অথ পলায়নী কথা

শ্রাবণী দাশগুপ্ত

ডিয়ার শশাঙ্ক,

আয়েশ করে কমন্‌রুমে বসে ফিফার বিশ্বকাপ দেখছ তো! ইলেকট্রনিকস্‌ দুনিয়াটা জাদু দুনিয়া বটে। ট্রেনে বসে তোমাকে পাঠানো ই-চিঠি মুহূর্তেই তোমার ডাকবাক্সে জমা হবে। হারানোর, চুরি যাবার ভয়ও বিশেষ থাকবে না। তোমাকে না জানিয়ে এই যাওয়াকে তুমি পলায়ন বলে ধরে নিলে, আমার আপত্তি নেই। কোথায় যাচ্ছি, জানার প্রয়োজন কি? থাকলেও, জানাচ্ছি না হে, অসুবিধে আছে। সাথে রুকস্যাকটা নিলাম, অনুমান করতে পারবে অন্তত। থিতু হয়ে বসেছিলাম, পুরোন বন্ধুত্ব ঝালিয়ে চমৎকার ঝলমলে যাপন... ভাল কাটছিল আমাদের শখের বাণপ্রস্থ। কী বলো? নিরিবিলির বৃদ্ধাশ্রম... বেশ। তবু যেতে হচ্ছে। লাট-খাওয়া ঘুড়ি কী, এযুগের ছেলেপুলেরা না বুঝলেও, তোমাকে আর কি বোঝাব? দিক্‌দিশা মাঠঘাট হারিয়ে... মুখ থুবড়ে পড়বারও জো রাখিনি। পোড়-খাওয়া রেফারিকে লাল কার্ড দেখানর গল্প শুনেছ কখনও? বড় রকমের ফাউল করে ধরা পড়েছি রে ভাই।

শ্রীলতার প্রতি তোমার দাদাসুলভ মায়া আর কতৃর্ত্ব বেশ লাগছিল। অবশ্য, ওকে অন্য চোখে দেখাও মুশকিল, একেক জন থাকে এরকমই...! সত্যি বলতে কী, সে নিরীহ গোবেচারা খরগোশ - চোখ বন্ধ করে মাথাটা গর্তে ঢুকিয়ে দিয়ে ভাবে, বিপদ কাটল। বিচিত্র! এভাবে বিরাট ফুটবল-গ্রাউণ্ডের প্যাঁচঘোঁচ না জেনে, এককোণে টিঁকে গেল নিশ্চিন্তে।

ফুটবল পাগল ছিলাম, আমি-দাদা দুজনেই। দাদা আর আমার তফাৎ ছিল। কাদা মেখে পাড়ার ক্লাবের ম্যাচে আমি যে দলে, দাদা আমার প্রতিপক্ষ। দক্ষ পায়ে ড্রিবলিং... কতবার বল বাঁচিয়েছি। দাদা রেগে গর্‌গর্‌ করত। গোলকীপিঙেও পারদর্শী ছিলাম। একবার কী হল, ফাউল করল দাদা। কিন্তু রেফারি পরপর দুবার ওয়ার্ণিং আমাকে – বোঝার আগে মাঠ থেকে বের করে দিল। সে কী অপমান! আরে দেখো তো, খেলার মাঠের সাতকাহন নিয়ে ঢুকছি... বোর হচ্ছ তো? আসলে কথায় বলে না, প্রত্যুষেই দিবসের ইঙ্গিত থাকে?

আমার অনেক আগে মাঠে নেমেছিল দাদা। দাদার ছেলেদের ফুটবল খেলার শুরু আমার ছাপড়-খাটে। খুব আদরের দুটোই, শঙ্খ আর শুভ্র। আমি ডাকতাম শুম্ভ-নিশুম্ভ। আমার স্টিলের হুইসল্‌খানায় ওদের আকষর্ণ। দাদা রাগী অধৈর্‍য, বউদি অসম্ভব কড়া ধাতের। একই অফিসে ছিল দু’জনে। খেলতে খেলতে আমার বিয়ের বছর তিনেকের মধ্যে দাদা বে-টাইমে মাঠ ছেড়ে আউট! ছন্নছাড়া ভারসাম্যহীন দশা। শুম্ভ-নিশুম্ভ সবে নয় ও সাত। বউদি আমার প্রায় সমবয়সী। তার বাহ্যিক হেলদোল কোনওদিন দেখলাম না। বরং অফিসের টান বাড়ল দশগুণ, প্রমোশন, ট্যুর – সদা ব্যস্ত। আমার আয় চলনসই ভাল। দাদার জমানো ছিল। গড়গড়িয়ে ঠোক্করহীন বলটা কোন্‌ অদৃশ্য গোলে ঢুকবে, কেউ গা করিনি।

শুম্ভ-নিশুম্ভ শ্রীলতার খুব নেওটা ছিল। তাতে সবারই লাভ। আমরা নিঃসন্তান, বাচ্চাদুটো পিতৃমাতৃহারা, অতএব নিভুর্ল মিলে যাওয়া সমীকরণ। শ্রীলতা ওদের ছোটমা’নি। বউদির কালো কুচকুচে চুলে সরু সাদা সিঁথি, পরিষ্কার কপাল। পাটপাট হালকা তাঁতের শাড়ি, লাল ব্লাউজে পারফিউম। থমথমে ঠান্ডা চোখে খেতে বসত বউদি, আমার পাশে। শ্রীলতা থালাবাটি সাজিয়ে, পরিপাটি অফিসের ভাত বেড়ে দিত। কপালের ঘামে চুল, লাল টিপ ধেবড়ে আছে। বউদি সংসারের কর্ত্রী, ব্যক্তিত্বের এপিটোম। শ্রীলতাকে সম্ভবত, অনুকম্পা করত...।

বউদি আমাকে চেয়েছিল। দিনে নয়, গভীর রাতে। অনিয়মিত একাধিকবার, ছাড়া ছাড়া। রাতের বিছানায় ক্লান্ত নিঝুম শ্রীলতা। ছেলেরা ওদের ঘরে পড়তে পড়তে ঘুমন্ত। বউদি আমাদের ঘরের সামনে চটি ঘষে ঘষে পায়চারি করত। নিঃশব্দে দরজা খুলে বের হয়ে আসতাম। শুধু প্রথমদিনটা চমকে গিয়েছিলাম। কী জানি কিসের টান, অথবা কর্তৃত্বের তেজ! সে কখনও স্নেহ করেনি আমাকে, বসন্ত-দাগানো মুখে, সজাগ বাইসেপ্‌সে, হাত বুলিয়ে কোনওদিন আদর দেখায় নি। আমি আবেগে নরম হয়ে পড়লে, বিরক্তি প্রকাশ করেছে, “আঃ বিভাস!” সুপ্ত অনুচ্চারিত নির্ভরতা... হয়ত উভয়ত, নাও হতে পারে। ক্রমশঃ অদ্ভুত চোরা-কারবারিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিলাম। সুদক্ষ ড্রিবলিং, কাটিয়ে কাটিয়ে... খানাখন্দ গর্তে-ভরা বিপজ্জনক মাঠ। এগুলো তোমাকে বলার কথা নয়, বলছি নিজের তাগিদেই। তোমার অকৃতদার জীবনচর্‍যায় বিশ্বকাপে মশগুল থাকো ভাই, সেই ভাল।

শৈশবে ভাইপো দুটোর খণ্ডযুদ্ধে রেফারি আমি, হুইসলটা বাজালেই কাজ হত। আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিত যুযুধান দু’পক্ষ। দাদা কী জানি কী বুঝে, নিশ্চিন্ত থাকত। তার মৃত্যুটাও হঠাৎ... কিডনি ফেইলিয়র। ঠিক আগের দিন বলেছিল, “বিভু, এবার মাঠ তোর”। অতঃপর পাকাপাকি রেফারির ভূমিকায় আমি। শ্রীলতা একটু দেরীতে অনুমান করেছিল, সন্দেহ করেছিল, জেনেছিল। তারপর নিরুপায়, মেনে নিতে হয়েছিল। নিত্যদিন ঘ্যানঘ্যান, একতরফা নালিশ, বারণ করেও লাভ হত না। শেষে একদিন অসহ্য হয়ে বললাম, “বাড়াবাড়ি করলে সোজা লাল-কার্ড! কুচবিহারে রেখে দিয়ে আসবো।” লালরঙের ভয় দেখি সবারই! ছেলেরা বড় হচ্ছিল। বুঝতাম, অভ্যাসবশতঃ তারা মুখের ওপরে কিছু বলে না, বউদি’র বয়স, মেজাজ, দাপটের কারণেও। যা বোঝার বুঝুক! বলটায় এলোপাথাড়ি লাথি পড়ছিল।

বড় ছেলের অবাঙালী বিয়ে নিয়ে মা-ছেলের অশান্তিতে বাজালাম হুইসল্‌, শঙ্খকে ওয়ার্নিং দিলাম। সেদিন ও আলাদা হয়ে যাওয়ার যে হুমকি দিল, তার তলকাটুনির ভিন্ন অর্থ। ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছিলাম, কিন্তু ও সরাসরি আক্রমণ করেনি। একান্তে বললাম, “বউদি’, লতাকে নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাচ্ছি। সংসার তোমার, ছেলেরা তোমার। লায়েক হয়েছে, মাঠ সামলাক”! অনেকদিন পরে বউদি’র মুখখানা দেখছিলাম... পঁয়ষট্টি ছুঁতে দেরী আছে। রোদের তাতে পোড়া ক্লান্ত, ফুরিয়ে যাওয়া। প্রশান্তির ছাপ নেই। কোনও খেলাতেই কি জিত হয়নি বউদি? উঠে আসছিলাম, বউদি পিছু ডাকল। করুণ, মিয়ানো, “আমাকে নিয়ে যাবে, বিভু?” কেন যেন নিশ্চিত ছিলাম, শ্রীলতা গলে যাবে, রাজি হবে। আমি সত্যিই মূর্খ। নিরপেক্ষ রেফারি-গিরি হয়না, বলছি তোমাকে!

দু’বছর পরে বৃদ্ধাশ্রম থেকে ছুটি নিয়ে, শ্মশানে দাদা-বউদির ছেলেদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম - তুমি তো জান শশাঙ্ক। ওরা কাছা নিল, আগুণ-লোহা ছুঁল। আগুণের হলকা ওদের চোখ থেকে মুছল না। মৎসস্পর্শের পরদিন গ্রাম্ভারি চালে ঘোষণা করলাম, “দ্যাখ্‌ এটা পৈতৃক বাড়ি, আমার অংশও ভবিষ্যতে তোদের থাকবে। গার্জেন বলতে তোদের ছোটমা’নি আর আমি... ফিরে আসবো মনস্থ করেছি। নিশ্চিন্ত তো?” আমি জানি আমি রেফারি, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত! খাটের কোণে মাথা গুঁজে কাঁদছিল শ্রীলতা। ওর কান্নার অফুরন্ত স্টক। শঙ্খর বৌ সাক্‌ষী চায়ের ট্রে হাতে দরজায়, সোফায় দুই ভাই। তাকাল, চোখাচুখি করল। ওদের মুখ দেখছিলাম উদ্গ্রীবভাবে। মাঠ ছেড়ে ভাল নেইরে আমি। শুভ্র চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “মাননীয় কাকামণি...আর না।” চমকে উঠলাম, মাঠের বাইরে ঠেলা মারছে? শঙ্খ রুক্ষ, ওর বাবারই মতো, “রেফারির মাতব্বরি আর ক’দ্দিন? যেখান থেকে এসেছো, আজকে বিকেলে ফিরে যাবে।” সত্য বলছি শশাঙ্ক, মাথায় চোট পেলাম, হুইসল্‌ খসে গেল হাত থেকে। তারপর গলগল করে অনেক কথা, দুগর্ন্ধ, পাঁকঘাঁটা, নোঙরা, কদর্‍য। আমার আর বউদির কথা -সব ওরা জানে। কখন কী দেখেছে, কখন কিভাবে টের পেয়েছে। শুনলাম, চোখ বুজে, মুখ নীচু করে। সবাই একসঙ্গে হলুদ-কার্ড দেখাচ্ছে। শ্রীলতাও, যাকে আসলে এক্সট্রার বেশি সম্মান দিতে যাইনি।

বিস্তারিত জানালাম। একটা কথা ওদের বলিনি। (বয়সের তেজে রক্ত গরম, বুঝতোও না।) মাঠের বাইরেও অনেক নিয়মকানুন তৈরি হয়। সেখানে মাঠের গৎ-বাঁধা নিয়ম অপ্রতুল। অনেক মধ্যরাত্রে বিদ্যুৎ চমকায়, সশব্দে বাজ পড়ে, ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। নিরেট কর্তব্য-বহিভূর্ত কাদাজলে খেলার নিঃশর্ত ব্যাখ্যাহীন অভিজ্ঞতা! যেহেতু রেফারিও এখানে প্লেয়ার, নিজেকে প্রয়োজন-বিশেষে আউট করে দিতে পারে। তবে, ছেলেদের ওপরে আমার অভিযোগ নেই কিছু। অন্তরের শুভাশিস ওদের জন্যে... বাকি পথ চলা, দূরের পথ... এবার মাঠের বাইরের সীমানা ধরে... দায়মুক্ত দর্শক।

ভাল কথা, শ্রীলতাকে ছেলেরা ক’দিনের জন্যে রেখে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করলে বোলো, খোঁজ করতে বারণ করেছি। ও যেখানে আনন্দে থাকে, থাকুক।
প্রীতি ও শুভেচ্ছা নিও,
তোমার অনুরাগী,
বিভাস ভৌমিক