ভূত ভবিষ্যত সংবাদ

হামিম কামাল




। স্বপ্নে পাওয়া ভূত।

রাতে জানালার বাইরে বৃষ্টি রেখে বন্ধ করেছি কপাট। মশারি টাঙিয়ে রেখেছিল মা আগেই। আমার শুধু এক গ্লাস দুধ খেয়ে শুয়ে পড়া বাকি।
বাইরে গোলমুখো ইঁদারা আর কিছু ফুল গাছের টবের সঙ্গে দাঁড়িয়ে একা ভিজছিল আমাদের আমগাছ। মধ্যবয়েসী। হিমসাগরগর্ভা। আমের মৌসুমে চোর এলে টিনের চালার ওপর যতোই পা টিপে হাঁটুক, ধরা পড়ে যেত। ধরা পড়ার ভয় ছিল না কেবল বৃষ্টির। সে তার আদর জানে। চালার ওপর ঝমঝমিয়ে নামতো।
বালিশের নিচে ছিল তিন গোয়েন্দার বই ‘ভীষণ অরণ্য’। ভেবেছিলাম বাবা এসে বাতি নিভিয়ে দেওয়ার আগে যে কয় পাতা পারি পড়ে নেব। তা আর হলো কই? দুধের গ্লাসটা ফেরত দিলাম, আর মা-ও বাতিটা দিলো নিভিয়ে। ভীষণ অরণ্যে কিশোর, মুসা, রবিন আর বৈমানিক ওমর শরীফ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এ কী হলো!
কিচ্ছুটি বলার ছিল না। আর কোনো গতি নেই বলে চোখ বুজলাম।
মাথার হাত দশেক ওপর টিনের চালার ওপর বৃষ্টি ঝরছে। ছাদের কাছেই দাঁড়িয়ে বাতাসে মাথা দোলাচ্ছে আমগাছটা। টিনের চালার ওপর যেন ঝাঁট দিচ্ছে তার পাতায় ভরা ডাল। পাশ ফিরে শুলাম। জানালার কপাটজোড়ের নিচে খানিকটা ফাঁক। ফাঁক গলে বাইরের বেশ খানিকটা দেখা যাচ্ছিল। অনিয়মিত বিরতিতে চোখে পড়ছিল বিদ্যুতের নিঃশব্দ ঝিলিক। বদ্ধ অন্ধকার আমার ঘর। আকাশের আলো ওই ফাঁক পথে বাইরের সঙ্গে আমার যোগ ঘটালো। ঠিক কখন মগজের ভাঁজে সেই অমোঘ চলচ্চিত্রের বলন নড়ন চিত্রায়ন শুরু হয়ে গেলো টেরও পেলাম না। কেউ কি টের পায় আদৌ?
দেখলাম, কুয়োর পুরনো ইট গলে পানি নেমে যাচ্ছে নীচে। শান্ত কালো বৃত্তাকার একটা গহ্বর, বুঝি কোনো তল নেই। ওপরে বাবার তৈরি তারজালির ঢাকনা থাকায় আমপাতার আর পাতালগমন ঘটেনি।
ভিজছে আমার সাধের রঙ্গনটার বড় বড় পাতা। সঙ্গে পাতাবাহারের ভারি পাতাটা আমার মন খারাপে সায় দিয়ে মাথা ওপরনিচ করছে থেকে থেকে।
আরো দেখলাম, বৃষ্টির বিজলি-ঝিকমিকে জল আমগাছের কালো শরীর ধরে নামছে। উঠোনের শেষপ্রান্তে নর্দমা, আগের বাসার সীমানা দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে চলে গেছে পরের বাসার সীমানা দেয়ালের দিকে। ওই দেয়াল হয়ে ঢোকার মুখটায় বুঝি আটকে আছে এঁটোকাঁটায় ভরা এক পলিব্যাগ। একটা আঁধারচাপা আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলাম ধীরে উঠানে উঠে আসছে নর্দমার জল। আকাশভাঙা সাদা জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে কালো।
প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল এমন সময়। আমগাছের ডালে তাকিয়ে দেখি, তুমুল বৃষ্টিতে ভিজেই চলেছে নগ্ন এক লোক। আবার বিদ্যুৎ চামকালো। আলোয় দেখতে পেলাম তার ভেজা সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাঁপছে। দু পা তুলে আমগাছের মোটা এক ডালে সে বসে আছে আর বাতাসের রোষে দুলছে ওপরনিচ। দাড়িভরা মুখ এমনভাবে আড়াল যেন বুকের রোম গুনছে। মাথা ভরা কালো উপচানো চুল।
এই যে, এই!
তাকে ডাকলাম। শুনতে পেল না। মেঘে মেঘে মাথা ঠুকলো আরো ক’বার। সে আলোয় মনে হলো লোকটা কিছু জপছে। আর দুলছে তো দুলছেই। থেকে থেকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে মাথার কাছে এসে জড়ো হওয়া সরু ডালপালা। ভেজা ডাল হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে বারবার।
আবারো ডাকলাম, এই! এই যে!
বাজ পড়ার শব্দে ডাক ঢেকে গেল। ঢেকে যে গেল শুধু তাই নয়। ঘুমটাও ভেঙে গেল। মনে হলো জানালার বন্ধ কপাটের টিনের পাতে কেউ আঁচড় কাটছে। আম গাছের ডাল।
শিয়রের কাছে একটা সবুজ কাচের বোতল থাকত ঘুমের সময়। ছিপি খুলে গলা ভেজালাম। শীতল মেঝেতে পা নামিয়ে ঘুরে এলাম স্নানঘর থেকেও। মুখ চোখ ভেজা। ঘুম চটে গেল। কিন্তু মাথা থেকে কোনোভাবেই ওই লোকটা গেল না।
একেকবার মনে হচ্ছিল বাইরে গিয়ে দেখি। সত্যিই যদি কেউ থাকে? কিশোর মন যতোই কল্পনাবিলাসী হোক, বাস্তবের সঙ্গে পার্থক্যগুলো তো করতে ঠিকই শিখেছে। আর যাওয়া হলো না।
বিছানায় এসে ফের শুয়ে পড়লাম। আর ভাবতে থাকলাম লোকটার কথা।
কে সে? মনে হচ্ছিল, ভীষণ একা ওই আদিম মানুষ। আর আমার বুঝি খুব আপন কেউ। দলের সবাই তাকে ছেড়ে গেছে।
অনেক বছর পর এখনো মনে পড়ে কৈশোরের ওই অদ্ভুত স্বপ্নের কথা।
একজন মানুষের ভেতর তার সাত হাজার পূর্ব পুরুষের সম্ভাবনা, স্মৃতি ঘুমন্ত থাকে বলে পড়েছিলাম কোথাও, জানি না সত্যাসত্য। তবে এটা নিশ্চিত, প্রচ্ছন্ন আর প্রকটের খেলায় হারজিৎ ঘটিয়ে, তাদেরই কেউ আমার মধ্যে জেগে আছে আর কেউ আছে ঘুমিয়ে। আমার সচেতন ক্রোধ, অবচেতন আঁকজোখে আমি হঠাৎ তাদের আবিষ্কার করি, কাতর হই।
এরই মধ্যে স্বপ্ন ভুলেছি কি কম? কত চোখ ভেজানো, মন পোড়ানো স্বপ্নই তো চিরতরে মুছে গেছে। কিন্তু শৈশবাক্রান্ত প্রথম কৈশোরে দেখা ওই স্বপ্ন আজো আমার স্মৃতির ঘরে তোলা। মানুষ একেকবার ঘুমে অনেকগুলো করে স্বপ্ন দেখে। মস্তিষ্কের স্মৃতি জমিয়ে রাখার পন্থাই এমন। সে ঘটনাসূত্র তৈরি করে মালা গাঁথে, ওটাই গল্প হয়ে স্বপ্ন হয়ে ধরা দেয়। নির্মোহ কাটাছেঁড়ায় স্বপ্ন তাই নিখুঁত গণিত। আমার মস্তিষ্কে প্রোথিত দূর অতীতের স্মৃতিও যদি বিশেষ কোনো মুহূর্ত মেপে ও মেনে আমার স্বপ্নে এসে হাজিরা দিয়ে যায়, তবে সেটিও কিন্তু গণিতের বাইরে নয়।
এই স্বপ্নে পাওয়া দৃশ্যটিকে আমার ভূত অর্থাৎ অতীত বলে ভাবতে বেশ লাগে। বুঝি কোনো মারীবিধ্বস্ত গ্রামে সঙ্গীরা আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর ঝড়ের রাতে আমি একা, ক্ষুধার্ত, ভীত; অমন বুড়ো শকুনের মতো ভিজছিলাম কোনো গাছের ওপর। সেদিনের কাতরতাময় স্মৃতি এ অব্দি বহন করে নিয়ে এসেছে আমার প্রাণতন্তু। আর প্রজন্মান্তরে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাতে কৈশোরের স্বপ্নে এসে তা ধরা দিয়ে গেছে।


। স্বপ্নে পাওয়া ভবিষ্যত।

এ স্বপ্ন মুক্তোময়ীর দেখা। তখনো আমরা স্বামী স্ত্রী হয়ে উঠিনি। শাহবাগ টিএসসি রমনায় দিব্যি প্রেম করে বেড়াই। দুজন দুজনের সঙ্গে দিনভর অনেকটা সময় কাটিয়ে রাতে বাড়ি ফিরি। পরদিনের অপেক্ষায় আমাদের সময় আর কাটতেই চায় না। এ অবস্থায় একদিন স্বপ্নটা দেখল মুক্তোময়ী।
স্বপ্নটা এমন আহামরি জমাট নিরেট কিছু নয়। প্রথম যৌবনের ভাবালুতায় পূর্ণ। কিন্তু আমি এর অর্থকে যেদিকটায় হাতে ধরে নিয়ে গেছি, অথবা সেই আমাকে যে দিকটি দেখিয়ে দিয়েছে, তাকে ঠিক তুচ্ছ করা চলে না।
একরাতে মুক্তোময়ী স্বপ্নে দেখল ভীষণ ব্যস্ত এক বাস টার্মিনাল। সেখানে সে একা দাঁড়িয়ে আছে। দিব্যি রোদ। ওড়নায় কপাল, কপোল এসব মুছতে হচ্ছে ঘন ঘন। দাঁড়িয়ে আছে বটে, কিন্তু কেন এই দাঁড়িয়ে থাকা, তা মনে করতে পারছে না। হঠাৎ মনে পড়ল। সে যে বাড়ি যাবার টিকিট করতে এসেছে! অনেকদিন তার বাড়ি যাওয়া হয় না।
একটা বাস কাউন্টারের দিকে এগোতে শুরু করল মুক্তোময়ী। ভেতরে ঢোকার ঠিক আগে দেখতে পেল নাকের নিচে বাবার মতো গোঁফ আর চশমা পরা এক ঝাঁকড়া চুলের তরুণকে। টিকিট ক্রেতার সারিতে দাঁড়িয়ে, ঠিক তার বয়েসী। ছেলেটি যেন তার খুব চেনা। বুঝি কত স্মৃতি জমা তার সঙ্গে। এটুকুর বাইরে আর কিছুই মনে পড়ছে না। টিকিটের সারিতে দাঁড়ালো সেও। এই সূত্রে একের সঙ্গে অপরের আলাপের হলো শুভ সূচনা। কত মিষ্টি আলাপই না হলো হাত পা নেড়ে হেলে দুলে।
কিছুটা সময় আলাপে যেতেই ওই তরুণের ভেতর সে আমাকে আবিষ্কার করতে শুরু করল। স্বপ্নে এক ব্যক্তির ভেতর আরেক ব্যক্তি আবিষ্কারের বিষয়টি হুট করেই ঘটে। সুতরাং দেখা গেলো, ‘নজরকাড়া’ তরুণটি আমিই স্বয়ং। মূর্তিমান শিব, যার ধ্যানী অপর্ণা সে!
কাউন্টারের ব্যস্ত লোকটা জানালো দুজনের আসন পাশাপাশি ফেলার কোনো উপায় নেই। অর্থাৎ পাশাপাশি কোনো সিট খালি নেই কোনো। মাথায় বাজ! তরুণটির টিকিট তো সকালেই কাটা হয়ে গেছে। পাশে অন্য লোক।
দুজনেই কাউন্টারের যাত্রীদের অনুরোধ করতে শুরু করল। একে একে গেল সবার কাছেই। বলল, দেখুন, আমরা একসঙ্গে তো, বুঝতেই পারেন। আমরা কেউ কাউকে রেখে যাবো না, আবার গেলে আমাদের একসঙ্গেই যাওয়া চাই। সুতরাং, একটু যদি দয়া করেন, একটু দয়া!
যাত্রীরা বলছিল, এ তো হতে পারে না বাবা।
দেখুন, এই আমরাই কত কষ্ট করে টিকিট করলাম জানালার পাশে, পাশাপাশি, ধরুন যদি বমি হয়, তো?
আমার স্ত্রীর শরীরটাও খারাপ ভাই, ওর পাশ থেকে তো সরতে পারি না।
বাচ্চারা ওই সিট নিয়ে আনন্দ করছে, ওরা মন ঠিক করে ফেলেছে বুঝতেই পারেন!
না ভাই না, এটা সম্ভব নাকি। আরে পরের বাসে আসুন না ভাই! সব সুবিধা কি একসঙ্গে পাওয়া যায়?
মুক্তোময়ী এবার ফিরল ছেলেটির দিকে। তাই তো। ওই বাসেই যেতে হবে কেন? পরেরটায় গেলে হয় না? সেখানে নিশ্চয়ই মিলবে পাশাপাশি সিট।
কিন্তু আমার যে প্রথমটাতেই যেতে হবে মুক্তো! যেতেই হবে। একেবারে প্রথমটাতেই। নয়ত সর্বনাশ। আচ্ছা, দেখি না কিছু করা যায় কিনা। একটা কোনো উপায় ঠিকই মিলবে। তুমি ভেবো না।
অভয় দিলাম আমি, কিন্তু মুক্তোময়ীই আমার পাশের লোকটিকে খুঁজে পেয়ে অনেক অনুরোধের পর সে বেচারার আসনের দাবি ছাড়িয়ে নিলো। দুজনার পাশাপাশি বসার ব্যবস্থাটা হয়ে গেল অবশেষে। বেশ। পরদিন সকালে শুভযাত্রা।
রাতে বাসায় এসে মুক্তো বারবার ঘড়ি দেখছে। কখন ঘুমোতে যাবে? বাস যেহেতু ভোরে, সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়াই উচিৎ। অ্যালার্ম ঠিক করে শুয়ে পড়ল।
স্বপ্নের ভেতরের সেই ঘুম একবার ভেঙেও গেল। ঘড়ি দেখে আবার মুক্তো বালিশে রাখল মাথা। এর ক’মুহূর্ত পর যখন ঘুম ভাঙল মুখের ওপর রোদ চিড়চিড় করছে। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল মুক্তোময়ী। রাতে বেরোবার জামা পরেই ঘুমিয়েছিল। ব্যাগও দিব্যি গুছিয়ে রাখা। চোখে মুখে একটু পানিও ছিটাল না। সাদা দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা ব্যাগটা কাঁধে ফেলেই ছুটল। পেছন থেকে কত ডাকল কারা যেন, কানেই তুলল না।
বোধয় উড়ে উড়েই পৌঁছুল ওই বাস টার্মিনাল। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। বাসটা তাকে রেখেই ছেড়ে দিয়েছে। শত ডাকলেও এখন আর থামার নয়। একটা আলো ঝলমলে পথের মোড়ে দেখতে দেখতে সেই স্বপ্নশকট হারিয়ে গেল। কোনো পিছুডাক শুনলো না।
ঘুম ভাঙলে মুক্তোময়ী দেখল চোখের জলে বালিশের ওপর বাংলার ভগ্ন মানচিত্র আঁকা হয়ে গেছে। শহীদ মিনারের সিঁড়িতে বসে আমাকে এ স্বপ্নের কথা বলতে বলতে সে আরো একবার চোখ ফুলিয়েছে পরদিন।
আজ দেয়ালে যখন আমাদের বিয়ের ছবির ওপর এক কর ধুলো, তখন হঠাৎ একদিন মনে হলো এ আমার স্বপ্নে পাওয়া ভবিষ্যৎ। শঙ্কানুভব বলো, প্রেমানুভব বলো— এসব যে কারো মান অভিমানের দিকে যে তাকিয়ে থাকে না! খুব কাট কাট।
‘দেখো আমি তোমার আগে মরে যাব।’
‘বললেই তো আর হলো না। আমিই বরং মরব তোমার আগে। এবং এটাই হবে দেখো।’
বয়স পক্বতা নির্বিশেষে মাঝে মাঝে হয় না এমন প্রগলভ খুনসুটি? হয় তো। সব দম্পতিরই হয়। হয় আমাদেরো। এমন খুনসুটি শেষমেষ কোনো সিদ্ধান্তে আসা ছাড়াই শেষ হতে হয়। সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নাকি আদৌ? না, সম্ভব নয়। এরপরও কেন যেন মনে হয়, আমাদের বেলায় কী ঘটতে চলেছে তা আমি ঠিক জেনে গেছি।
কাল— নামছে ধরে ঢাল। মাঝে মাঝেই তো ভাবি, এই যে অভ্যস্ত তারুণ্যে শক্তিতে সুন্দরে কাটছে একেকটি দিন, এও তো অবশ্যম্ভাবী একদিন অদ্ভুত অবিশ্বাস্য ঠেকবে। এখন নাহয় বিশ্বাস হতে চায় না।
তেমনই একদিন মুক্তোময়ীর অবিশ্বাসী চোখের সামনে হয়ত তার স্বপ্নশকটটা শুধু আমাকে নিয়েই ছেড়ে যাবে। বৃথাই এসেছ বালিকা! এ বাহন নেবে না তোমাকে।

*