স্বপ্ন এক অত্যাশ্চর্য চলচ্চিত্র

নীলাব্জ চক্রবর্তী






“I love dreams, even when they're nightmares, which is usually the case. My dreams are full of the same obstacles, but it doesn't matter” –-- Luis Bunuel


অলোককাকুদের বাড়ির পিছনের দিকের পাঁচিল। য্যানো আরও একটু লম্বা হয়ে গ্যাছে এই বিকেলে। আরও একটু উঁচু। কেমন একটা পুজো পুজো। একটা দীর্ঘ সাদা ফ্রকে জুহি চাওলা। ‘কিন্তু,’ আমি বললাম, ‘আমি তো কুমড়োর তরকারী খাইনা... মানে খেতে পারিনা কখনোই... আপনি... খান দেখছি।’ জুহি চাওলা হাসলেন। সেই অতিপরিচিত বিখ্যাত হাসিটি। আর স্পষ্ট বাংলায় বল্লেন, ‘খাও... ভালোই লাগছে তো...’। আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে আসছিলো। কাছাকাছিই কোথাও আবছা “মেরা দিল ভি কিতনা পাগল হ্যায়...” আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম ‘এতো আপনার সিনেমার গান নয়... এতো মাধুরী দীক্ষিতের সিনেমা...’ জুহি চাওলা একটু কি বিরক্ত হলেন? ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ‘তো কী হয়েছে? তুমি যে ঋষি চাটুজ্জের সাথে বকখালি বেড়াতে যাওয়ার সময় শুভঙ্কর দাশের কবিতার বই সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চেয়েছিলে! মনে নেই বুঝি? চুপ করে খাও দেখি। এখন আর কথা বাড়িও না।’ পাঁচিলের মাঝেমাঝে কিছুদূর পরপর এক একটা জায়গা বেশ চওড়া মতো। এগুলোকে কাউন্টারফোর্ট না বাটট্রেস কি যেন একটা বলে... সেখানে একটাই শালপাতার থালায় ভাত। ছোলা দেওয়া কুমড়োর তরকারী মাখা। আমি

------------------------------------------------------------ ------------------------------------------------------------ ------------------------------------------------------------ -------------------------------------------
> কবিতা আর সিনেমা, এদের উভমুখিনতা নিয়ে কিছু বলুন।

>> আমি একজন কবির কথা বলবো। মায়াকভস্কি। উনি সিনেমার ব্যাপারে খুব প্যাশনেট ছিলেন। সিনেমা করেওছেন। হয়তো আরো করতেন। সিনেমার ওপর ওঁর কিছু লেখাও আছে। তুমি পাসোলিনির কথা ভাবো। একজন কবি। আমি ওঁর লেখা ইংরেজি থেকে অনুবাদও করেছি। শিল্প সম্বন্ধে ওঁর ধারণাগুলো একদম অন্যরকম ছিলো। তারকোভস্কি কবি ছিলেন না বটে কিন্তু ওঁর সিনেমা ভীষণ কাব্যিক। তারপর ধরো বুনুয়েল। নিজে কবিতা লেখেননি কিন্তু যাঁদের সঙ্গে উনি বেড়ে উঠেছিলেন তাঁরা কবি। আমার মনে হয়, আসলে, জীবনযাপনটাও শিল্পের ওপর একটা ছাপ ফ্যালে। কবিতা থেকে পেইন্টিং বা সিনেমা... আবার পেইন্টিং থেকে কবিতা বা সিনেমা... এইসব যাতায়াতগুলো চলতেই থাকে সবসময়... সিনেমা থেকেও অনেক কবিতার এলিমেন্টস পাই। কবিতায় সেসব মিশে যায়। এইসব আদানপ্রদান আর কী... হতেই থাকে নানাভাবে...


> আপনার অনেক ছবি দেখতে দেখতে অনেক সময় বুনুয়েল-এর কথা মনে পড়ে। অ্যাবসার্ডিটির প্রয়োগ ইত্যাদি... এ নিয়ে যদি কিছু বলেন...

>> আমি তো বলবো আমার ভীষণ প্রিয় ফিল্মমেকার, সত্যিকারের প্রিয় ফিল্মমেকার, অবশ্যই হলেন বুনুয়েল। ওঁর কাজকে আমি সবথেকে বেশী শ্রদ্ধা করি। এছাড়া তারকোভস্কি আছেন। আরো কেউ কেউ আছেন। তোমরা জানো, যখন কুড়ির দশকে দাদায়িস্ট মুভমেন্ট শুরু হোলো, বুনুয়েল- দালি- অ্যাপোলোনীয়র এঁরা সবাই যুক্ত ছিলেন। ভেঙ্গে গ্যালো। তারপর এঁরা সবাই আবার একসাথে হলেন সুররিয়ালিস্ট মুভমেন্টের সময়। অবশ্য বুনুয়েল কখনোই সুররিয়ালিজমকে সেভাবে ব্যবহার করেননি। উনি যেটা করেছেন, বারবার বাস্তবকে এক্সটেন্ড করেছেন। যেমন ধরো, তুমি যদি দালির ছবি দ্যাখো, বোঝাই যায় যে এটা বাস্তব নয়। কিন্তু বুনুয়েলের ছবি দেখলে বুঝে যাও যে এটা বাস্তব কিন্তু ঠিক বাস্তব না, আরও যেন কিছু আছে। ওটাই আমি করছি, করেছি আমার প্রায় সব ছবিতেই। বারবার ওটাই বেরিয়ে আসে। এগুলো কিন্তু কোনোটাই ওরকম সাজিয়ে হবেনা। যেমন কবিতা যদি ভেতর থেকে তৈরী না হয়, মানে শব্দের পর শব্দ সাজালেই তো আর কবিতা হয়না, তেমন আর কী। আমি নাম করবোনা, কিন্তু আমার সমসাময়িক অনেকেই চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ওই বাস্তবকে দু-দিক থেকে টানা, ওই এক্সটেন্ডেড রিয়্যালিটি... না। পারেন নি। আসলে এটা শুধু মেধার ব্যাপার নয়। অনেক কিছু জড়িয়ে আছে। দ্যাখো, সিনেমায় অসুবিধেটা হচ্ছে, সেখানে ভিস্যুয়ালটাই দ্যাখানো হয়। তুমি যেটা ভাবলে সেটা হয়তো দ্যাখাতেই পারলে না যদি না তোমার ক্যামেরা সম্বন্ধে এবং ক্যামেরার ব্যবহার সম্বন্ধে, লেন্স সম্বন্ধে, আলো, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পোজিশন... এরকম অনেক খুঁটিনাটি টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো সম্বন্ধে একটা ভীষণ ভালো ধারণা না থাকে। ইউ হ্যাভ টু বি আ মাস্টার। আবার... ধরো... অনেকে নতুন কিছু করতে, এক্সপেরিমেন্ট করতে ভয় পান। আসলে কম্যুনিকেট করতে জানতে হবে তোমাকে। তোমাকে জানতে হবে যে গাছ কথা বলে তোমার সাথে, তোমাকে জানতে হবে যে পাথর কথা বলে তোমার সাথে...

> সিনেমা যে ক্রমে ক্রমে ন্যারেটিভ-এর দখলে চলে গ্যালো, এটা কি আপনার কাছে একটু দুঃখজনক মনে হয় না? ন্যারেটিভ-এর বৈচিত্র্য নিয়ে, তার ভূমিকা নিয়ে যদি সংক্ষেপে কিছু বলেন...

>> না, দ্যাখো, আমি ন্যারেটিভ-এর দোষ দিইনা। ওটাও একটা ফর্ম, একটা স্ট্রাকচার। তুমি আমাদের ভারতবর্ষের এপিকগুলোর কাছে চলে যাও। মহাভারত দ্যাখো, রামায়ণ দ্যাখো। আমাদের এপিকগুলোয়, পেইন্টিং-এ কীভাবে বাস্তবের সাথে ওই আনরিয়েল এলিমেন্টসগুলো মিশে থাকে... এক্সটেন্ডেড রিয়্যালিটি তো আছেই। কাজেই এই যে সিনেমার মধ্যে কবিতাকে খোঁজা, সিনেমার কবিতা হয়ে ওঠা, এগুলো আমাদের একদম ভারতবর্ষীয় ব্যাপার। আর ন্যারেটিভ, দ্যাখো, ছোটবেলায় গল্প শুনতে আমরা সবাই ভালোবাসি। ন্যারেটিভ তুমি করতেই পারো, কিন্তু শুধু ন্যারেটিভ নিয়ে পড়ে থাকলে তো সেটা দুঃখজনক। দ্যাখো, সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক... এঁরা খুবই বড়োমাপের পরিচালক। কিন্তু, ওই ন্যারেটিভকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন। এঁরা কেউই ওই বাস্তবকে দুদিক থেকে টানা... ওই ব্যাপারটা করেননি। বাস্তবকে বাস্তব হিসেবেই মেনে নিয়েছেন।
আমার মনে আছে, একবার আড্ডা হচ্ছে, সত্যজিত বাবু আছেন, সমর সেন আছেন, আমি তখন ছোট, বসে আছি ওখানে, শুনছি চুপ করে ওঁদের কথাবার্তা... একটা সময়ে দেখলাম, সত্যজিত বাবু গোদারের ছবি নিয়ে হাসাহাসি করছেন! মানে গোদারের ফিল্মমেকিং-এর স্ট্রাকচার যে একটা টেকনিক, একটা ধারা, সেটা উনি মানতেই চাইতেন না। মানে, দ্যাখো, সত্যজিত রায় কিন্তু আদ্যোপান্ত একজন গল্প-বলিয়ে। হ্যাঁ, অসামান্য একজন গল্প-বলিয়ে, অসাধারণ সব ছবি করেছেন, কিন্তু, আল্টিমেটলি, একজন গল্প-বলিয়ে। কি মুশকিল! তোমার গোদার ভালো লাগতেও পারে, নাও লাগতে পারে... সেটা অন্য প্রশ্ন। কিন্তু তুমি স্ট্রাকচারটাকে অস্বীকার করবে কি করে? আরে, ওটাও তো একটা ভঙ্গি!
------------------------------------------------------------ ------------------------------------------------------------ ------------------------------------------------------------ -------------------------------------------
আর জুহি চাওলা মুখোমুখি বসে প্রায় নীরবে খেয়ে যাচ্ছি। খেতে খেতে জুহি একবার একটু নড়েচড়ে বসলেন। ডান পা টা তুলে নিলেন পাঁচিলের ওপর। হ্যাঁ, হাঁটুমুড়ে। ফ্রকটা সরে গিয়ে অনেকখানি বেরিয়ে পড়েছে ধবধবে ফরসা ঊরু। সেদিকে খেয়ালই নেই কোনো... একমনে খেয়ে যাচ্ছেন। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। কাগজে বা টিভিতে বরং অনেক মন দিয়ে দ্যাখা যায়... কিন্তু সামনাসামনি... একদম কাছ থেকে... নাহ। আশ্চর্য তো। এর মানেটা কী ? চেনাজানা দূরের মেয়েরা কাছাকাছি থাকলে তাদের প্রতি যৌনতা অনুভব করা যাবে না ? লজ্জা লাগবে ! হলুদ বাথরুমের মেঝেতে বসে আমি চক দিয়ে কতবার অধিবৃত্তের ছবি এঁকেছি... সমীকরণ লিখেছি... ওয়াই স্কোয়ার ইজ ইক্যুয়াল টু ফোর এ এক্স... জুহি চাওলার বসে থাকার ভঙ্গি এঁকেছি...

হঠাৎ একটু দূর থেকে কে ‘নীল’ বলে ডাকল ? তাকিয়ে দেখি জুহি চাওলা ডাকছেন ! একটু দূরে দাঁড়িয়ে। নীল ফ্রক পরা। আচ্ছা? ওঁর তাহলে ডাবল রোল আমার এই স্বপ্নটার মধ্যে ! পাঁচিল থেকে লাফিয়ে নামতে গেলাম... এতক্ষণে খেয়াল হল আমি পুরোপুরি নগ্ন হয়ে আছি... লজ্জা লাগছিল... একবার সামনে বসা সাদা ফ্রকের জুহি চাওলার দিকে তাকালাম... একবার দূরে দাঁড়ানো নীল ফ্রকের জুহি চাওলার দিকে... এ ব্যাপারে কারোরই বিশেষ কোনও ভ্রূক্ষেপ আছে বলে মনে হলো না...

ঠিক তার পরেই দৃশ্যটা বদলে গ্যালো। দেখলাম অলোককাকুদের বাড়ির সামনের রাস্তাটা... জলভর্তি... একটা-দুটো সাপ জলের তলায় এদিকওদিক শুয়ে আছে কুন্ডলী পাকিয়ে। আমি খুব উত্তেজিতভাবে তার মধ্যেই পায়চারী করছি। কানে ফোন। ‘না না একী... আপনারা এখনো টাকাটা দিলেন না... প্রায় দুবছর হয়ে গ্যালো... বলেছিলেন সামনের মাসেই দিয়ে দেবেন... আমার এখন টাকার দরকার... আমি কবে থেকে ভেবে রেখেছি আপনাদের কাছ থেকে পাওনা টাকাটা পেলে আমি একটা ল্যাপটপ কিনবো... আমার ল্যাপটপ আট বছরের পুরনো... তাছাড়া সামনের বইমেলায় আমার একটা কবিতার বই বের হওয়ার কথা...’ ... একটু পরে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি... শীত শীত করে আমার... এতক্ষণে খেয়াল হয় জুহি চাওলার কথা... আর দেখতে পাচ্ছিলাম না... আবার একটা অন্যরকম রাস্তা... আমি দৌড়তে থাকি একই জায়গায়... অনেকক্ষণ ধরে... একই জায়গায়... নগ্ন... বুঝতে পারি সাড়ে আটটা বাজে... অফিসে লেট হয়ে যাবে আজও... রাস্তাটা হঠাৎ ফুলে উঠতে থাকে...








সুর লিখতে গিয়ে
রিয়ালি
বারবার অগাস্ট লিখে ফেলছি
আর নিজেরই দু’পায়ের ফাঁকে দাঁড়িয়ে দেখছি
গাছেদের ছবিরা কেমন বড়ো হয়ে উঠছে
পারফোরেটেড স্বপ্নদৃশ্যগুলোয়
একটার থেকে আরেকটা সহজেই ছিঁড়ে নেওয়া যায়
ভেজা ভেজা
ওটা তো ড্রাইভিং সিট তোমার
তাহলে ক্যামেরা কোথায় বসবে ভাবি
এর ওর সাদাকালো স্বপ্নের ভেতর
ঘুরতে ঘুরতে
মরচে-লাগা কবিতার গায়ে
এইসব আপেলদিবস জড়িয়ে যাচ্ছে
সারারাত ধরে
বালিশ বদলে বদলে ওভারল্যাপ করছে
আমার স্মৃতির মধ্যে ঢুকে যাওয়া
অন্যদের স্বপ্নগুলো...



------------------

সূত্র ---
কৌরব পত্রিকার জন্য চলচ্চিত্রকার ও কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত-র দেওয়া সাক্ষাৎকারের অংশ।
ছবি --- ইন্টারনেট