স্বপ্ন বদলে যায়

ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়



মনের আনন্দে উড়ছিল কমলি। সোনালি রোদে গোলাপি রঙের ঝলমলে ডানা দুটো মেলে উড়ছিল। উড়তে উড়তে এক জায়গায় এসে মনে হল, এখানে আগেও এসেছে। কেমন যেন চেনা চেনা সব। গাছে গাছে রঙবেরঙের ফুল আর ফল। খুব রসাল। মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। জায়গায় জায়গায় ঢিবি করা ঘি-ভাত, ওপরে ছড়ানো পেস্তা, বাদাম, কিসমিস আর টুকটুকে চেরি। কেক-বিস্কুট-চকোলেট দিয়ে বানানো যেন পরিদের ঘরবাড়ি সব। ইচ্ছে হলেই খেতে পারে কিন্তু যতবার কাছাকাছি যাচ্ছে, একটা দমকা হাওয়া কোত্থেকে এসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাকে।
সরবতের ঝর্না ঝরছে ঝরঝরিয়ে, পায়েসের পুকুরের পাড়ে মাখা সন্দেশের থকথকে চষা জমি, তার পাশ দিয়ে মিছরি আর বাদাম দিয়ে ডিজাইন করা রাস্তা। রানুদি চলছে সেই রাস্তা দিয়ে। রানুদি হাসছে খুব। হাত নেড়ে ডাকছে তাকে, কি যেন দেখাতে চাইছে হাতের ইশারায়, কিন্তু কমলি কিছুতেই পৌঁছতে পারছে না।
উড়তে উড়তে ডানা দুটো ক্লান্ত। চোখে পড়ল, একটা গাছে দুটো ডালের খাঁজে পাখির বাসা, সেখানে মা পাখি ঠোঁটে করে সাদা সাদা কেঁচোর মত নুডলস তুলে দিচ্ছে হাঁ করা বাচ্চাগুলোর মুখে। বাচ্চাগুলো গপগপ করে গিলে নিচ্ছে, কিন্তু খিদে যেন তাদের মিটছে না কিছুতেই। ফের হাঁ করছে। এই খিদেটা চেনে কমলি। এই হাঁ করাটা। সব সময়েই যেন আকাশ খাই পাতাল খাই খিদে...

পিঠে দুটো কিল পড়তেই এমন স্বপ্নটা চুরচুর হয়ে গেল। সঙ্গে তারস্বরে চিৎকার আর গালাগাল মায়ের,
- হারামজাদী, পোড়ারমুখী, শতেকখোয়ারি, এত নোলা কিসের তোর! এ ক’টা ভাত এখন আমি কার পাতে দেব? আজকের মত খাওয়া বন্ধ তোর, বেরো! বেরিয়ে যা বাড়ি থেকে!
হুড়মুড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে এল কমলি। মনে পড়ল, কাল মাঝরাতে ঘুম ভেঙে খুব খিদে পেয়েছিল তার। নাকি খিদের চোটেই ঘুম ভেঙেছিল কে জানে! পান্তার হাঁড়ি থেকে দু’ খাবলা তুলে আলোনাই চিবিয়েছিল। তারপর জল খেয়ে শুয়ে পড়েছিল আবার। সকালে উঠে মা টের পেয়ে যাবে, মার খেতে হবে জেনেও সামলাতে পারেনি!
কমলির এমনই হয়। খিদে মেটে না কিছুতেই। কুয়োতলায় চোখেমুখে জল দিয়ে এসে রোয়াকে বসে থাকে পা ঝুলিয়ে। মা এখন পা ছড়িয়ে খুনখুন করে কাঁদতে বসেছে ঘরে। ছোটো ভাই দুটো ঘুমোচ্ছে অঘোরে। বেশিক্ষণ বসে কাঁদবার সময় নেই মায়ের। ছটা পাঁচের শিয়ালদা লোকাল ধরতে হবে না? কাপড় ছেড়ে বেরোনোর আগে মা কমলিকে ডাকে। আলুমিনিয়ামের সানকিতে পান্তা আর কলাইয়ের বাটিতে কাল রাত্তিরের কুচো চিংড়ির ঝাল চচ্চড়ি। দেখেই জিভে জল আসে কমলির। মা কাপড় ছাড়তে ছাড়তে বলে,
- খবরদার হাঁড়ির পান্তায় হাত দিবি না। ভাইরা উঠলে বেড়ে দিস। মুড়ি আছে চাড্ডি, ভাত মুড়ি মিশিয়ে হয়ে যাবে এখন।
- তুমি খেলে না?
- তোরা খাস। আমি তো কাজের বাড়ি গিয়ে চা জলখাবার পাবো। ...
তাড়াতাড়ি খানিকটা পান্তা একটু ঝাল চচ্চড়ি দিয়ে মেখে মায়ের মুখে গুঁজে দেয় কমলি। মা প্রথমটা আপত্তি করে কিন্তু খেয়েও নেয়। কমলি শুকনো মুখে বলে,
- ইস্কুলে গেলে হত। ডিম দেয় ভাতের সঙ্গে।
- ও বাড়ির কাজটা সকাল সকাল সেরে নিয়ে যাস।
- বড় ঠাকুমা পায়ে তেল মালিশ করায়, গা ঘসে দিতে বলে, দেরী হয়ে যায়।
- দিস কেন? দিবি না। ওটা তোর কাজ নয়।
কমলি চুপ করে যায়। বুড়ি তো এমনি এমনি পা টেপায় না, দুটো বাসি রুটিও দেয়, সঙ্গে একটু আলুর ছেচকি, কোনদিন একটা নারকোল নাড়ু। ইস্কুলের মিড ডে মিল তো সেই বেলা দেড়টায়। অতক্ষণ এই পান্তাটুকু খেয়ে থাকতে পারে কমলি? তাছাড়া ইস্কুলে গেলে শুধু খাওয়া নয়, পড়ালেখাও করতে হয়। সেসব ভালো লাগে না কমলির। চার ক্লাস পর্যন্ত পড়ে ইতি টেনেছে লেখাপড়ায়।
বারো বছরের কমলি ঘরের কাজ সারে। ভাইদের পান্তা বেড়ে দিয়ে কাজের বাড়ি যায়। বাসন মাজতে মাজতে কড়াই এর কোণে লেগে থাকা ঝোলটুকুর গন্ধ নাকে এসে লাগে। সকালবেলা এ বাড়ির বাচ্ছাদুটো ফেলে ছড়িয়ে জলখাবার খেয়ে ইস্কুলে যায়। মেলামাইনের রঙিন বোলে কখনও নুডলস, কখনও কর্নফ্লেক্স পড়ে থাকে। আশেপাশে কেউ আছে কিনা দেখে নিয়ে সটান মুখে চালান করে দেয় কমলি, জিভে রেখে খানিকক্ষণ স্বাদ নেয়। লালায় ভরে ওঠে মুখ। তারপর গপ করে গিলে নেয়।
রানুদি কলেজ বেরোনোর সময় দেখে ফেলেছিল একদিন।
- ইশ! কখন থেকে পড়ে আছে ওগুলো, কত মাছি বসেছে!
তারপর নিচু গলায় রান্নাঘরে মা কে বলেছিল,
- ওকে এক দিন ম্যাগি করে দেবে মা? ওর ইচ্ছে করে বোধহয়! বাসনগুলো ধোয় তো!
উত্তরে কি বলেছিল জেঠিমা শুনতে পায় নি কমলি। তবে ওর লজ্জা করেছিল খুব। রানুদি খুব ভালো। কতগুলো ছোট হয়ে যাওয়া লিপস্টিক, প্রায় শুকিয়ে আসা নেল পালিশের শিশি, পুরনো কানের দুল দিয়ে দিয়েছিল ওকে। সেগুলো বার করে মাঝে মাঝে সাজে কমলি।
এমন নয় যে ম্যাগি খায় নি কখনও কমলি। ভাইয়েরা বায়না করায় তার মা একবার কিনে এনে খাইয়েছে তাদের তিন ভাই বোন কে। রাঁধতে রাঁধতে বলেছে, - বাব্বা যা দাম! এত দাম দিয়ে এই সাদাসাদা কেঁচোগুলো খাওয়ার মানে হয়। সাতদিনের জলখাবার হয়ে যেত ওতে।
জলখাবার আর কি। হয় মুড়ি বাতাসা, না হয় পান্তা। মায়ের কাজের বাড়িতে জলখাবার খায় মা। সারাদিনে পাঁচবাড়ি কাজ। কোথাও কখনও ভালমন্দ কিছু পেলে নিয়ে আসে।
ঘরমোছা কাপড়কাচা শেষ করে এক কাপ চিনিগোলা চা আর দুটো বিস্কুট পায় কমলি। তারপর বড় ঠাকুমার দরজায় এসে দাঁড়ায়। কবে যে কি বলবে বুড়ি ঠিক নেই। কোনোদিন হয়ত গা টেপাল, কোনোদিন পায়ে তেল মালিশ করে দিতে বলল, কোনোদিন মাথা টিপে দিতে বলল। যে কোনও কাজ পেলেই খুশি কমলি। একেকদিন কপাল খারাপ থাকে। সেদিন বুড়ি ঘুমোয়। দরজার সামনে একটু দাঁড়িয়ে থেকে চলে আসে কমলি। সেদিন আর বাড়তি খাবারটুকু খাওয়া হয় না।
বাড়ি ফিরে চান করে উনুন ধরায়। ভাত রাঁধে। এক হাঁড়ি ভাত। এই ভাতেই জল ঢেলে রেখে চলবে কাল সকাল পর্যন্ত। পটল, কুমড়ো, আলু যা থাকে ফেলে দেয় হাঁড়িতে। ফেনাভাত নুন দিয়ে খেতে যা স্বাদ! ভাইয়েদের দুপুরের খাওয়া ইস্কুলে। মা আসতে আসতে সেই সন্ধ্যে। কোনদিন চাড্ডি কুঁচো মাছ, দু’একটা সবজি, অল্প মুসুর ডাল কিম্বা খান দু-তিন ডিম হাত করে নিয়ে আসে মা। রাত্তিরে ফের উনুন জ্বলে, চা হয়, যা হোক একটা কিছু রান্না হয় ভাতের পাতে খাওয়ার জন্য।
ফেনা ভাত সেদ্ধ সবজি দিয়ে খেতে খেতে কমলি তার স্বপ্নটার কথা ভাবে। এমন স্বপ্ন মাঝে মাঝেই দেখে কমলি। রাশিরাশি খাবার যেন তার জন্যেই সাজিয়ে রাখা অথচ কিছুতেই কাছে যেতে পারে না। ঘুম ভেঙে মনটা খারাপ হয়ে যায়। অন্তত স্বপ্নের মধ্যেও যদি খাবার গুলো চেখে দেখা যেত!
বাবাকে একটু একটু মনে পড়ে কমলির। রাজমিস্ত্রির কাজ করত। ছোটো ভাইটা হবার পর পরই বাইরে কাজ করতে গিয়ে আর ফেরেনি। সেখানেই নাকি আর একটা সংসার তার। বাবা থাকলে কি সে ওই স্বপ্নে দেখা খাবার গুলো খেতে পেত? কে জানে?
কমলির খুব ইচ্ছে, একটা খুব বড় বাড়িতে কাজ করবে সে। টিভিতে যেমন দেখায়। সে বাড়ির মানুষজন সারাক্ষণ সেজেগুজে ঘুরবে আর মতলব ভাঁজবে নানারকম। সেখানে সারাদিন ভালমন্দ রান্না হবে, রান্নার গন্ধে ম ম করবে বাড়ি! কমলি সেখানে মশলা বাটবে, কুটনো কুটবে, খুন্তি নাড়বে। আর সারাদিন ধরে ভালমন্দ খাবে। এমন বাড়ি কোথায় আছে গো! সে বাড়ির কাজের লোকেরা না জানি কত পুণ্যই না করেছে আগের জন্মে!

(২)

খুব বড় একটা সাদা রঙের দোতলা বাড়ি। আলো ঝলমলে। সানাই বাজছে। সুন্দর চেহারার মানুষজন হাসি মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লাল কার্পেটে মোড়া বড় হলঘরটা ফুল দিয়ে সাজানো। সিংহাসনে বসে আছে লাল বেনারসি আর গয়নায় মোড়া কনে। ঠিক যেন রানুদি। কিন্তু রানুদি নয়। ও আসলে কমলা। কমলার বিয়ে হচ্ছে আজ। কে যেন এসে বলল,
- তুই আজ ঝুটো গয়না পরেছিস কেন? আজ তো সোনার গয়না পরতে হয়!
কমলা দেখল, রানুদির দেওয়া যত চুড়ি, হার, দুল পড়ে সেজেছিল সে, সব টান মেরে খুলে দিচ্ছে কেউ। ওই তো রানুদি এককোণে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে! হাতে একটা লাল ভেলভেটের বাক্স। কাছে এসে বলল,
- চল, সেজে নে তাড়াতাড়ি। বর এসে গেছে তো!
কমলা দেখল, বাক্স ভর্তি গয়না, সোনার গয়না। বর এসে গেছে বুঝি? কই দেখি? ওমা এ তো ইন্দ্রদা! রানুদির সঙ্গে যার বিয়ে হবার কথা ছিল! একে কি করে বিয়ে করবে কমলি? রানুদি হেসে বলল,
- যা, তোকে দিয়ে দিলাম।
- না না, তা কি করে হবে?
রানুদি এবার রেগে গেল।
- তাহলে সেদিন ছাদে উঠেছিলি কেন? বল!
- আমি তো ইন্দ্রদাকে চা দিতে গিয়েছিলাম। ইন্দ্রদাই তো আমাকে -
রানুদি হঠাৎ সপাটে এক চড় কশাল। বলল,
- এ বর চলবে না। অন্য বর আনো।
তারপর কেমন সব অন্ধকার হয়ে গেল। সানাই থেমে গেল। লোকজন কেমন ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল। বাইরে থেকে একটা অটোর হর্ন শোনা গেল,
- বর লাগবে বর? ন’টাকা ভাড়া কিন্তু। খুচরো দেবেন।
কই, কেমন বর দেখি! ওমা, এ যে রাজপুত্তুর। কেমন লম্বা ফরসা, কিন্তু মুখ দেখা যাচ্ছে না কেন? বর পিছন ফিরে আছে।
- ও বর, এদিকে ফেরো তো দেখি।
বর কথা শোনে না কিছুতেই। কমলা উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করে, কিন্তু জায়গাটা বড় অন্ধকার। মুখ দেখা যায় না কিছুতেই......
ঘুম ভেঙে কমলা দেখল ছেলে দুটো কুঁকড়ে শুয়ে রয়েছে। ভোর হয়ে এল নাকি? বাইরে তো অন্ধকার। হেমন্তের ভোরে তাদের এই খালপাড়ের বস্তিতে একটা হিম হিম হাওয়া আলতো মায়ার পরশ বুলিয়ে যায়। খোলা জানলা দিয়ে হালকা ঠাণ্ডা ঢোকে। ছেলেদের গায়ে একটা পাতলা চাদর দিয়ে ঢেকে দিল কমলা।
পাশের ঘরে গিয়ে দেখল ঘরটায় কেমন গা গোলানো টকটক গন্ধ। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তপন। এ ঘুম ভাঙবে না সকাল আটটার আগে। ঘরে নীল নাইট ল্যাম্পের আলো। ঘাড়টা একদিকে কেতরে রয়েছে। মুখ থেকে লালা ঝরছে, ভিজিয়ে দিয়েছে বালিসের কোণ। ঘরের এক কোনে ডাঁই করে রাখা বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, তপনের গেঞ্জি। বমি করে ভাসিয়েছিল। সব বদলানো হয়েছে একপ্রস্থ। গালটা হঠাৎ জ্বালা করে উঠল যেন কমলার, পিঠে শিরদাঁড়ার পাশে ব্যাথাব্যাথা। কালশিটে পড়ল কিনা কে জানে। পিঠের দাগগুলো কাপড়ের নীচে ঢাকা থাকে কিন্তু গালে, হাতে দাগ পড়লেই মুশকিল। লোককে জবাবদিহি করতে করতে জেরবার। যদিও আশপাশের লোকের জানতে বাকি নেই কিছু, তবু, কেউ সরাসরি প্রশ্ন করলে বড় খারাপ লাগে কমলার।
স্বপ্নে দেখা রানুদির হাতের চড়টার কথা মনে পড়ে গেল। রানুদি কিন্তু কোনদিন চড় মারেনি তাকে। কতকাল হয়ে গেল দেখে না রানুদিকে। আজ তো আবার ইন্দ্রদাকেও দেখল স্বপ্নে। ছাদের ঘরে তাকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিল ইন্দ্রদা, খামচে ধরেছিল বুক। কমলা চা দিতে গিয়েছিল ইন্দ্রদাকে। তখন রানুদির সঙ্গে ইন্দ্রদার বিয়ের সব ঠিক।
কাঁপতে কাঁপতে ছাদ থেকে নেমে এসেছিল কমলা। কথাটা কাউকে বলবে না ভাবলেও রানুদিকে না বলে পারে নি। আজ বাদে কাল বিয়ে তার ইন্দ্রদার সঙ্গে! রানুদি! তার এত ভালবাসার রানুদি! রানুদি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল,
- তুই ঠিক বলছিস? সত্যি বলছিস?
কমলা তখন কেঁদেই চলেছে মাথা নিচু করে। কতক্ষণ কে জানে! একসময় রানুদি তার পিঠে হাত রেখে বলেছিল,
- কাঁদিস না। সাবধানে থাকিস। নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে হয়। কাউকে বিশ্বাস করবি না, কাউকে না!
কমলা দেখেছিল রানুদির চোখ লাল, যেন কান্নায় ফেটে পড়বে এখনই। রানুদি খুব শক্ত মেয়ে। কারও সামনে কাঁদেনি কখনও। বিয়েটা আর হয়নি। অনেক পরে বিয়ে হয়েছিল রানুদির। খুব ধুমধাম করে। রাজপুত্তুরের মত বর। খুব বড় ইঞ্জিনিয়ার নাকি। তাকে বিয়ে করে ব্যাঙ্গালোর চলে গিয়েছিল রানুদি। আর দেখা হয় নি।
তার পরের বছরই বিয়ে হয়েছিল কমলার। রানুদি একটা লাল বেনারসি পাঠিয়েছিল তার জন্য। তাই পরেই বিয়ে হয়েছিল। ভাড়ার অটো চালায় তপন। রোজগার মন্দ নয়, তবে মদের নেশায় ডুবে যাচ্ছে সব সাধ স্বপ্ন।
আজ এত বছর হয়ে গেল, এই স্বপ্নটা মাঝেমাঝেই দেখে কমলা। বিয়ে হচ্ছে তার। খুব ধুমধাম করে। সানাই, আলোর রোশনাই। কিন্তু মাঝে মাঝে আচমকা অন্ধকার হয়ে যায় সব। বর এসেছে। লম্বা ফরসা বর। কিন্তু তার মুখ দেখা যায় না। আধো-অন্ধকারে কেমন ঝাপসা হয়ে থাকে।

(৩)

ঘিয়ে রঙের র‍্যাপারটা গায়ে দিয়ে গঙ্গার ঘাটে বসে থাকে কমলাসুন্দরী। নতুন র‍্যাপার, গায়ে লাল-নীল ফুলছাপ-। সিল্কের মত নরম মোলায়েম। গায়ে দিয়ে যেমন আরাম, হাত বুলিয়ে তেমনি সুখ। হাতে পেতলের ঘটি। লাল গামছাটি ভাঁজ করে ঘটির মুখে গোঁজা। একেবারে গঙ্গাচান সেরে একটু গঙ্গাজল নিয়ে ফিরবে। গামছাটিও বেড়ে! বাঁকুড়ার গামছা। নেয়ে উঠে এই গামছায় গা মুছবে কমলাসুন্দরী। একঢাল চুল পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মুছবে। তারপর এই গামছাটি ভেজা কাপড়ের ওপর জড়িয়ে বাড়ি ফিরবে।
ঘাটে নামতে গিয়ে দেখে পাঁক গোলা কাদা জল! এখানে চান করবে কি করে। বড় ঠাকুমা এসে বলে,
- ওই তো ওইদিকে চানের ঘাট। বড় শীত করছে কমলি, তোর র‍্যাপারটা একটু দিবি?
ঘাট কোথায়? গঙ্গাই বা কই? এ তো তাদের বস্তির পাশের সেই খাল? তার গামছা কোথায় গেল? র‍্যাপার? কে নিল? বড় ঠাকুমা নাকি? গঙ্গাটাকেই বা চুরি করল কে? খুঁজতে থাকে, খুঁজতে থাকে কমলাসুন্দরী। খুঁজতে খুঁজতে সেই ছোকরা ডাক্তারবাবুটির সঙ্গে দেখা। সে গম্ভীর মুখে বলল,
- রোজ গঙ্গাচান কর তাহলেই ঠিক হয়ে যাবে।
বড় ঠাকুমা এসে বলল,
- আমি তো রোজ করি। এই দ্যাখ।
বড় ঠাকুমার গায়ে তার সেই নতুন র‍্যাপার, মাথায় লাল গামছাখানি চেলির মত জড়িয়ে ঘোমটা টানা। চোখ পাকিয়ে বড় ঠাকুমা বলল,
- বলেছি না, বেধবা মানুষকে লাল গামছা ধরতে নেই! ওই তো ওইদিকে গঙ্গা!
বড় ঠাকুমা ছুটল। গায়ে তার নতুন র‍্যাপার, মাথায় লাল গামছা......
ঘুম ভেঙে কমলাসুন্দরী দেখল, রাত ভোর হতে আর বেশী বাকি নেই। আকাশটা যেন ফরসা হয়ে আসছে। কাল সারারাত কেশে কেশে ঘুমোতে পারেনি। ভোর রাতে এই স্বপ্ন। এমন স্বপ্ন মাঝে মাঝে দেখে বটে! ওই নতুন র‍্যাপার আর লাল গামছার স্বপ্ন! কিন্তু আজকের স্বপ্ন এত জীবন্ত ! কতদিন পরে বড় ঠাকুমাকে স্বপ্নে দেখল। ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। তবে কি এতদিনে তার নতুন র‍্যাপার আর লাল গামছার সাধ মিটবে?
পাটকিলে রঙের র‍্যাপারটা গায়ে জড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। বহু ব্যবহারে পাতলা হয়ে এসেছে। জায়গায় জায়গায় ফেঁসে গেছে। কতদিন ধরে বড়খোকাকে বলছে, একটা নতুন র‍্যাপার এনে দেওয়ার কথা। প্রত্যেক বছরই সে বলে, দেখছি! তারপর শীত চলে গেলে বলে,
- এবার আর হল না মা, পরের বার দেখা যাবে।
কিছু বলতে পারে না কমলাসুন্দরী। নিজের জন্য কিছু চাইতে বড় লজ্জা করে। তাছাড়া ভাবে, ওদেরও তো বউ-ছেলে, সাধ-আহ্লাদ আছে। তা, একখানা র‍্যাপারের আর কতই বা দাম। কত কষ্টে মানুষ করেছে ছেলেদের, সেসব মনে পড়ে।
অসময়ে স্বামী মারা যাওয়ায় দুটো নাবালক ছেলে নিয়ে বিপদে পড়েছিল ঠিকই, তবে রোজ রোজ মদ্যপ স্বামীর মারের হাত থেকে রেহাইও পেয়েছিল। সে আজ কত দিনের কথা। এখন তো ভাঙা কুলোর মত সংসারের একপাশে পড়ে থাকে। ছাই ফেলার কাজটুকুও হয়না তাকে দিয়ে। কেউ ডাকেও না তাকে কোনও কাজে। সেও ডেকে ডেকে সাড়া পায় না কারও।
আজ মাসখানেক ধরে ঘুসঘুসে জ্বর। বুকে ব্যাথা, শ্বাসকষ্ট। ওপাড়ার ঘোষালদের ছোটো ছেলেটা ডাক্তার হয়েছে। তাকে একদিন ডেকেছিল বড়খোকা। কি মিষ্টি কথা সে ছোকরার!
- কোথায় কষ্ট তোমার? কি কষ্ট ঠাকুমা!
আহা এমন করে তো কেউ জিগোয় না গো আর! বেঁচে থাক বাছা। রাজা হও। মনে মনে তাকে অনেক আশীর্বাদ করেছিল কমলাসুন্দরী। তার ওষুধে কাজ হল না কিছু, মাঝখান থেকে গঙ্গাচানটা বন্ধ হয়ে গেল। বাগবাজারের ঘাট বেশি দূরে নয়। বড়খোকা যখন এখানে বাসা ভাড়া নিল, খুশি হয়েছিল কমলাসুন্দরী। মা গঙ্গার বুকে রোজ পুণ্যস্নান, সে কি সোজা কথা!
একটা লাল গামছার বড় শখ কমলাসুন্দরীর। তা, এই বয়সে আর সাধ-আহ্লাদ! কতবার বলেছে, ছেলেদের, বৌমাদের, একখানা নতুন লাল গামছা যদি এনে দেয়। বললেই বলে, হবে, হবে! আর হয়েছে। তার গামছা ব্যাবহারের অযোগ্য হলে ছেলেদের কারও পুরনো গামছা বরাদ্দ হয় তার জন্য। বিধবা মানুষকে কি লাল গামছা নিতে আছে? সেও এক কথা বটে। তবে গামছায় দোষ নেই বোধহয়।
ঘুম ভেঙে থেকে শরীরে প্রবল অস্বস্তি। বুকটা যেন চেপে ধরেছে কেউ। গলায় ঘরঘর শব্দ। ছেলেদের, বউমাদের ডাকবে যে সে ক্ষমতা নেই। বুকের কষ্টটা বাড়ছে ক্রমশ। পৃথিবীটা যেন বাতাস শূন্য হয়ে আসছে!
- অ খোকা! অ বৌমা!
ডাকতে গেল কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরল না। চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে আসছে ক্রমশ!
ডাক্তার যখন এল, বিশেষ জ্ঞান নেই কমলাসুন্দরীর। নিউমোনিয়া সন্দেহ করে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে পাঠাতে বলল ডাক্তার। এ রুগিকে এতদিন প্রায় বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা হয়েছে বলে বাড়ির লোকেদের একটু বকাবকিও করল। হাসপাতালের ফিমেল ওয়ার্ডে তখন একটাও বেড খালি নেই। অগত্যা মেঝেতেই ঠাঁই হল। চিকিৎসা কেমন চলল তা বোঝার উপায় নেই, কারণ, কমলাসুন্দরী সজ্ঞানে ছিল না, আর ছেলেরাও খুব একটা খোঁজ খবর করেনি।
সেদিন ভোরে যখন খুব বাড়াবাড়ি, ডাক্তার নার্স কেউ আর কোনও আশা দেখছে না, বাড়ির লোককে খবর দেওয়া হয়েছে, শেষ মুহূর্তে একটুক্ষণের জন্য চোখ খুলেছিল কমলাসুন্দরী। একটি দয়াবতী নার্স, অনেকটা যেন সেই রানুদির মত দেখতে, ঝুঁকে পড়ে জিগ্যেস করল,
- কষ্ট হচ্ছে? কিছু বলবেন?
ঠোঁট দুটো নড়ে উঠেছিল কমলাসুন্দরীর। নার্স স্পষ্ট শুনল, সে বলছে,
- একটা লাল গামছা যদি...
চোখ দুটো বুজে এল তারপর। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে নামল একফোঁটা জল। নার্স মেয়েটি ভাবল, ভুল শুনল নাকি? তার পর ভাবল, বুড়ির মাথার ঠিক নেই বোধহয়। ভুল বকছে। সন্দেহ নিরসন করতে আর একবার ঝাঁকিয়ে ডাকল,
- কি বললে? ও ঠাকুমা? কিছু বললে? কি চাই তোমার?
কমলাসুন্দরী অনেক কষ্টে আর একবার ঝাপসা চোখদুটো খোলার চেষ্টা করল, তারপর প্রানান্তকর কষ্টে ঠোঁট দুটো নাড়তে পারল,
- আর একটা... একটা নতুন র‍্যাপার...
সেই ছিল কমলাসুন্দরীর শেষ কথা, ইহলোকের সর্বশেষ চাহিদার প্রকাশ। শোনা যায়, মায়ের শেষ ইচ্ছের মর্যাদা দিতে তার ছেলেরা শ্রাদ্ধে পুরোহিতকে একটা নতুন র‍্যাপার আর লাল গামছা দান করেছিল।