেমিকটিকে করুণা বিলাই, কারণ রিংকি তার দিকে একবারও তাকায় না। আমি সেটা দারুণ উপভোগ করি। আর উপভোগ করি নিজেকে সম্পূর্ণ দেখার ব্যাপারটিকে।
প্রেমে পড়ার সাথে বই বা উচ্চতার যেমন কোনো সম্পর্ক নেই, তেমনি স্বপ্ন দেখার সাথে চোখের কোনো সম্পর্ক নেই। স্বপ্ন এমন একটি সুবিধাজনক বিষয়, যেটি আপনার ঘুমকে আরও লোভনীয় করে তোলে এবং যেখানে আপনি একইসাথে পুরোপুরি অংশগ্রহণ এবং নিজেকে পুরোটাই দেখতে পারেন। শুনেছি ইজিপ্সিয়ানরা খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে প্রথম ড্রিম ডিকশনারি তৈরি করে। সেই ডিকশনারিতে কী থাকে? স্বপ্নের অর্থ? স্বপ্নের কি আলাদা কোনো শব্দ আছে? নাকি সেখানে লেখা থাকে স্বপ্ন দেখার পদ্ধতি? ফ্রয়েড ভদ্রলোক জানতে পারেন। তাকে কোনোদিন স্বপ্নে দেখিনি, দেখলে জিজ্ঞেস করতাম।
অমন ডিকশনারি শেষ কারা করেছে? রিংকিকে নিয়ে দেখা এসব স্বপ্নের অর্থ অবশ্য জানার ইচ্ছে আমার কখনো ছিল না। ইচ্ছে আছে, কী করে এসব স্বপ্ন রোজ দেখা যায়—তার কোনো বুদ্ধি আছে কি না!

আমার স্বপ্নে শুধু অপরাজিত প্রেমিকারাই আসে। বাল্যের প্রেমিকা, যখন শরীরবৃত্তীয় কোনো ধারণাই জন্মেনি আমার, তারাও আসে মাঝেমাঝে। তখন আমিও স্কুলড্রেস পরা বালক হয়ে যাই। এক টাকার কুলফি আইসক্রিম কিনে একেকজনকে একেকদিন ডাকি, ‘আয়, এক কামড় খা।’ তারা আর ভিখিরি তাড়ানোর ভঙ্গিতে তখন বলে না, ‘যা যা। তোর আইসক্রিম আমি খাই না!’ বরং এক কামড় আইসক্রিম খেয়ে হাসি দিয়ে বলে, ‘আজ আমার পেছনে বসিস, অংক দেখাব।’ আমি ক্লাসের পর একেকদিন একেকজনের পেছনে বসি, অংক দেখি। স্যারের মারের হাত থেকে বেঁচে যাই।
আশ্চর্য ব্যাপার, স্বপ্নের বালক বন্ধুরা তখনও অংক করার সময় খাতা ঢেকে লেখে। এমনকি আইসক্রিম খেয়েও একজন খাতা এমন ঢেকে অংক করছিল যে আমি আমার মাথা ঝুঁকিয়ে প্রায় তার বেঞ্চের সামনে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন খুব মার খেলাম স্যারের হাতে, স্বপ্নেই। তারপর থেকে আমি আর কোনো ছেলেকে এক টাকা দামের আইসক্রিমের ভাগ দিই না। এসেই একেকদিন বাছাইকৃত একেক বালিকাকে আইসক্রিম খাওয়াই, গল্প করি, আর অংক করার সময় দেখে দেখে লিখি। বালিকাদের সাথে আইসক্রিম খেয়ে, দেখে দেখে অংক করে দুয়েকবার বিপদে পড়েছি অবশ্য, সামলেও নিয়েছি। তাদেরটা দেখে দেখেও তাদের থেকে মাঝে মাঝে বেশি নম্বর পেয়ে যাই, তখন তারা আর আইসক্রিম খেতে আসতে চায় না। তারপর থেকে আমি দেখে অংক করলেও ইচ্ছে করে দুয়েকটার ভুল উত্তর দিয়ে আসি। স্বপ্নে এসব করা যায়!
আর কৈশোরের প্রেমিকাদের মধ্যে রিংকিই বেশি আসে। মাঝেমধ্যে সোনিয়া, যার বেশিরভাগ কথা ছিল হেঁয়ালিপূর্ণ, যে একদিন আমার হাতে শাহরুখ খানের দুই টাকা দামের ভিউকার্ড দিয়ে বলেছিল, তুই এর মতো। আমার ড্রিমবয়। আমি তখন শাহরুখ খানকে চিনি না, ড্রিমবয় শব্দটির সঙ্গে কোনো পরিচয় হয়নি। তবে ব্যাপারটা যে খুশি হওয়ার মতো, সেটা খুব বুঝি। সোনিয়া স্বপ্নে আসলে আমি এখন তার সব কথা বুঝি। কিচ্ছু আর হেঁয়ালি মনে হয় না। বরং তার কথার অদ্ভুত অদ্ভুত মানে আবিষ্কার করে ফেলি। অবশ্য স্বপ্নের সাথে আবিষ্কারের সম্পর্কও ঐতিহাসিক ঘটনা। বেনজিন আবিষ্কার করেছিলেন ফারাডে। অথচ এর গঠন কেউ ধারণা করতে পারছিলেন না। বিজ্ঞানীদের ঘুম নষ্ট। অগাস্ট কেকুল নামের এক বিজ্ঞানী রাতে ঘুমাচ্ছিলেন, প্রগাঢ়। বেনজিনের গঠন নিয়ে গবেষণা করতে করতে ক্লান্ত। বিরক্তও কিছুটা। বিরক্তি বাড়লেই তিনি ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যান। ঘুম ভেঙে বিরক্তি আরও বেড়ে যায়। কেকুল একদিন স্বপ্নে দেখলেন একটা মাঝারি সাইজের সাপ এঁকেবেঁকে ছুটছে। এমনিতেই তার সাপভীতি আছে। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এটা স্বপ্ন। খুব চাইছিলেন ঘুমটা ভেঙে যাক। পারছিলেন না। হঠাৎ সাপটা তার দিকে তাকাল। ভয়ে ঘেমে উঠলেন তিনি। তার ভয় আরও বাড়িয়ে দিতেই কিনা কে জানে, সাপটা নিজের লেজ হুট করে মুখে পুরে নিল। তারপর গিলতে শুরু করল। সাপ ধীরে ধীরে নিজের লেজ গিলছে, আর কেকুলের ভীতি দূর হচ্ছে, জেগে উঠছে কৌতূহল। কতক্ষণ গিলতে পারবে সাপটা নিজের লেজ। অদ্ভুত প্যারাডক্সের মুখোমুখি কেকুল। গিলতে গিলতে সাপটা এক পর্যায়ে দুর্বল হয়ে গেল। আর গিলতে পারছিল না। আর তখন, কেকুল খেয়াল করেন, সাপটা চক্রাকার অবস্থায় বন্দী হয়ে পড়েছে।
কেকুলের ঘুম ভেঙে যায়। সারা শরীর ঘর্মাক্ত অবস্থায় তিনি টের পান, বেনজিনের গঠন তিনি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। কার্বন আর হাইড্রোজেন আসলে চাক্রিক অবস্থায় গঠন করছে বেনজিন অণু।
সোনিয়া স্বপ্নে আসলে আমার ঘুম ভাঙে বিজ্ঞানী কেকুলের মতো মহা মহা আবিষ্কার নিয়ে, ঠোঁট থেকে চুমুর দাগ মুছে ফেলতে ফেলতে, পাছে স্ত্রী বুঝে ফেলে!
যৌবনে আমার দুইমাত্র প্রেম শিরিন আর নবনীতা। দুইমাত্র নারী, যাদের একজন আমাকে ফিরিয়ে দেয়নি, আর যাদের একজনকে আমি ফিরিয়ে দিইনি। তারা আমার দীর্ঘ জাগ্রত জগতের নারী। একজনের নাক ডাকার শব্দ শুনতে শুনতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি; সেই শব্দে আমি এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে কম্পিউটারে দীর্ঘ এক ঘন্টার একটা নাক ডাকার রেকর্ড আছে, সে কোথাও বেড়াতে গেলে সেই রেকর্ড চালিয়ে আমি শুতে যাই, নইলে ঘুম আসে না, ঘুমালেও দুঃস্বপ্ন দেখি। অন্যজনের দুপুর বেলার মেসেজ নোটিফিকেশনে আমার সংবিৎ ফেরে : অনেক হয়েছে কাজ, এবার লিখতে বসো। আমি লিখতে বসি। মাঝরাতে হঠাৎ কখনো ঘুম ভেঙে গেলে ডাটা অন করার সাথে সাথে আবার নোটিফিকেশন : অনেক হয়েছে স্বপ্ন, এবার লিখতে বসো। আমি লিখতে বসি।
যৌবন পর্যন্ত অজস্র চিঠি, মেসেজ, মেইল, চুমু আর সঙ্গমের মুদ্রা জমে আছে আমার স্বপ্নের সিন্দুকে। সেসব মুদ্রা আমার জাগ্রত জগতের অপূর্ণতাগুলো পূরণ করে দেয়। দিতে থাকে...