চুল তার কবেকার

ইন্দ্রনীল বিশ্বাস



‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’ এই চিরন্তন স্বপ্নে বিভোর বাঙালির শেষ পাতে ফ্রয়েড সাহেব ঢুকিয়ে দিলেন খিদের এক অন্য আনবিক স্বরূপ, তাও আবার ভার্জিলের কবিতা দিয়ে ‘Flectere si nequeo superos, Acheronta movebo’ আমি যদি স্বর্গের ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করতে না পারি, তাহলে আমি জাহান্নমের দিকে অগ্রসর হবো। স্বর্গীয় ইচ্ছা আমরা কেই বা কতটা পূরণ করতে পেরেছি জানি না, তবে আমরা ধীরে ধীরে দেখতে পেলাম স্বপ্নসঙ্গমে আমাদের স্খলিত আকাঙ্ক্ষার আয়নায় এক অন্য স্বর্গকে। যার জন্য অচিরেই আমাদের জন্য জাহান্নাম নির্মিত হোল, আর পার্থিব নিয়তির ললাটলিখনে চুম্বন এঁকে আমরা সেই অস্বর্গীয় ক্লেদে কুসুমিত হলাম। একমাত্র তিনি, বোদলির, বলতে পারতেন My soul is a tomb where—bad monk that I be--. অবশেষে আমরা আমাদের নিজস্ব ক্লেদের প্যারাডক্স তৈরি করে নিতে পারলাম যার তরল আমাদের অভিযোজনের মধ্যে একমাত্র স্বপ্নটুকুই শেষ পারানের কড়ি। আমাদের জৈবিক আকাঙ্ক্ষার সোপান সুতরাং নির্মিত হোল, যখন সামনের বাড়ির রাঙা বৌদির চুলে বিদিশার অন্ধকার আবিষ্কৃত হোল।
এই আশ্চর্য সমাপতনে আমাদের স্বপ্ন স্কুলের পিছনের ডেস্ক ছাড়িয়ে হলুদ মলাটের অশরীরী কামনার জালে লালা ভিজিয়ে এক মায়াবী সঙ্গিনীর নির্মাণ করে নিলো, যে শুধু কুসুম, যার কোনও মন থাকতে নেই। অন্তত দেখিনি, শুধুমাত্র এক অনির্ণেয় স্খলনের সাক্ষী থাকা ছাড়া। ঠিক যেমন করে গুহার অভ্যন্তরে থাকা পূর্বপুরুষ একদা নিয়ে এসেছিল ঈশ্বরকে, আমাদের পাপের একমাত্র পরিত্রাতার জন্মলগ্নে আমাদের পাতার বল্কলগুলি ধীরে ধীরে খসে পড়ল, আমরা শরীরী হলাম। আর আমাদের সেই আশ্চর্যমোথিত শিরশিরানি অন্ধকার আখ্যানকে সকলের সামনে আলোকিত করে চললেন ফ্রয়েড, ইয়ুং, লাঁকা। আমরা ক্রমাগত সেই অন্ধকার ছুঁয়ে কলঙ্কিত গোপন অভিসারে পবিত্র হয়ে উঠলাম, যদিও রাস্তার কুকুর কুক্কুরির প্রকাশ্য সঙ্গম আর লাভা নিঃসৃত নীল ছবি আমাদের কতটা স্বপ্নবিলাসি করতে পারল আর কতটা রিরংসার ক্ষমতার হাতে নিজেদের আত্মসমর্পিত করে দিলো, যেখানে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে শিশু অগণিত থেকে বৃদ্ধার যোনি ক্ষত বিক্ষত হোল, তা সত্যিই বলা কঠিন।
এই না বলা কাঠিন্য স্বপ্ন দ্যাখার বাধা হোলও না কিছুতেই। একদিকে ভিতরের অন্ধকার আর অন্যদিকে ক্ষিদের প্রতিলিপি, বস্তুত দুইই যখন অপরিহার্য স্বপ্নের উপপাদ্য হয়ে উঠল তখন এও সত্যি সরবন ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা পুড়িয়ে দিলো উইলহ্যাম রিচের ‘সেক্সুয়াল রিভলিউশন’ ও ‘মাস সাইকলজি অফ ফ্যাসিজম’, যার ‘ডায়ালেক্টিক্যাল মেটিরিয়ালিজম এন্ড সাইকোঅ্যানালিসিস’ চেষ্টা করেছিল মার্ক্স আর ফ্রয়েডকে এক স্বপ্নিল সুত্রে গাঁথতে আর ছাত্রদের সমর্থনে প্যারিসের রাস্তায় লিফলেট বিলি করছেন সাত্রে, সালটা ১৯৬৮ র মে। সুতারং র‍্যাপিড আই মুভমেন্টের অধরা মাধুরী ছাড়িয়ে স্বপ্ন অবশেষে দাঁড়িয়ে রইলো মুক্তির দিশারী হয়েও। এখানেও এই উপমহাদেশে যখন একদিকে তরাই অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অন্য আখরে স্বপ্নের বাস্তিল ভেঙে শরীর দিতে চাইলো, আমাদের অবচেতনের সীমানায় তখন শুধুই অবিশ্বাস, তা কি নিছক স্বপ্নের শ্রেণীশত্রু নির্মাণ নাকি অবিশ্বাসের ইতিহাস এতদূর আজও এগিয়ে আসেনি। আর আসেনি বলেই স্বপ্নের মহড়া নাকি মহড়ার স্বপ্ন এই অতিরেক আমাদের যতটা কোলবালিশে আরামের সাশ্রয় ঘটাল তার চাইতে ঢের নামিয়ে আনলো আত্মপরিচয়ের ক্ষমতায়ণে।
তবুও বাস্তবিক স্বপ্নের অবিচল শিরশিরানিতে আমাদের স্খলনের আমোদ দেয়, আর দেয় বলেই আমরা সর্বক্ষণ একটি ছোট্ট গলি তস্য গলি দৌড়ে কিছুতেই আর ঘন্টার কাঁটা লাফিয়ে পরীক্ষার খাতা জমা দিতে পারিনা। প্রজন্মের মৃত্যু অববাহিকায় আমাদের নির্মিত অধিবাস্তবেরা আখ্যান লিখে রাখে ঠিকঠাক মানুষের আদলে প্রকৃতিতে এক অতিমানব কায়া, হয়ত একমাত্র তৈলক্যনাথই পারতেন ঘানীতে পিষে সেই অতিমানব ভূতের তেল তৈরির প্রকৌশল। শিশুপাঠ্য জুড়ে আমাদের কল্পনায় সেই কায়া প্রকৃতির অমোঘ নিয়তির মত টেনে নিয়ে চলে যেখানে আউদিপসকে অঙ্কশায়িনী করতে হয় জন্মদাত্রীকেই। এক অন্ধকার থেকে আর এক অন্ধকারে, এক গোপন লিপ্সা থেকে অন্য গোপন লিপ্সায়। আর লালা মাখা স্বপ্ন আমদের বেড়াজাল ভেঙে আমদের মনঃসংলাপে অন্নজল দেয় প্রতিনিয়ত, যেন বার্গম্যানের সেভেন্থ সিল যেখানে মৃত্যু কালো ঘুঁটি নিয়ে খেলে চলেছে, প্রকৃত প্রস্তাবে যে খেলার কোনও নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই আমাদের ঢুকে পড়তে হবে বিছানার প্রায়ান্ধকার পর্দায়, আর এক স্বপ্নের চিত্রায়নে। অপেক্ষার সেই বিরামে আরও কোনোদিন হয়ত, হয়তবা রাঙা বৌদি নিজেই হয়ে উঠবেন বিদিশা।
************************************************************ *********