অতলতলের প্রতিরূপ

শহীদুল রিপন




বেশ ক’দিন হলো খালিদের বসার ঘরের টয়লেট কাজ করছে না ঠিকমতো। ফ্ল্যাশ চাপলেও পানি আসছে না একফোটাও। মূল লাইনের কলটা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বেশ ক’বার চেষ্টা করে দেখেছে সে। কিন্তু লাভ হয়নি। শুধু আলাদা করে বালতিতে পানি ভরিয়ে একসাথে জোরে ঢেলে দিলে তবেই সুড়ুৎ করে পাতালের পথে হাঁটা দিচ্ছে যাবতীয় বর্জ্যটর্জ্য। এরকম সমস্যার মেয়াদ এক-দু’দিন হলে মানা যায়। একটু বাড়তি এফর্ট দিয়ে টয়লেট ঠিকঠাক রাখা যায়। কিন্তু এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলো বাবাজির ঠিকঠাক হবার কোনো লক্ষণ নেই। অগত্যা বিজনেস কার্ড হোল্ডার ঘেটেঘুটে মোল্লা স্যানিটারি অ্যান্ড হার্ডওয়ারের টেলিফোন নাম্বার খুঁজে বের করতে হলো তাকে। নিজের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে ফোন করতে হয় যথাসম্ভব দ্রুত একজন স্যানিটারি মিস্ত্রি পাঠানোর বিনীত অনুরোধ জানিয়ে।
সেই মোতাবেক সাতসকালেই যন্ত্রপাতি নিয়ে হাজির একজন মিস্ত্রী। খালিদ তখন সবে অনলাইনে খবরের শিরোনামগুলোতে চোখ বুলিয়ে নেবার জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে আয়েশ করে বসেছে ল্যাপটপ কম্পিউটারটা টেনে নিয়ে। অবশ্য আজকেই তাকে জরুরি কিছু মেইলও করতে হবে। বৃটেনের ম্যানচেস্টারে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. রবার্ট ইয়াং-এর কাছে রিনির রিপোর্টগুলো স্ক্যান করে অসুস্থতার সবশেষ খবরসহ পাঠাতে হবে। এছাড়া তাদের আবেদন করার পর সবশেষ অগ্রগতি কী হলো জানতে চেয়ে মেইল করতে হবে কানাডিয়ান ইমিগ্রেশন সেন্টারের ল ইয়ার ডেভিড কোহেনকেও। প্রায়োরিটি লিস্টে আপনাআপনি আরো কিছু টাস্ক এসে জমা হচ্ছে তখনো ঠিক সেইসময় এসে হাজির মিস্ত্রি মহাশয়। যদিও খালিদ ভেবে রেখেছে রিনি ঘুম থেকে ওঠার আগেই একে একে সবগুলো কাজই শেষ করবে সে।
: স্লামালেকুম স্যার। আমি মোখলেস, মোল্লা স্যানিটারি থেকে এই বাড়ির ঠিকানা দিয়া আমারে পাঠাইছে।
সালামের উত্তর দিয়ে মোখলেস সাহেবের আগমনের হেতু বুঝে উঠতে খালিদের সময় লাগে কয়েক মুহূর্ত। তার মনে পড়ে গতরাতে সে নিজেই ফোন করে একজন মিস্ত্রিকে পাঠাতে বলেছে। মনে পড়ে টয়লেটের অচলাবস্থার কথাও। আর ত্রাতা হিসেবে স্যানিটারি মিস্ত্রির আবির্ভাবে সে খুশিও হয়।
: আরে আসুন আসুন। হ্যা, টয়লেটের ফ্ল্যাশটা কাজ করছে না বুঝলেন। দ্যাখেন তো ঝামেলা হলো কোথায়।
খালিদ মিস্ত্রিকে বসার ঘরে নিয়ে যায়। মোখলেস মিস্ত্রি টয়লেটে ঢুকে কাজ শুরু করে। পানির কলগুলো খুলে খুলে দেখে। খুলে ফেলে বেসিনের ঢাকনাও। সমস্যা খুঁজে পাবার চেষ্টা এবং তার কাজের প্রতি একনিষ্ঠতা দেখে সন্তুষ্ট খালিদ আবারো ফিরে আসে বসার ঘরে। ল্যাপটপ কম্পিউটারটা টেনে নিয়ে মেইল লেখা শুরু করে ড. রবার্ট ইয়াং-এর কাছে।

২.
সপ্তাহ দু’য়েক হলো বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আবদুর রশিদের সূত্রে বৃটিশ সাইক্রিয়াটিস্ট রবার্ট ইয়াং-এর সাথে খালিদের আলাপ-পরিচয়। ড. রশিদ বলেছিলেন, রবার্ট খুব সজ্জন কিন্তু আমুদে মানুষ। কথা বললেই বুঝতে পারবেন, অনেক মজা করেন উনি, কিন্তু করলে কী হবে নিজের কাজের ব্যাপারে শতভাগ সিরিয়াস।
চার-পাঁচ দফা মেইল চালাচালির পর খালিদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে ড. রশিদের কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আজ থেকে বছর চল্লিশেক আগে রশিদ সাহেব যখন লন্ডনে উচ্চতর মনোরোগ বিদ্যার ওপর ডক্টরাল থিসিস করছিলেন তখন ড. রবার্ট ইয়াং ছিলেন তার সুপারভাইজার। ড. রশিদের মূল্যায়ন— সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে যারা মনোবিজ্ঞান নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা করেছেন তাদের মধ্যে সামনের সারিতেই থাকবে রবার্ট ইয়াং-এর নাম। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবিকলন পদ্ধতিকে খণ্ডন করে মনোবিজ্ঞানীদের যে দলটি নতুন ধারার মনোসমীক্ষণ পদ্ধতি গড়ে তুলেছেন এবং স্বপ্নদর্শনের নতুন ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেই বিজ্ঞানীদের যোগ্য উত্তরসুরী ড. রবার্ট ইয়াং। খালিদকে ইন্টারনেটে তার সাড়া জাগানো কিছু বইয়ের ছবিও দেখিয়েছেন ড. রশিদ। এর মধ্যে ‘দি ব্রিফ মিনিং অফ ড্রিমস’ বইটি লেখা হয়েছে অদ্ভুত রকমের বিশটি কেসস্টাডি বিশ্লেষণ করে। অক্সফোর্ড-হার্ভার্ডস বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দি ব্রিফ মিনিং অফ ড্রিমস’ বইটি এখন পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত। ভদ্রলোক নিজেও এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। ভীষণ ব্যস্ত তিনি, তবে এর মধ্যেও পুরনো গুরু-শিষ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রিনির কেসটা নেবার জন্য ড. রশিদ বিশেষ অনুরোধ জানান ড. রবার্ট ইয়াং-এর কাছে। শুরুতে খানিকটা আপত্তি তুললেও সংক্ষেপে কেসটা সম্পর্কে শুনেই, এর ইউনিকনেসের বিষয়টি বিবেচনা করে কেসটি তিনি নিয়েছেন।
কিন্তু রিনির কেসটা কী— যাকে ইউনিক বলছেন দেশের সবচেয়ে খ্যাতিসম্পন্ন মনোরোগ বিশারদ ড.আবদুর রশিদ এবং তার শিক্ষক বৃটিশ মনোবিজ্ঞানী ড.রবার্ট ইয়াং? ব্যাপারটা সম্পর্কে জানার আগে পাঠক আসুন আরেকটু পরিচিত হই খালিদ ও রিনির সাথে।
খালিদের পুরো নাম খালিদ মারুফ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে চাকরি করছেন জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে। জন্ম নেত্রকোনায়। টুকটাক গল্প লেখার অভ্যাস আছে তার। বাসা ভাড়া করে থাকেন অফিসের পাশেই, আগারগাঁও এলাকায়। খালিদের সহকর্মী খালেদা আক্তার আপা। খালেদা আপার কাজিন রিনি। পুরো নাম তামান্না তাবাসসুম। খালেদা আপার সূত্র ধরেই রিনির সাথে আলাপ-পরিচয় খালিদের। তারপর ভালো লাগা আর সেটা সামনের দিকে গড়াত গড়াতে…বছর দেড়েক হলো ঘর বেঁধেছে তারা। রিনির জন্ম লালমনিরহাট জেলায়। চারভাইবোনের মধ্যে ছোট সে। পড়ালেখা করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে। এখন সরকারী কর্ম কমিশনের একটা চাকরি জোটাবার জন্য চলছে পরীক্ষার লড়াইয়ে নামার জোর প্রস্তুতি। দীর্ঘাঙ্গী, শ্যামলা— আহামরি সুন্দরী তাকে বলা না গেলেও, নিন্দুকেরাও অন্ততঃ তাকে সুশ্রী বলতে বাধ্য হবেন। তবে খালিদের মতে, রিনির আসল সৌন্দর্য তার মনোজগতে। ঝগড়া বা কটূবাক্য বর্ষণ তো দূরের কথা, কারো সম্পর্কে খারাপ কিছু ভাবতেই পারে না সে সহজে। হাসতে পারে শিশুর সারল্য নিয়ে আর পারে ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে।
তো বিয়ের পর ভালোই কাটছিল সময় তাদের। ক্রমশঃ অন্তরঙ্গ হয়ে উঠছিল তারা আর প্রতিদিনই একে অপরকে আবিষ্কার করছিল— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়— যুগ-যুগান্তরের ‘চিরসখা’ হিসেবে। কিন্তু তাদের সেই ভালো সময়ে, সেই অন্তরঙ্গ আবিষ্কারের দিনগুলোতে হঠাৎই বাদ সাধলো একটা দুঃস্বপ্ন। বিয়ের পর তখন ত্রিশ কী একত্রিশ দিন পেরিয়েছে সবে— তখন পিরিয়ড চলছিল রিনির— আর তখনই স্বপ্নটা প্রথম দেখে সে। খুব খারাপ ধরণের স্বপ্ন। তখন গভীর রাত। ভয়ে-আতঙ্কে ঘুম থেকে জেগে পাশে খালিদকে ঘুমাতে দেখে বুঝেছিল সে স্বপ্ন দেখছিল। সেরাতে ঘুম আর না এলেও ব্যাপারটাকে নিতান্তই খারাপ স্বপ্ন হিসেবে গ্রহণ করে দ্রুতই ভুলে যেতে পেরেছিল রিনি। কিন্তু পরের মাসে সেই ক্ষরণের দিনগুলোতে আবারো স্বপ্নটি দেখে সে। অবিকল একই স্বপ্ন। পাত্র-পাত্রী, ঘটনা-ঘটনাস্থল, দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন সব হুবহু এক । কোথাও কমতি নেই। কোথাও নেই বাড়তিও।
এবার আর সহজে স্বপ্নটাকে মন থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে না রিনি। পরদিন নাশতার টেবিলে খালিদের কাছে বিশদ বর্ণনা দেয় এবং সে বলতে ভোলে না যে একই স্বপ্ন সে আগেও একবার দেখেছিল মাসখানেক আগে। তখন অবশ্য অফিস যাবার তাড়া ছিল খালিদের। গপাগপ নাশতা গিলে চায়ের কাপে জলদি চুমুক দিতে দিতে ঠা ঠা করে হেসেছিল সে। অফিস যাবার আগে বাহুবন্দি করে রিনিকে বলেছিল মন থেকে বিষয়টি ঝেড়ে ফেলে দিতে। কারণ স্বপ্ন তো স্বপ্নই, স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না। তবে রিনিকে ব্যাপারটা মন থেকে দূরে সরিয়ে দেবার পরামর্শ দিলেও খালিদের মনে একটা খটকা লেগেছিল ঠিকই। প্রশ্ন জেগেছিল: একই স্বপ্ন কি দু’বার অথবা একাধিকবার দেখতে পারে কোনো মানুষ! এনিয়ে খানিকটা ভেবেছিল সে। ভেবেছিল যে এরকম একটা থিম নিয়ে একটা জম্পেশ গল্প লেখা সম্ভব। তারপর যা হবার তা-ই হয়েছে। নানা কাজের চাপে, ব্যস্ততায় গল্প লেখা তো বটেই রিনির দুঃস্বপ্নের বিষয়টিও সে ভুলে গিয়েছিল বেমালুম।
রিনিও চেষ্টা করেছিল ভুলে যেতে। কিন্তু উল্টো তা গলায় বিঁধে থাকা মাছের কাঁটার মতো খচখচ করেছে মাঝেমধ্যেই। ভেতরে ভেতরে বিষণ্ন হয়ে পড়ছে এবং সেটা সে বুঝতেও পারছে স্পষ্টভাবে। মনে হতো সবসময় কেমন যেন ভয় ভয় একটা আবহ তাকে ঘিরে রেখেছে। মাসান্তে পিরিয়ডের আগে তার ঘুমও যায় কমে। রাত জেগে জেগে শুরু হয় রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা করা। তার চোখের কোণে চিরস্থায়ী হয়ে জমতে থাকে কালির পোঁচ। ব্যাপারটা খালিদেরও দৃষ্টি এড়ায় না। অফিসে খালেদা আক্তার আপার সাথে শলাপরামর্শ করে সে। সিদ্ধান্ত নেয় বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আবদুর রশিদের সাথে দেখা করবে তারা। সেই অনুযায়ী এক ছুটির দিনে তার অ্যাপয়ন্টমেন্টও নেয়া হয়। কিন্তু যেদিন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে যাওয়া হবে তার ঠিক আগের রাতে তৃতীয়বারের মতো স্বপ্নটি দেখে রিনি। সেটা ছিল সত্যিই এক ভয়ঙ্কর মুহূর্ত। স্বপ্ন দেখে চীৎকার করে ঘুম থেকে জেগে ওঠে সে। ঘুম থেকে জাগায় খালিদকেও। ভয়ে-ত্রাসে-অজানা শঙ্কায় থত্থর করে কাঁপতে থাকে রিনি আর খালিদ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে এবং বোঝানোর চেষ্টা করে যে সে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে খুব ভয় পেয়েছে। সেরাতে ধাতস্থ হতে অনেকক্ষণ লাগে রিনির।

৩.
প্রথমে খানিকটা দ্বিধা থাকলেও ড. রশিদের সাবলীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণে দ্রুতই সহজ হয়ে ওঠে রিনি। তিন তিনবার হুবহু একই স্বপ্ন দেখেছে— এতথ্য উল্লেখ করে স্বপ্নে যা যা ঘটে তার আদ্যোপান্ত খুলে বলে সে। স্বপ্নে সে দেখতে পায় তিনজন খুব খারাপ মানুষ তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে আর অস্ত্রের মুখে খালিদের হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে। তখন শোবার ঘরে ঘুমাচ্ছিল রিনি। মানুষগুলো তাকেও ঘুম থেকে তুলে বসার ঘরে নিয়ে আসে। ঘটনার আকস্মিকতায়, ভয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে রিনি। প্রথমদিকে খানিকটা চেষ্টা করে বাধা দেয়ার, প্রশ্নও করে— কেন তারা এভাবে বাড়িতে ঢুকে তাদের ওপর অত্যাচার করছে! কিন্তু সেসব প্রশ্নের কোনো জবাব দেয় না লোকগুলো। উল্টো তাকেও বেঁধে ফেলে দুর্বৃত্তরা। রিনির মনের মধ্যে তখন হিমশীতল এক ধরণের মৃত্যুভয় খেলা করে যায়।
প্রথমদিকে খালিদ ভেবেছিল এটা নিছকই একটা ডাকাতির ঘটনা। লোকগুলো হয়তো সোনার গয়না-টাকা-ঘড়ি-মোবাইল ফোন-ল্যাপটপ এসব নিয়ে চলে যাবে। হয়তো তাদের কোনো ক্ষতি করবে না। রিনিও ভেবেছিল সেরকমটা। কিন্তু লোকগুলোর মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া ছিল না। চেষ্টাও ছিল না আলমারি-ড্রয়ার তছনছ করে মূল্যবান জিনিসগুলো হাতিয়ে নেবার কিম্বা নিদেনপক্ষে সেগুলোর চাবি তালাশ করার। বরং তারা সোফায় বসে শান্তভাবে নিচুস্বরে নিজেদের ভেতর কী যেন নিয়ে বুদ্ধি-পরামর্শ করে। তাদের একজন কৌটা থেকে ফ্লাইং ডাচম্যান তামাক এবং রিজলা পেপার বের করে বেশ কায়দা করে সিগারেট বানিয়ে তাতে আগুন জ্বালায়। মুহূর্তের মধ্যে সারাঘরে ছড়িয়ে পড়ে তামাকের কড়া গন্ধ।
এই পর্যন্ত বর্ণনা করে থেমে যায় রিনি। আর কিছু বলে না। ওড়নার খুঁট বামহাতের কনিষ্ঠাঙুলে প্যাঁচাতে থাকে, পরক্ষণেই আবার খুলে ফেলে। এভাবে চলতে থাকে বারবার। খালিদ লক্ষ্য করে রিনির চোখের কোণা দিয়ে কান্নার জল গড়াতে শুরু করেছে। মাঝেমাঝেই তার পুরো শরীর হাল্কা হাল্কা কেঁপে উঠছে। ড. আবদুর রশিদও নিশ্চয় বিষয়টি খেয়াল করেন। ফলে তিনি আর বাকি স্বপ্নদৃশ্য বর্ণনা করার জন্য আর কোনো চাপ না দিয়ে চোখের জল মোছার জন্য রিনির দিকে টিস্যু পেপার বক্স এগিয়ে দেন।
চেম্বার ঘরটিতে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে আসে। তারপর সামান্য গলা খ্যাকারি দিয়ে সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে খুব সহজ গলায় কথা বলে ওঠেন ড. রশিদ। এমন সহজভাবে যেন এমন খারাপ স্বপ্ন যে কেউই দেখতে পারে এবং দেখাটাই স্বাভাবিক । এরপর তিনি মনোবিদ্যার কিছু তত্ত্বকথা শোনান।তিনি বলেন: ঘুমের ভেতরও মানুষের ইন্দ্রিয়গুলো খাণিকটা সক্রিয় থাকে এবং বাইরের জগৎ থেকে সংবেদন গ্রহণ করতে পারে । তারপর সেই সংবেদনগুলো নিজের মতো করে প্রতিরূপে বদলে গিয়ে স্বপ্নদৃশ্যের সৃষ্টি করে। তবে স্বপ্নের মূল উপাদান তৈরি হয় যে স্বপ্ন দেখে তার প্রতিদিনকার জীবনের অভিজ্ঞতা, কাজকর্ম এবং কোনো বঅলো বা মন্দ ঘটনার স্মৃতি থেকে। গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মান্ধরা কোনো স্বপ্ন দেখে না। এমনকি যারা অল্প বয়সে অন্ধ হয়ে যায়, তারাও স্বপ্নে কিছু দেখতে পায় না। ড. রশিদ বলেন, দুঃস্বপ্ন এমন এক ধরণের অপ্রীতিকর স্বপ্ন যা নেতিবাচক মানসিক প্রতিক্রিয়া থেকে জন্ম নেয়। সাধারণত ভয়, হতাশা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এমনকি দুঃখ থেকেও মানুষ দুঃস্বপ্ন দেখতে পারে।
এসব কথা যতক্ষণ বলছিলেন ড. রশিদ ততক্ষণে অনেকটাই সহজ হয়ে এসেছে রিনি। খচখচ করে কলমের আঁচড়ে ব্যবস্থাপত্র লিখতে লিখতেই কলিং বেল বাজিয়ে সহকারিকে ডেকে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে রিনির রক্তচাপ আর ওজন মাপার নির্দেশ দেন।
রিনি পাশের ঘরে যেতেই আবারো কথা বলা শুরু করেন ড. আবদুর রশিদ।— স্বপ্নের বাকি অংশটা কী সেটা অনুমান করতে পারছি, তবু মি.খালিদ আপনার কাছে একবার শোনা যাক। খালিদ এই স্বপ্নের বর্ণনা এর আগেও আরো তিনবার শুনেছে। ফলে দুর্বৃত্তদের হাতে রিনির পালাক্রমে ধর্ষণের শিকার হবার বাকি গল্পটা ভগ্ন হৃদয়ে বর্ণণা করে সে। সাথে তার নিজের দুটি পর্যবেক্ষণও যুক্ত করে। প্রথমটি হলো: প্রতি মাসে কেবল পিরিয়ডের সময়ই রিনি স্বপ্নটি দেখছে। আর দ্বিতীয়টি হলো: এর আগে কাউকেই সে দেখেনি যে এমন নিঁখুতভাবে স্বপ্নদৃশ্যের বর্ণণা দিতে পারে, এমনকি সে স্বপ্নের ভেতর গন্ধও পাচ্ছে। কোনো বর্ণনাতেই বাদ পড়ছে না ঘরময় ফ্লাইং ডাচম্যান তামাকের কড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি।
মৃদু হসে ড. রশিদ খালিদের পর্যবেক্ষণের প্রশংসা করেন। বলেন: আসলে আমরা এমন একটা দুঃস্বপ্নের কাল অতিক্রম করছি যখন সমাজে নানা রকম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আর এই দুঃসময়ে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে নারীরা। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললে কী টেলিভিশনের খবর শুনতে গেলে আমরা ধর্ষণের নানা খবর পাচ্ছি। সমাজে যখন নৈতিকতা আর মূল্যবোধ শূন্যের কোটায় গিয়ে পৌঁছে তখন এমনটা ঘটে। শিশুই হোক আর যুবতীই হোক নারীরা কোথাও নিরাপদ নয়। কিছুকিছু ক্ষেত্রে ছেলে শিশুরাও। স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, রেস্টুরেন্ট, যানবাহন, ক্ষেতখামার এমনকি নিজের বাড়িতেও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তারা। আর শুধু নারীই বা কেন! যে কোনো সংখ্যালঘু বা ক্ষমতাহীন সম্প্রদায় সমাজে ক্ষমতাবানদের বল প্রয়োগের শিকার হচ্ছে। ধর্ষণ মানে তো বলাৎকার। যে কোনো বল প্রয়োগের ঘটনাই আসলে ধর্ষণ।
এপর্যন্ত বলে খাণিকক্ষণ থামেন তিনি। কী কী যেন ভাবেন। তারপর বাসায় খবররের কাগজ বা টেলিভিশন না চালানোর পরামর্শ দেন খালিদকে। এছাড়া রিনির ব্যক্তিজীবনে এধরণের কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে কিনা সেটা জানার এবং থাকলে তা বন্ধুতা ও সহানুভূতি দিয়ে মেনে নেবার উপদেশ দেন তিনি। সবশেষে বলেন, কয়েকটা ঘুমের ওষুধ, অ্যান্টি-ডিপ্রেশান্ট ট্যাবলেট আর ফলিক এসিড খেতে দিলাম। ধারণা করছি, কয়েকদিন ভালো ঘুম হলে আর অনুকুল পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারলে এধরণের দুঃস্বপ্ন আর ওর জীবনে ফিরে আসবে না। ‘হোপ ফর দি বেস্ট’ বলে মুচকি হেসে সেদিন চেম্বার থেকে খালেদ আর রিনিকে বিদায় করেছিলেন ড. আবদুর রশিদ।
কিন্তু ড. আবদুর রশিদের ধারণা ভুল বলে প্রমাণিত হয়। প্রথম দিকে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমটুম ভালোই হতো আর পরবর্তী দুই মাস রিনি কোনো স্বপ্নটপ্নও দেখেনি। কিন্তু তৃতীয় মাসে গিয়ে একই স্বপ্ন আবারো দেখে রিনি। শুধু ভয়াবহ স্বপ্নদৃশ্য দেখাই নয়, এবার তার শরীরে নির্যাতনের চিহ্নও ফুটে ওঠে। সকালে ঘুম থেকে উঠে খালিদকে গলায়-ঘাড়ে-পিঠে দাঁতের কামড় আর নখের আঁচড়ের দাগ দেখায় রিনি। ঘটনা এমনভাবে ঘটে যায় যে তা বুঝি আর স্বপ্নে নয়, যেন বাস্তব জীবনেই ঘটতে শুরু করেছে এবং সত্যি সত্যিই রিনি ধর্ষণের শিকার নারী হিসেবে নিজেকে ভাবতেও শুরু করে।
উপায়ন্তর না পেয়ে আবারো ড. রশিদের শরণাপন্ন হয় খালিদ। সবকিছু শুনে এবার গম্ভীর হয়ে যান ড. রশিদ। এক্সরেসহ রক্তের কিছু টেস্ট দেন তিনি। নিজ দায়িত্বে কথা বলেন আরো কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সাথেও। নতুন করে আরো কিছু ওষুধপত্র প্রেসক্রাইব করেন। কিন্তু তাতে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। তিন মাস বিরতি দিয়ে রিনি সেই ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখা চলতেই থাকে। তখন খালিদ সিদ্ধান্ত নেয় দেশ ছাড়ার। তার মনে হয়, এখন রিনির সে মানসিক ও শারিরীক অবস্থা তাতে শিগগিরি এই পরিবেশ থেকে বেরুতে না পারলে তাকে বেশিদিন বাঁচানো যাবে না। যে কোনোদিন গ্লানিতে ভুগে ভুগে এমনকি সে সুইসাইডও করে ফেলতে পারে। এ অবস্থায় একদিন ড. আবদুর রশিদ খালিদকে বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে তার শিক্ষক বৃটেনের বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. রবার্ট ইয়াং-এর সাথে কথা বলেছেন। তিনি রিনির কেসটা নিয়েছেন। খালিদকে রবার্টের মেইল অ্যাড্রেস দিয়ে ড. রশিদ বলেন, এবার তাকে যত দ্রুত সম্ভব সব কাগজপত্র এবং ঘটনার আপডেটগুলো জানাতে হবে।

৪.
তো তারই অংশ হিসেবে রিনির সবশেষ অবস্থা বিশদ করে লেখার পর, স্ক্যান করা বিভিন্ন মেডিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্ট আর ব্যবস্থাপত্রগুলো অ্যাটাচ করে দিচ্ছিল মেইলের সাথে। ইন্টারনেটের গতি বোধকরি বেশ দুর্বল, কারণ অনেকক্ষণ ধরেই ঘুরছে লোডিং-এর নির্দেশক চাকাটি। খালিদ ভাবছিল এই মেইলটি সেন্ড করার পর কানাডিয়ান ইমিগ্রেশন সেন্টারের আইনজীবী ডেভিড কোহেনকে মেইল পাঠাতে হবে। আর এই দু’টি কাজ শেষ করেই শোবার ঘরে গিয়ে ঘুম ভাঙাবে রিনির।
এরকমটা যখন ভাবছে খালিদ তখন স্যানেটারি মিস্ত্রি মোখলেস এসে হাজির আবারো।
: স্যার পাইপ লাগবো সাড়ে তিন ফিট। সাদা সিমেন্ট, টেপ, প্রেশার ওয়াশার লাগবো। এছাড়া পানির লাইনের কলটায় জং ধরছে। ওইডাও বদলানি দরকার। কম্পিউটারে কাজ করতাছিলেন দেইখা আপনেরে ডিসটাপ না কইরা আমি নিজের থিকা মোবাইল কইরা এগুল্যান পাঠাইতে কইছি। মোল্লার দোকানের এক কর্মচারি মালগুল্যান লইয়া আইতাছে। হের লগে একজন লেবারও আইবো। যে কাম বাইরাইছে একজন হেল্প না করলে আমার একার মানুষের পক্ষে সম্ভব না।
স্যানেটারি মিস্ত্রিদের কাজের ধরণ সম্পর্কে খুব একটা ভালো ধারণা নেই খালিদের। তবে তার মনে হয় এরকম কাজে একজন লেবার তো লাগতেই পারে। বরং সে মিস্ত্রি মোখলেসের ডিলিংসে সন্তুষ্ট হয়। বিশেষ করে সে যে একটা জরুরি কাজে ব্যস্ত এবং একারণে সে সশরীরে মিস্ত্রির কাজের তদারকি করতে পারছে না। আর পারছে না বলেই কাজটা বন্ধ না রেখে নিজ দায়িত্বে ফোন করে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আনিয়ে নেবার যে বিবেচনা বোধ সেটা মুগ্ধ করে খালিদকে। এইসময় এরকম আক্কেলজ্ঞান ক’জনেরই বা আছে!
সে বলে: তাহলে তো বেশ কিছু জিনিস কেনাকাটা করতে হচ্ছে। বলেই মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করতে চায়। কিন্তু মোখলেস তাতে বাধা দেয়। নির্ভরতার স্বরে বলে, না স্যার, এখন টাকাপয়সা দেয়া লাগত না। আগে কামডা শেষ হোক, তারপর একলগে সব পেমেন্ট কইরা দিয়েন।
এ কথায় খালেদ মিষ্টি করে হাসে। তারপর আবারো ল্যাপটপে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মিস্ত্রি মোখলেসও বাথরুমে নিজের কাজে চলে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে মোল্লা স্যানেটারি অ্যান্ড হার্ডওয়ারের একজন কর্মচারি বেশকিছু জিনিসপত্র নিয়ে আসে। তার সাথে আরেকজন, তার হাতেও বেশকিছু যন্ত্রপাতি। খালিদ ল্যাপটপ থেকে ক্ষণিকের জন্য চোখ তুলে দেখে আবারো নিজের কাজে মন দেয়। মোখলেস মিস্ত্রি তাদের বসার ঘরের টয়লেটে নিয়ে যায়। খালিদ লোকগুলোর কাজ করার ঠুকঠাক শব্দ, কখনো আবার নিজেদের মধ্যে কথা বলা কিম্বা খুনসুটির শব্দও শুনতে পায়। ওদের তিনজনের মধ্যে কারো একজনের ফোনে পরপর দু’বার মিসড কল আসে।
কিছুক্ষণ পর লোকগুলো খালিদের সামনে এসে দাঁড়ায়। খালিদ মনে করে মিস্ত্রিরা তাদের কাজ শেষ করেছে। ততক্ষণে অবশ্য ড. ডেভিড ইয়াং-এর কাছে মেইল পাঠানো শেষ করেছে খালিদ। ডেভিড কোহেনের কাছে মেইল লেখাও প্রায় শেষ পর্যায়ে। সেটা স্থগিত রেখে সে উঠে দাঁড়ায়। পেমেন্ট করার আগে ফ্ল্যাশ ঠিকমতো কাজ করছে কী না পরখ করে নেয়ার জন্য টয়লেটের দিকে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু সেদিকে পা বাড়াতেই মোখলেস মিস্ত্রি তার পথরোধ করে দাঁড়ায়। কোমর থেকে একটা পিস্তল বের করে হিসহিসিয়ে ওঠে: একদম নড়বেন না। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক খালিদ বোঝার চেষ্টা করে, এর মানে কী! কিন্তু তার আগেই বাকি দু’জন তার মুখে স্কচ টেপ সেঁটে দেয়। দারুণ ক্ষিপ্রতায় বেঁধে ফেলে দু’হাতও। তারপর পেটে ও কোমরে দড়ি পেঁচিয়ে তাকে বেঁধে রাখে জানালার গ্রিলের সাথে। একটুও নড়াচড়া করতে পারে না সে। পারে না টু-শব্দটিও করতে। চোখে শুধু বিস্ময় আর অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে সে।
খালিদের মাথা কাজ করছে না। এরপর কী হতে পারে সে বিষয়েও কিছুই ভাবতে পারে না। প্রথমেই সে ধরে নেয় এটা ডাকাতির ঘটনা। এরকম ঘটনা রাজধানীতে তো অহরহ ঘটছে। কখনো কাজের লোক, কখনো ভিক্ষুক সেজে এসে ডাকাতির খবর তো সে কাগজে বেশ ক’বার পড়েছে। তার আরো সাবধান হওয়া উচিৎ ছিল। রিনির কথা মনে পড়ে তার। শোবার ঘরে গাদা গাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। এম্নিতেই এক ভয়ঙ্কর ট্রমার মধ্যে আছে সে, তারওপর ডাকাতির এই ঘটনা তার ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে তা ভেবেই শঙ্কিত হয়ে পড়ে সে। ইস্, কোনোভাবে যদি রিনিকে সতর্ক করে দেয়া যেত।
খালিদ ভেবেছিল মোখলেস মিস্ত্রি, মানে ডাকাত মোখলেস আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা হয়তো সোনার গয়না-টাকা-ঘড়ি-মোবাইল ফোন-ল্যাপটপ এসব নিয়ে চলে যাবে। হয়তো তাদের কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, লোকগুলোর মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া নেই। চেষ্টাও নেই আলমারি-ড্রয়ার তছনছ করে মূল্যবান জিনিসগুলো হাতিয়ে নেবার কিম্বা নিদেনপক্ষে সেগুলোর চাবি তালাশ করার। বরং তারা সোফায় বসে শান্তভাবে নিচুস্বরে নিজেদের ভেতর কী যেন নিয়ে বুদ্ধি-পরামর্শ করে। তাদের মধ্যে একজন মানে যে লোকটা কিছুক্ষণ আগে লেবার হিসেবে বাসায় ঢুকেছে, সে কৌটা থেকে ফ্লাইং ডাচম্যান তামাক এবং রিজলা পেপার বের করে বেশ কায়দা করে সিগারেট বানিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে টানতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে সারাঘরে ছড়িয়ে পড়ে তামাকের কড়া ও কটূ গন্ধ।
তামাকের এই গন্ধটা খুব চেনা চেনা লাগে খালিদের। কে যেন খায়, এই তামাকের গন্ধ কোথায় যেন দেখেছে না কী শুনেছে— কিছুতেই স্মরণ করতে পারে না। বন্দিত্বের মাঝেও তার কেমন জানি বিশ্রি রকমের অস্বস্তি লাগতে শুরু করে। তার আবারো ঘুমন্ত রিনির কথা মনে পড়ে এবং রিনির কথা ভাবতেই স্মরণে আসে কোথায় সে এই তামাকের গন্ধ পেয়েছে, মানে তামাকের গন্ধের গল্প শুনেছে। হ্যা,রিনির দেখা স্বপ্নের কথা মনে পড়ে তার। অজানা এক আশঙ্কাসমেত সে ভাবতে থাকে— তবে কি সেই স্বপ্নটিই এখন বাস্তবে ঘটে চলেছে! তার সারা শরীরে ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কের স্রোত প্রবাহিত হতে থাকে।
ওদিকে দুর্বৃত্তগুলো আস্তে ধীরে সিগারেট শেষ করে আবারো তৎপর হতে শুরু করেছে। খালিদ দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পায় এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে! সমস্ত শরীরের শক্তি একত্রিত করে সে চীৎকার দেয়। কিন্তু গোঙানির সামান্য গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া সে চীৎকার আর কেউই শুনতে পায় না। তীব্র অনিশ্চয়তা আর অস্তিত্বহীনতার ভেতর খালিদ তলিয়ে যেতে থাকে নিঃশব্দে।


৫.
ঠিক কতক্ষণ পরে সম্বিত ফিরে পায় সে বুঝতে পারে না। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে পায় হাসিমুখের রিনি ওর মুখের ওপর ঝুঁকে রয়েছে। ধীরে ধীরে শ্রবণেন্দ্রিয়ে পাখির কিচিরমিচির আর সদ্য ঘুম থেকে জেগে ওঠা একটা শহরের নানারকম শব্দ স্পষ্ট হতে থাকে। না, তার হাত-পা বা মুখ কিছুই বাঁধা নেই। বুঝতে পারে সকাল হয়েছে আর সে নিজের বিছানাতেই শুয়ে আছে। তবে কি স্বপ্ন দেখছিল সে? বিশ্বাস হতে চায় না তার। বিছানা থেকে উঠে হন্তদন্ত হয়ে সে বসার ঘরের টয়লেটে গিয়ে ঢোকে। না, কোথাও স্যানেটারি মিস্ত্রির কাজের কোনো চিহ্ন নেই। নিশ্চিত হবার জন্য সে টয়লেটের ফ্ল্যাশ চেপে দেখে। এই তো দিব্যি হুড়মুড়িয়ে পানি আসছে আর সব ধুয়েমুছে ধেয়ে যাচ্ছে পাতাল অভিমুখে।
তাহলে সে স্বপ্নই দেখছিল! খুব খারাপ একটা একটা স্বপ্ন এবং যা যা সে দেখেছে তা যে বাস্তব নয়, নিছকই একটা স্বপ্ন! এটা ভেবে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সে। তার মাতালের মতো কাজ-কারবার দেখে রিনি খিলখিল করে হেসে ওঠে। বলে, ঘুমালে তোমার আর কোনোকিছুর ঠিক থাকে না। আর ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ তুমি কী কী যে করো নিজেও তা জানো না। একদিন ভিডিও করে তোমাকে সব দেখানো উচিৎ।
দুর্ভাবনার মেঘ কেটে যায় খালিদের। সে এবার হাসি হাসি মুখে রিনির দুষ্টামিভরা হাসি উপভোগ করতে থাকে। রিনি বলেই চলে, তোমার নড়াচড়া আর গোঁ গোঁ শব্দে ঘুম ভেঙেছে আমার। জানো, আমি কখনো স্বপ্ন দেখছে এরকম মানুষকে কাছ থেকে দেখিনি। আজ তোমাকে দেখলাম। তোমার দু’চোখের পাতা খুব ঘনঘন কাঁপছিল আর চোখের মণিও নড়ছিল মাঝেমধ্যে। তুমি এমনভাবে গোঙানির শব্দ করছিলে যে মনে হচ্ছিল কেউ তোমাকে জোর করে বেঁধে রেখেছে আর তুমি নিজেকে ছাড়াতে পারছ না। খুব খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি?
এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দ্রুতই রিনিকে কণ্ঠলগ্ন করে খালিদ। রিনিও কপট ভঙিতে খালিদের বাহুর নাগপাশ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকে। সেইসময় খোলা জানালা দিয়ে সকালের একপশলা নির্মল বাতাস এসে ঘরে ঢোকে। নানা কিছুর সাথে সে বাতাস ফ্লাইং ডাচম্যান সিগারেটের তামাকের কড়া গন্ধও বয়ে নিয়ে আসে। রিনি পারে না কিন্তু খালিদ ঠিকই তা অনুভব করে। রিনিকে বাসিমুখে চুমু খেতে খেতেই সে ভেতরে ভেতরে আবরেকবার শিউড়ে ওঠে।