রক্তলগ্ন রাত্রি হয়ে থাকি

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য





আমার ঘুমের ভিতর, স্বপ্নের ভিতর, মৃত্যুর ভিতর সে একজন হয়ে থাকে নিমের পাতা ভেঙে আসা হাওয়া। সে আমার জানলার শেষে বাজে আনন্দগান। তার বিছানা পাতা আছে খড়ের। খড়ের রঙে পটমঞ্জরী বাজে সে এক প্রাচীন রাগিণী। এখনো উড়ছে বেজে। কর্ণপত্র কাঁপছে তির তির দুর্বিষহ, সেই রাগিণী পাঠায় আমার ধারে পাঠায় আশ্চর্য রথ, স্বপ্ন অধিরথ।

আমি তার এক কোণে আমার ছায়া ভাইটিকে দেখি। ভাই অমল হয়ে যায়। আমি হতে পারি না। অথচ স্বপ্ন ছিলো ডাকঘরে অমল হবো। আমার জ্বরের পাশে সুধাবালিকা এসে রেখে যাবে পুষ্প-আঙুল। সেই-ই আমার সুধাবালিকা, আমি তখন শীতকালের স্বপ্নে বিভোর একটি মিথ্যে ফড়িং কিংবা মথ।

আমি কখনো স্বপ্নের তার দরোজায়। তারও আগে এইখানে ঝড় ছিলো হাওয়া। আমার উত্থিত রক্তে ধরেছি সমুদ্র। ঝড়ের মৃত্যু হলো। ফেনাগুলি ভেসে আসছিলো আমার দিকে। সে উৎসে ছিলো তারও আগে। ঘুমিয়ে জেগে উঠলাম আবার। কিছুই বলার নেই, মন্ত্রণারহিত সকল অন্ধকার।

তাকে খুঁজতে গিয়ে খুঁজে পাই বিস্ময়ের সিঁড়ি। অবরোহী। পেয়ে যাই অলৌকিক তলোয়ার। নিমফুলের রঙে ছেয়ে আছে গোধূলি। ভেবে আছি, তাকে সঙ্গে করে দিগন্ত ছোঁবো। শূন্যতা, আমাকে বিদীর্ণ করো এইসব পরাক্রান্ত স্বপ্নের ভিতর।

সাজানো স্বপ্নের ভিতর নদী আসে কোথা হতে? নদী তুমি অন্যধারে যাও—পাড় ভাঙো। সাজানো ঘর পুড়ে যাক, তারপর এসো। কোথায় উৎসব পেতেছে সংসার। উৎসবের আনন্দ আমাকে নাও। আমার হাতের রেখাচিত্রে পাবে তার নকশা। দোটানা পাহাড় ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়। আমি তাকিয়ে থাকি। সাজানো স্বপ্নে কী আর থাকে বাকি?

স্বপ্ন সবসময়ই স্বপ্ন তার কাছে। স্বপ্ন সত্যি হয়নি কখনো। সে চিরদিন স্বপ্ন দেখবে। সত্যি হবে না। আইবুড়ো মহিষ কাদা স্নান সেরে অভিসারে যাবে। সে চিরদিন স্বপ্ন দেখবে, সত্যি হবে না জেনে। বাঁশের পাতা পরস্পর সহবাসে রত। হাওয়ার কাছে পরস্পর নিবিড় হয়ে যায়। এইখানে উষ্ণ রতি আরতি তিথি। স্বপ্ন এইখানে যায় না। এইখানে তার আর আমার শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন অমর হয়ে যায়।

তার রং লাল, আমারও রং লাল। সোডিয়াম আলোর ভিতর সে আর আমি চিরদিন রক্তলগ্ন রাত্রি হয়ে থাকি ভয়ানক বৃষ্টির তলে। তার বাঁকা টিপ ছুঁয়ে আমি সূর্যের গহ্বরে ঢুকে যাই, সূর্য হয়ে যাই।

আমি আরো একটু পরে রাত গাঢ় হলে রাস্তায় নেমে মালাই চা খাবো। রাস্তা ভাঙাচোরা। বিমানবন্দর পাশে পড়ে আছে, তার লেজ রানওয়ে হয়ে ডাকছে। তার তিনশো ষাট নাম। যথা সমুদ্র, কান্তা, সবুজ, জল, শিখণ্ডি, অমিথ্যা, কাম, গীত, আনন্দ, আশ্রয় ইত্যাদি। আর এই আমি সেইসব নামের ছায়া। ছায়া মানে কথক, ছায়া মানে লিপিকার।

সে একজন সাইক্লপ্স, একচক্ষু হরিণ বা পরম ব্রহ্মারূপে ঈশ্বর। ঈশ্বরের একচোখে জ্বলে ওঠে অমাবস্যা। অন্যচোখ জন্মান্ধ। একচক্ষু ঈশ্বরই মাতা ছিন্নমস্তা, চণ্ডিকা আর আদি শক্তি কালী মা তারা। মা তারা-ই সর্বত্র বিরাজমান, তার তিনশো ষাট রূপ।

তার এক রূপ মহিশাসুর, তার জিবে প্রাণ আর প্রাণ, সে উত্থিত তরঙ্গের রূপে পরাজিত করে সিংহবাহিনি। দ্বিতীয় রূপ জ্ঞানী রাবণ, সে পু®পকবিমানে শয্যাগত সীতাসঙ্গ করে, সীতামা আপন সিঁথি মেলে ধরে অনার্য পিতা রাবণের রক্তের নিচে। জন্ম হয় লব আর কুশের। লব-কুশের শুক্রাণুর বনে ছিলাম আমরা আটশোকোটি পাতাবাহার। পাতাবাহারের রূপ দিয়েছিলো ঋষি বশিষ্ট। তৃতীয় রূপ মহাক্রম গদাধর দুর্যোধন। অন্যায়যুদ্ধে হেরে গিয়ে জয়ী হয়েছে। তার গায়ত্রীমন্ত্রে এখনো মহাসমুদ্রের ঢেউয়ে কম্পন বাজে পটমঞ্জরীতে। সে মাতা গান্ধারীর একশো একটা দীর্ঘশ্বাসের ফল। কলসিতে জন্ম।

তার চতুর্থ রূপ মেফিস্তফেলিস। তার ভিতরে আরো প্রচ্ছন্ন পাঁচটা রূপ যথা শয়তান, লুসিফার, খবিস, খান্নাস, আহমিরান। সে লব আর কুশকে আদিতে সোমরসে মিশিয়ে পান করেছিলো। তার ডান উরুতে শিশ্নদন্ড আর বাম উরুতে যোনিবিবর। সে ডান আর বাম উরু মিলিয়ে শৃঙ্গার করে। তার শৃঙ্গারে মহাবিশ্বে প্রাণের সৃষ্টি হয়। আর প্রাণ প্রথমে গানরূপে আকার পায়। সেই গানই সর্বত্র বিরাজমান।

সে গানরূপে আমার সবটুকু জুড়ে থাকে। আর আমি তার স্বপ্নের ভিতর জেগে থাকি, অর্ধনারীশ্বর, অবিদ্যা আর অমিথ্যা। একদা পেন্সিল হাতে পাতা আঁকতে গিয়ে তার করতল স্বেদে সিক্ত হলে কোথাও গভীর বনে বনে বিপ্লবীদের রক্ত জ্বলে ওঠে দেদীপ্যমাণ। একদা হেঁটে হেঁটে তার পদতল স্বেদে সিক্ত হলে লালফৌজ ছুটে যায় ঝড়ের আগে। সে আমার স্বপ্নস্বেদ। আর আমি তার স্বেদসিক্ত করতলে দীঘল আয়ুরেখা হয়ে থাকি। সে আমার আনন্দগান, স্বপ্নের অরূপ নিধান।