স্বপ্নলোকের চাবি

সাগুফতা শারমীন তানিয়া




“স্বপ্ন হইলো উম্মতে মুহম্মদীর কাছে আসা ওহী...এইজন্য স্বপ্ন কাউরে কইবা না, এমন কাউরে কইও না যে স্বপ্নের কদর্থ করবো। কারণ স্বপ্ন প্রথম বর্ণনাকারীর বর্ণনামোতাবেক ফলে।”

উম্মতে মুহম্মদী হিসেবে সালেহাবিবির নাতনি যে ওহীপ্রাপ্ত হয় তার নাম স্বপ্ন। (তার পোষ্য বেড়াল মোটুও ওহীপ্রাপ্ত কি না সে কথা দাদীকে জিজ্ঞেস করার আর উপায় নেই, সালেহাবিবি মারা গেছেন। মোটুকে প্রায়ই তাঁর নাতনি রোকেয়া দেখে ঘুমের ঘোরে মেঠো ইঁদুর ছানতে, কিংবা ঘুমের ভেতরেই ঘাপটি মারা জায়গা থেকে লাফ দিয়ে ঘুম থেকে জেগে যেতে। আচ্ছা, ঘোড়া যে কিনা দাঁড়িয়ে ঘুমায়, সে কি স্বপ্ন দেখে? দেখে সপাটে লাথি কষায় কাউকে? রাতচরা পাখিরা কি দিনে স্বপ্ন দেখে? শেয়াল?)

কখনো রোকেয়ার সুপ্তোত্থিত অস্তিত্বে স্বপ্ন রেখে গেছে স্বপনপাড়ের ডাক, মধুর স্বপ্নের আমেজ। কখনো সমস্ত দিন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে দুঃস্বপ্নে পাওয়া দুর্ভাবনা, ঈর্ষা এবং সন্দেহ। কখনো জাগৃতির অল্প অল্প ঢেউ এসে মিশেছে রোকেয়ার স্বপ্নে আর সে মাথা নেড়ে নেড়ে ঘুমের ভেতর কেঁদেছে আর বলেছে- না, না, না। (আমি স্বপনে রয়েছি ভোর সখী আমারে জাগায়ো না।) রোকেয়ার এককালীন বন্ধু রাফিয়া গভীর ঘুমের ভেতর কেঁদে কেঁদে অবাক গলায় বলতো, কেন, কেন, কেন? ইস্কুলে গার্লসগাইড হয়ে রোকেয়ারা যখন মাঠের তাঁবুতে রাত কাটিয়েছিল, তখন সে দেখেছিল রাফিয়াকে এইভাবে কাঁদতে। এইসব দেয়ালা আপনজনরা ছাড়া কেউ দেখে না, কেউ জানে না। বালিশ কিংবা তেঁতুলপাতা ভাগের স্বজন ছাড়া কেউ এইসব মনেও রাখে না। অনেক সময় বালিশের ভাগিদাররাও মনে রাখে না। রোকেয়া আশৈশব অনেক স্বপ্ন দেখেছে, অনেক। ‘হংপাল’ রিদয়ের মতন সমস্ত সময় স্বপ্নে রুপোলি হাঁসেদের সাথে উড়েছে। কৈশোরের শুরুতে সিনেমার পল নিউম্যানকে দেখে ভোররাতে জেগে উঠে জেনেছে নারী হয়ে উঠবার কাল শুরু হলো, সোনা রোদ ভেঙে পড়া সকালে যৌবনের সিংহদরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সে স্বপ্নের হাত ধরে। (আকালে লক্ষী হ’ব, সময়ে পুত্রবতী হ’ব।) আমি জানি, রোকেয়াও জানে, রোকেয়ার থেকে তার স্বপ্নকে বিয়োগ করে যে সমীকরণ তা হচ্ছে একতাড়া বিবর্ণ শাদা কাগজ।

“ভূয়শ্চাহ ত্বমপি শয়নে কন্ঠলগ্না পুরা মে
নিদ্রাং গত্বা কিমপি রুদতী সস্বরং বিপ্রবুদ্ধা।
সান্তর্হাসং কথিতমসকৃৎ পৃচ্ছতশ্চ ত্বয়া মে
দৃষ্টঃ স্বপ্নে কিতব রময়ন্‌ কামপি ত্বং ময়েতি।”
যক্ষের স্ত্রী যক্ষের বক্ষলগ্ন হয়ে ঘুমের ভেতর কাঁদছিলেন, কোন এক নারী যক্ষের বক্ষলগ্না হয়ে ঘুমিয়ে আছে দেখে। যক্ষের স্ত্রীর মতন করে প্রিয়পুরুষকে আলিঙ্গন করে থেকেই কত দুঃস্বপ্ন দেখেছে সে। প্রগাঢ় নিদ্রা থেকে যখন ঘুমন্ত স্বামী তার স্তনস্পর্শ করে জাগিয়ে দিয়েছে, রোকেয়া গভীর সন্দেহে লোকটাকে জাগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছে- আমি কে? স্বপ্নও পাহারা দিতে চায় বলে রোকেয়াকে ছেড়ে গেছে তার স্বামী। অথবা স্বপ্নে রোকেয়ার তীক্ষ্ণ ধী এবং দেখবার স্পষ্টতা সইতে পারেনি বলে রোকেয়াকে ছেড়ে গেছে তার স্বামী। কিংবা এমন আকুল কামনার দর্পনে ভালবাসার মুখ দেখতে অক্ষম বলে রোকেয়াকে ছেড়ে গেছে তার স্বামী। সেইসব উগ্র দ্বন্দ্বের কাল নিয়ে পরে কখনো কথা বলি।

রোকেয়ার নানী রোকেয়ার দাদী সালেহাবিবির মতন বিএবিটি পাস ছিলেন না। আমসিপারা বুকে নিয়ে মাদ্রাসায় দৌড় দিতেন হয়তো সকালে, লিকলিকে বেত শপাং শব্দে নামতো গায়ে, বাড়ি ফেরার পথে ‘ওয়াত্ত্বিনি ওয়াজ্জাইতুন’ তীন আর জয়তুন ভুলে, ডুমুর আর জলপাই ভুলে ভাঁটঝোপের কাছটায় এসে ভিড় করতেন রোকেয়ার নানী, শমসুনবিবি। বেলগাছে একটি দুধশাদা পেঁচা এসে বসেছে, দিনের আলোয় তার স্বপ্নালু চোখে সে কিছুই দেখতে পায় না, এই সুযোগে মেলা কাক তাকে খোঁচাচ্ছে। ছেলেপুলের সাথে ভিড় করে দেখতেন শমসুনবিবি আর তার প্রায় ৪০ বছর পরে রোকেয়াকে শোনাতেন, “স্বপনের ঘোর চুখে লাগলে গো, দিনে তালকানা, রাইতে রাতকানা হইবা।” আর শমসুনবিবি মেঘলা দিনে পুরানা শাড়ির পাড় থেকে সুতো তুলে কাঁথা সেলাই করতে করতে গাইতেন, ‘আমি স্বপনওওও দেখিলাম মধুমালার মুখ’, তাঁর নাকের নাকছাবিতে ঝলকায় ম্লান বেলার আলো, স্বপ্নে মধুমালা আর মদনকুমার চন্দনরঙা চাদর অদলবদল করে, আঙটি বদল করে। তাঁর সাথে গলা মিলিয়ে কত দিন রোকেয়াও গেয়ে উঠেছে, ‘বেলা দশটা বাইজ্যাছে, মদনকুমার ছাআআআআন করতে চইলাছে’।

সালেহাবিবি কিন্তু এইসব গান শুনলে দাঁত কিড়মিড় করতেন, খোয়াব বিষয়ে ‘কাসাসুল আম্বিয়া’তে আর ‘তাজকেরাতুল আউলিয়া’তে কী আছে গো কইন্যা? রাজদাসী আইসা হজরত সোলেমানরে কইলো, আমি স্বপ্নে দেখলাম হাজার লোকে আইসা এক এক কইরা আমার সাথে সোহবত কইরা যায়। আমি লজ্জায় মরি হে পয়গম্বর। হজরত সোলেমান শুইন্যা কইলেন,স্বরূপকথা ক’ রে নোকরানী, এ তো তোর স্বপ্ন না। দাসী মরমে মইরা কইলো, বাদশার বেগম এই খোয়াব দেখছে গো নবী, শরমে আইস্যা কইতে পারে না। সোলেমান নবী কইলেন, তারে খুশির পয়গাম দ্যাও, এই খোয়াবের মানে হইলো তিনি কূপ খনন করিবেন আর শতশত লোকে সেই পানি খাইয়া উপকৃত হবে আর তার গুনগান করবে। রোকেয়া এইসব গল্প আস্তিকের মতো মুখ করে শুনতো, কিন্তু তার ধর্মভীরু বুকের ভিতরে শিরশির করে মনে হতো কূপ মানে যোনি, না যোনি মানে অতল কূপ? যে স্বপ্ন বুঝতে পারে, সে ভবিষ্যত দেখতে পায়?

সালেহাবিবি মারা যাওয়ার পরে রোকেয়া তুলে রাখা হারমোনিয়ম বাজিয়ে বাজিয়ে নজরুলগীতি শিখলো, ‘যেন ফাগুনের জোছনাভূষিত রাতে নামিল তমসা... ভোরের স্বপনে কে তুমি দিয়ে দেখা লুকালে সহসা’। ক্যাসেটপ্লেয়ারে শুনলো, ‘স্বপ্নে আমার মনে হলো কখন ঘা দিলে আমার দ্বারে’। ছোড়দার বন্ধু মহফিল এসে ছোটফুপুর বিয়েতে গান গাইলো, ‘আমি স্বপনে তাহারে কুড়ায়ে পেয়েছি রেখেছি স্বপনে ঢাকিয়া’, রোকেয়া অনেকদিন অব্দি সেই গানের কথা ভুলতে পারলো না- ‘হয় স্বপনে প্রেম-কলহ যায় গো স্বপনের সনে ভাসিয়া/ যা কিছু আমার দিতে পারি যেন সুখস্বপনের লাগিয়া’... পুরুষের প্রেম, পুরুষের অভিমান নিয়ে কী বিচিত্র হবে ভবিষ্যতের দিনগুলি, প্রিয়কলহ আর প্রিয়সান্নিধ্যে সোনালি এক ঝাঁক দিন সামনে! রোকেয়ার বন্ধু রাফিয়া আর তার বোন শাফিয়া দু’জনেই সবুজ কালিতে একই হাতের লেখা একটা চিরকুট পেয়েছে যাতে লেখা- ‘আমি ভোরের স্বপ্নে দেখেছি তোমারে বধুয়ার বেশে এসেছ’। রাগ করে রাফিয়া-শাফিয়া অচেনা পত্রলেখকের স্বপ্নদোষ নিয়ে আর বোন-সতীনের ঘর নিয়ে একবেলা মুখ খারাপ করেছে, তারপর হাসির জলে ধুয়ে গেছে রাগের চিহ্ন। তিনজনে মিলে গ্রেট স্টোরিজ ইন ইজি ইংলিশ সিরিজ থেকে বের হওয়া সচিত্র ‘আ মিডসামার নাইট’স ড্রিম’ পড়েছে বাকি বেলা।

দুঃখের বিষয় এই, রোকেয়া প্রথম যার প্রেমে পড়লো সে অম্লানবদনে তাকে জানিয়ে দিল সে স্বপ্ন দেখে না। সে হয় জেগে ঘুমায়, অথবা আগে ঘুমায় পরে বিছানায় যায় অতএব স্বপ্ন দেখা তার হয় না। রোকেয়ার স্বপ্ন (শুনতে সুলতানার স্বপ্ন মার্কা শোনাচ্ছে) সাধই থেকে যায়, এমন একটি অসংবেদনশীল মানুষের সাথে তার পদচারণা মেলে না। কদম কদম বাঢ়হায়ে রোকেয়া আরো কিছু খুচরো প্রেমে পড়ে। স্বপ্নলোকের চাবি কোথাও ঝুনঝুন করে বেজে ওঠে না। বাস্তবেও জোড়কদমে চলতে পারে, স্বপ্নেও উড়তে পারে এমন পক্ষীরাজ পুরুষকুলে কই পাবে রোকেয়া!

স্বপ্নে উড়বার ডানা ছিল বলে রোকেয়া শিল্পী হলো। আঘাত যা কিছু জুটলো পদে পদে, রোকেয়া ভেবে নিল শিল্পীর জীবনে এমন ঘটে। স্বপ্নাবিষ্টের মতন উদাসীন পথ চলতে না পারলে, স্বপ্নাদিষ্টের মতন লক্ষ্যের দিকে চলতে না পারলে শিল্পী হতে পারবে না। এইসব জেনে রোকেয়া খুব হাঁটলো। বেইল থাকতে হাইট্টা যাইও... বেইল মানে বেলা পড়ে যাওয়ার পরেও রোকেয়া হাঁটতেই থাকলো। তার শিল্পী পুরুষবন্ধুরা মুখ বাঁকিয়ে অস্কার ওয়াইল্ড আর সমারসেট মম এঁরা কে কিভাবে মিডিওকার শিল্পী বা অ-শিল্পীর ভাগ্য নির্ধারণ করে গেছেন, মেয়েরা কোন কোন নিরিখে মিডিওকার সেইসব বলতেই থাকলো। রোকেয়ার তেমন গায়ে লাগলো না, এমন কত কী দুঃস্বপ্নের দুনিয়ায় হয়। গুলফের ডানা সবাই দেখতে পায় না তো। শিল্পীদের যত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেইসবের শিক্ষকরাই পায় না আর সহিংস সহশিল্পী! রোকেয়া ভ্যান গখের আঁকা বিছানার দু’খানা বালিশে একাকী মানুষের সঙ্গীকামনা খুঁজে পেয়েছিল, সেই রচনাটিতে তার শিক্ষক তাকে দশে শূন্য দিয়েছিলেন। শিল্পভাবনায় যে শূন্য বসাতে পারে, সে যদি শিল্পের শিক্ষক হয় তবে আর বাকি থাকে কি?

বাদশাহ-বেগমদের রাজাদের দুঃস্বপ্ন যেমন ফলে যেত, সিজারদের দুঃস্বপ্ন, তেমন করে একদিন রোকেয়ার দুঃস্বপ্নও ফলে গেল। ওহো, রোকেয়া সবচেয়ে বেশি যে দুঃস্বপ্ন দেখেছিল এ জীবনে সেটা হলো, সে একটা আমবাগানের ওপরে উড়ছে কিন্তু নামতে পারছে না। এই আম্রকূট কী? সফলতার সরসতার উদ্যান? নামতে পারছে না কেন সে? তার উড়বার মুনশিয়ানা আছে অথচ অবতরণের অধিকার নেই তাই? যে উড়তে পারে, সে উড়ে গিয়ে একটা মগডালেও তো বসতে পারে, রোকেয়া কেন পারে না? দুঃস্বপ্নে সে শুধু উড়তে শিখেছে, কুলায় ফিরতে শেখেনি। রোকেয়ার সাথে মেরাজুলের দেখা হলো। মানে মেরাজুলকে রোকেয়া দেখতে পেল, মেরাজুল রোকেয়াকে কি দেখলো, কেমন করে দেখলো, আর কেউ রোকেয়ার জায়গায় থাকলেও মেরাজুল তাই তাইই দেখতে পেতো কি না এইসব ডিটেইল রোকেয়া আত্মজীবনীতে লিখতে পারে। আমি ততোটা জানি না। ট্র্যাজেডির পরেরটুকুন দেখে আন্দাজ করতে পারি, মেরাজুল শুধু একটা এলাচরঙ জামদানি শাড়ি পরা মেয়েকেই দেখেছিল, দুই কানে একরত্তি করে সোনা, পিঠের বিনুনি থেকে বাতাসে আছড়ে বেরিয়ে পড়া চুল। রোকেয়া একটা লোক-মাত্র দেখেনি; তার স্বর- হাসির সময় তার স্বরবিক্ষেপ-ক্ষুধার অন্নগ্রহণের আগে তার হাতা গোটানোর ভঙ্গি থেকে শুরু করে সব দেখেছিল। দেখেছিল একটা অঙ্গুলিহেলনের মতন করে, যেন অদৃশ্য অঙ্গুলি তাকে দেখিয়ে দিচ্ছে মেরাজুলকে। সেটা ছিল চন্দ্রগ্রহণের রাত। উত্তরপূর্ব আকাশে নৃত্যপাগল ব্যালেরিনার মতো মুচড়ে ওঠা শাদা মেঘ। ভুতুড়ে আলোয় রোকেয়া অজস্রবার প্রদক্ষিণ করেছিল তাদের ছাদ, উত্তর আকাশের সেই ব্যালেরিনা আরো কয়েকপাক খেয়ে ছড়িয়ে পড়েছে অসীম ভবিষ্যতের দিকে। আকাশে যেন রোকেয়ার হবুকাল লেখা। সেখানে তার সাথে একই শালপাতার শিরায় মেরাজুলের নামও লেখা। এমন স্পষ্ট করে উদ্বোধন শুধু স্বপ্নে হয়। আর হয়তো হয় চন্দ্রগ্রহণের রাতে। রোকেয়া জানতো, সামনে যা আছে তা অনিশ্চিত আর হাহাকারময়। সামনে যা আছে তাতে অফুরন্ত বেদনা আছে, আছে দুঃস্বপ্নের মতন কীসের কালো ইন্ধন। রোকেয়া যা করে তাই করলো, স্বপ্নে ঝাঁপ দিল।

হায়, যদি স্বপন মিথ্যা হয়, অঙ্গুরী কেন বদল হয়?
স্বপনে দেখি আমি মধুমালার দেশ রে।
স্বপন যদি মিথ্যা হয়, চাদর কিসে বদল হয়?
স্বপনে দেখি আমি মধুমালার কেশ রে।
দেখ যদি স্বপন মিথ্যা হয়, পালঙ্ক কি বদল হয়?
হায়, স্বপনে দেখি আমি মধুমালার বেশ রে...
যার যে কোনো এলাচরঙ চটকানো জামদানি পরা উড়ু-উড়ু চুলের মেয়ে চলবে, তার রোকেয়া চললো না। রোকেয়াও দেখতে পেল, দুঃস্বপ্নের চন্দ্রগ্রহণের রাত্রিকে ঘিরেও কত বিভা, বাস্তবের গ্রহণকাল বিভাময় নয়। মেরাজুলকে নখী-দন্তী-শৃঙ্গী প্রাণী হিসেবে এঁকে টাঙিয়ে রাখলে একটা ফভিস্ট ছবি হবে কিংবা দালির আঁকা কোনো ছবি, কিন্তু বাস্তবের নখী-দন্তী-শৃঙ্গী মেরাজুল কোনো শিল্প নয়, তাকে দুঃস্বপ্নের খাতিরেও সওয়া যাচ্ছে না।

একপশলা বৃষ্টির পরে যেমন পৃথিবী একই রকম থাকে, শরতের অকালবর্ষণের রাত ভোর হয় আর ঝড়ের পরের নিস্তব্ধতায় বড় বেশি জোরে শোনা যায় শালিকের শিস, বিয়ে তেমন একপশলা কিছু হলে ভালই হতো তাই না রোকেয়া? বিয়ে ভেঙে গেলে বহুদিন জলমগ্ন বন্যার্তর মতন বেঁচে থাকতে হয় তার, পাখিদের জেগে ওঠা নেই, নতুন মুকুল গজিয়ে ওঠা নেই। শুধু পানি নেমে যাওয়ার প্রতীক্ষা আছে, জলাবদ্ধতার পীড়া আছে। এইসব দৈনন্দিন সংকটের ভিতরেও তার স্বপ্ন বেঁচে আছে, মাঝে মাঝে নড়াচড়া দিলে বোঝা যায়। রোকেয়ার একটা সন্তান জন্মাতে জন্মাতে জন্মে নাই। বাচ্চাটা যখন পেটে ছিল, রোকেয়া ঘুমের ভেতর প্রায়ই দেখতে পেত এক ডাইনি বুড়ি জানালার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর পেটের ছানার হাতপায়ের সব আঙুল খেয়ে ফেলছে। স্বপ্ন যত না সহজে ফলে, তার চেয়ে দুঃস্বপ্ন ঢের বেশি উচ্চফলনশীল। বাচ্চাটা জন্মেনাই।

যেসব মায়েদের বাচ্চা পেটে আসে অথচ কোলে আসে না, তারা বুকে থেকে যায়। মৃতশিশু বুকে ধরে থাকা গোরিলা-মায়ের মতন তাদের বুক পচতে থাকে। এইসব সবাই জানে। রোকেয়াও জানতো। জানা আর যাপন করা তো এক নয়। আবে কাউসারের জলেই যদি মৃত শিশুরা তুষ্ট থাকতো, তারা কি আর স্বপ্নে আসতো? নিম্ননাভিতে প্রজাপতির ডানার মতন হালকা ঝাপটা দিয়ে বিভ্রাট সৃষ্টি করতো, যেন তারা এখনো আছে? দুপুরের ভাতঘুমের ভিতর টেনে মায়ের স্তন্যপান করে যেত আর মরা বিকেলের আলোয় শূন্যচোখে তাদের মা বসে থাকতো? রোকেয়া স্বপ্নে দেখতো তার সন্তান বেঁচে আছে। প্রত্যন্ত এক গ্রামে, বহু চরাই পাড়ি দিয়ে সেই পাহাড়িয়া গ্রামে যেতে হয়। সে গ্রামে শুধু সেইরকম সব শিশুরা থাকে। সবাই সেই গ্রামে যাওয়ার পথ চেনে না। কেউ কেউ চেনে। যে লোকটা চেনে তার মুখ ঠাহর করে দেখবার বহু চেষ্টা রোকেয়া করেই গেল ঘুমের ঘোরে। দেখা গেল না। একদিন দু’দিন। অনেক বার একই স্বপ্ন দেখবার পরে রোকেয়া স্পষ্ট করে দেখলো, স্বপ্নের সেই ঝাপসা চেহারার লোকটা রিয়াজুল, সেই জানে রোকেয়ার শিশুটির কাছে রোকেয়াকে পৌঁছানোর পথ। ঘুম থেকে জেগে রোকেয়া একবেলা খুব কাঁদলো। কয়েকবেলা রিয়াজুলকে স্বপ্নে দেখার লজ্জায় বাড়ি থেকে বের হলো না। যেদিন বের হলো, সেদিন সন্ধ্যার সময় রোকেয়া রিয়াজুলকে ডেকে নিয়ে গিয়ে অন্ধকারে চুমু খেল।

রোকেয়া ভেবেছিল, এই স্বপ্ন তাকে তার শিশুটির কাছে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। অনেক পরে রোকেয়া জেনেছিল এটা দুঃস্বপ্ন। রিয়াজুলও তাকে আরেকটি মৃত শিশুর ঠিকানায় পৌঁছে দেবে, (যে ঠিকানা রোকেয়া ভুলতে চলেছিল) এ হচ্ছে সেই দুঃস্বপ্ন। কিন্তু এইসব রোকেয়া আমাকে বলেনি। বিনষ্ট সম্ভাবনা নিয়ে আমৃত্যু শোক করার অধিকার সবার থাকলেও উপায় থাকে না। তারও ছিল না। যেদিন রোকেয়ার সাথে স্টুডিওতে দেখা হলো, সেদিন সে আমাকে সলজ্জমুখে সারাক্ষণ তার রচিত পুতুলগুলি দেখিয়েছিল। পুতুলগুলি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান খদ্দেররা কিনে নিয়েছে। স্ক্রিনপ্রিন্ট করা কাপড়ের তুলোঠাসা পুতুল, তাদের দেখতে বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ট্রেনে চাপা শিশুদের মতন। চোখ বিভোল। অর্ধস্ফুট ঠোঁটের ভঙ্গি। বোতামের মতন ছোট্ট নাক। গালে লাল লাল তিল। পায়ে সেলাই করা চামড়ার টুকটুকে জুতো, জুতোর ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে বোনা-উলের মোজা। গায়ে ছোট ছোট প্রিন্টের ভয়েলের ফুলফুল জামা। মাথায় কুরুশকাটার লেসের টুপি। সবকিছু হাতে গড়া। পুতুল নয় যেন শুধু, যেন স্বপ্ন।