লাজমিনা

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ




করিডোরে কেউ নেই। অন্ধকারের প্রত্যক্ষ মালিকানায় একপাশে মানসিক রোগ বিভাগ, অন্যপাশে চর্ম ও যৌন বিভাগ করতলগত। দুটো ওয়ার্ড একেবারে মুখোমুখি। সরু চিকন গলি। এখন দেখা যাচ্ছে কলাপসিবল গেটে হেলান দিয়ে আনসার সদস্য ঝিমোচ্ছে। দিনের বেলায় তাদের একটু ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যায়। গলায় ঝুলে থাকা অলংকারের মতো বাঁশি সময়ে অসময়ে বেজে ওঠে। কখনো দর্শনার্থী ঠেকাতে। কখনো জ্যাম ছোটাতে। আক্ষরিক অর্থেই এখানে একটি ট্রলি পার হতে গেলে জ্যাম লেগে যায়। মানুষ হেঁটে যাবার জায়গাও থাকে না। অলস খাকি পোশাকের কর্মীরা তখন একটু ব্যস্ত হয়। বাঁশির ক্ষীণ শব্দ সে জট ছোটাতে পারে না। একসময় তাদের উঠে দাঁড়িয়ে একটু গলার স্বর উঁচু করতে হয়। এ কথাও সত্যি যে, এই দুই বিভাগের রোগীদের দেখতে তেমন কেউ আসে না। মানসিক ও যৌন রোগ দুটো যে চরম লজ্জার ব্যাপার, হাসপাতালের অন্য ওয়ার্ডের ভিড়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এর সত্যতা মেলে। তবে, আমি যে গল্পটা বলতে যাচ্ছি, তার জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে না। হ্যাঁ, এই করিডোরের একটা ভূমিকা আছে। কারণ, এর মাধ্যমেই আমি গল্পের ভেতরে প্রবেশ করব এবং সঙ্গে নিব আপনাদের। গল্পটা পাঠ করার প্রয়োজন আছে কিনা, এমন প্রশ্ন আসতেও পারে। তবে, আপনারাই বলুন পৃথিবীর সব কাজ কী প্রয়োজনের ভেতর সীমাবদ্ধ। তা তো নিশ্চয় নয়। সুতরাং, প্রবেশক অংশ পেরিয়ে আমরা এবার মূল গল্পে ঢুকতে পারি।

দুই

আমার ছোটবেলার বন্ধু লাজমিনার স্বামী একটু আগে ফোন দিয়েছে। সারাদিন কাজ শেষে ভীষণ ক্লান্ত। শুয়েছি কেবল, তখন তার ফোন। জানালো, লাজমিনার লেবার পেইন উঠেছে, আমি যেন একটু দেখে আসি। গন্তব্য গাইনী ওয়ার্ড। অন্যকেউ হলে একটা অজুহাত বানিয়ে ফেলা যেত। লাজমিনা বলেই এড়িয়ে যেতে পারি না। দুই ওয়ার্ডের মাঝে এসে গতি কমে আসে। টের পাই পা ছুঁয়ে কিছু একটা ছুটে যায়। ঠিক তখন বাঁশির আওয়াজ শুনতে পাই। যথারীতি খুব নিচু ভলিউম। হয়তো কান শুনে অভ্যস্ত তাই বুঝতে পারি আর সেদিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে ঠিক কী ছুটে যায় ঠাওর করতে পারি না।
বাঁশির শব্দ আসছে বামদিক থেকে। সেখানে করিডোরের গ্রিল। গ্রিলের ওপাশে জংলামতো জায়গা, তার পেছনে দানবের মতো পাহাড়। গা শিওরে ওঠে। দেও-দানবের ভয় নেই, তারপরেও জায়গাটা পার হতে চাই দ্রুত। সামান্য দূরেই ন্যায্যমূলের ফার্মেসির আলো দেখা যাচ্ছে। লাইট থেকে ছিটকে আসা আলোকণাকেই উলটো বেমানান লাগছে।
তাড়াতাড়ি পার হতে গিয়ে আবার শব্দ শুনতে পাই। এবার আগের চাইতে কিছুটা জোরে। ভূতের মতো করিডোরের ওপাশ থেকে মাথা তোলে একজন। তা দেখে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে আমার। ভিক্ষুক শ্রেণীর একজন মানুষ মনে হচ্ছে। বেচারার হাঁপানির টান উঠেছে। এদিকে লাজমিনার স্বামী ফোন দিয়েছে প্রায় ঘন্টাখানেক। তারপরেও মনে হচ্ছে, লোকটাকে সাহায্য করা দরকার। সেজন্য একটু পেছনে যেতে হবে। তারপর হাতের ডানে রাস্তা। সেখান থেকে সোজা হেঁটে যেতে হবে মিনিটখানেক। চিন্তায় সময়ক্ষেপণ না করে,রাস্তাটুকুন পার হয়ে লোকটিকে নিয়ে ইমার্জেন্সিতে যাই। এখানে আলোর অভাব নেই। আমার কাধে ভর দিয়ে লোকটি দিব্যি হেঁটে আসছে। বাঁশির সুরে কেঁপে উঠছে কর্ণকুহর। সুরের সূচনা লোকটির ফুসফুসে। এত তীব্র সুর যার ফুসফুসে না জানি তার কত বেদনা। স্বভাবতই, এখন লোকটির বেদনা যাচাই করার কোনো ইচ্ছা বা সুযোগ আমার নাই। ইমার্জেন্সি রুমে তাকে নেবুলাইজ দেয়ার ব্যবস্থা করি। আবার ফোন বেজে ওঠে। লাজমিনার স্বামী।
: কী হলো, ভাই? দেরি হবে আরও?
: এসে গেছি, প্রায়।
: আপনি আসেন। লেবার রুমের ভেতরে তো আমাকে ঢুকতে দিচ্ছে না। এদিকে আমি বাইরে থেকে আপনার ভাবীর কান্না শুনতে পাচ্ছি।
: দশ মিনিট লাগবে সর্বোচ্চ।
:আচ্ছা।
ফোন রেখে দিলেও লাজমিনার স্বামীর অসন্তোষ টের পাই। সে কী টের পায়, আমার ক্ষোভ? আমার বান্ধবী কেন আমার ভাবি হতে যাবে? হে মূর্খ মানব, বান্ধবী কিংবা প্রেমিকারা ভাবি হয় না কখনো। ভদ্রতার খাতিরে কথাটা আমি বলিনি ঠিকই কিন্তু নেবুলাইজ নিতে থাকা লোকটি হয়তো টের পেয়ে যায়।
:ব্যাপার না। এসব হয় জীবনে।
লোকটিকে দেখার অবসর হয়। বিশেষত্ব কিছুই নেই। কিন্তু তার শ্বাসটান কমে।
: বাবা, তোমার একটি ইচ্ছা আমি পূরণ করব। যা চাবে, তাই পাবে।
কথাটি শেষ না হতেই আবার পায়ের নিচ দিয়ে কিছু একটা হেঁটে গেলে এবার আর আমার দৃষ্টি এড়াতে পারে না। কালো ডোরাকাটা বিড়াল। বিড়ালটি যেন আমাকে মুচকি হাসে। নিশ্চয় ভাবছে, সাহায্য করতে এসে কোন পাগলের খপ্পরে পড়েছে ছেলেটা?
: আপনি আলাদীনের দৈত্য?
: তা, কেন হবে ? আলাদীনের দৈত্য তিনটি পূরণ করে। একটির বেশি করার ক্ষমতা আমার নাই। তাছাড়া আমি দৈত্যও নই।
: ইচ্ছে পূরণ তবে আজকাল সাধারণ মানুষেরাও করছে?
: ইচ্ছে পূরণ তো সাধারণ মানুষেরাই করে। অসাধারণ মানুষের নিজের ইচ্ছে পূরণ হয়।
ঘড়ি দেখি। ইতিমধ্যে আরও পাঁচ মিনিট পার হয়ে গেছে। লোকটিকে সাহায্য করতে না এসে বরং লাজমিনার কাছে যাওয়াটাই শ্রেয়তর ছিল। আমি তাকে পাত্তা দিই না আর। ইমার্জেন্সির ভেতরের রাস্তা দিয়ে আবার পূর্বের পথ ধরে ফিরি। ক্যাজুয়াল্টি ওয়ার্ডেরর আলোয় দেখি, লোকটি আমার পিছু নিয়েছে। প্রথমে খেয়াল করিনি। দেখি তার ব্যাগের পেছনে খয়েরি রংয়ের ঝোলা। ঝোলায় তার হাত ঢোকানো। ছিনতাইকারী? শেষমেষ একজন ছিনতাইকারীকে সাহায্য করলাম? দেখতে দেখতে আবার সেই অন্ধকার করিডোরে এসে দাঁড়িয়েছি।
: আপনি আমার পিছু নিয়েছেন কেন?
: আপনি ভালো মানুষ, একটা ইচ্ছা পূরণ করতে চাই।
: এ তো দেখি, ভালো বিপদ হলো। আপনাকে কষ্টে দেখে উলটো আমি সাহায্য করতে গিয়েছিলাম।
লোকটি জিভে কামড় কাটে। একটু আগে যেমন শতচ্ছিন্ন মনে হচ্ছিল এখন আর তাকে তেমন লাগছে না। মধ্যবয়স্ক দরবেশের অবয়ব যেন। করিডোরে দাড়িয়েই তাকে বলি, আপনি তাহলে পিছু ছাড়বেন না?
ছায়া অন্ধকারেও লোকটির মুখে হৃদয়ভঙ্গের ছায়া দেখা যায়। তিনি মৃদু স্বরে বলেন, আমি পিছু নিই না বরং মানুষ আমার পিছু ছাড়ে না।
: আমি তাহলে মানুষ নই।
: আপনি লাজমিনাকে ভালোবাসেন?
এবার আমি চমকে উঠি। লাজমিনার নাম ওনার জানার কথা নয়। হ্যাঁ, তার সামনে একবার ফোনে কথা বলেছিলাম বটে, তবে অমন অবস্থায় লোকটির নিশ্চয় তা শুনে ফেলেনি। এই যে, বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলাম অথবা বলা যায়, বান্ধবীর বিপদে সহায়তা দিতে যাচ্ছিলাম, এরপরের যে ঘটনাপ্রবাহ তা যে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অবিশ্বাস্য সে ব্যাপারে আমার আর সন্দেহ থাকে না। যদি, এটাকে গল্প হিসেবেই দেখতে চাই লোকটির আগমন, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, আমার সঙ্গে কথোপকথন বড় একটি সূত্রহীনতা কাজ করছে। সূত্রহীনতাকে আরেকটু প্রলম্বিত করে বলি, হয়তো ভালোবাসি।
অন্ধকার পার হয়ে লিফটের দিকে আগাতে থাকি। হাসপাতালের ভেজা ফ্লোরে মুচমুচে অবিশ্বাস ঘোল খেতে থাকে। কে জানে, কতশত চোখের অশ্রু পার হয়ে, আমাদের অতিক্রম করতে হয় অল্প অথচ দীর্ঘ মনে থাকা রাস্তাটিকে। মানুষের শোরগোল এখানে বেশ জমাট।
: ঠিক আছে, আপনার কাছে আমি লাজমিনাকে চাইলাম।
লোকটির মুখে হাসি দেখতে পাই। আচমকা ভিড়ের ভেতরে হাসিটিকে মিলিয়েও যেতে দেখি। হাসপাতাল এমনই। কোথাও এক্সিডেন্ট হয়েছে। মানুষ ঢুকছে প্রচুর। ইচ্ছে ছিল, ছয় তলা পর্যন্ত গিয়ে লোকটির জোচ্চুরি হাতে নাতে ধরিয়ে দেয়ার। নিমিষের ভেতরে লোকটিকে হারিয়ে ফেলায় ইচ্ছা পূরণ হয় না। লিফটের ভেতরে সাধারণের ভিড়ে তাদের মতো একজন হয়ে যাই। এমনও হতে পারে, তিনিও আমাকে খুঁজছেন, কিন্তু সব এক চেহারার মানুষের ভেতরে আর আলাদা করতে পারছেন না।
গাইনী ওয়ার্ড ছয়তলায়। ছয়তলায় নেমে দাঁড়ানোর আগেই মানুষের হুটোপুটির শব্দ শুনতে পাই। লিফটের ভেতর জমাট বেঁধে ছিল, দরজা খোলামাত্র যে যার গন্তব্যে দৌড় দিল। ভিড় পাতলা হয়ে এলে, আবার লোকটিকে খুঁজত চেষ্টা করি। বৃথা খোঁজাখুজি শেষে লেবার ওটির দিকে যাই। আনসার সদস্য আমাকে দেখামাত্র বিশাল এক স্যালুট দিয়ে জায়গা করে দেয়।
লাজমিনার স্বামীর মোবাইল বন্ধ দেখে বিচলিত হই না। নেটওয়ার্ক যখন-তখন ওঠানামা করে পথভ্রষ্ঠ প্রেমিকযুগলের ন্যায়। এ-রোগী, সে-রোগী পার হয়ে, ফিনাইলের গন্ধ মেখে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাই। কিন্তু লাজমিনা অথবা তার স্বামী কাউকেই দেখতে পাই না।
: আরে, এত রাতে কী মনে করে?
: আচ্ছা, লাজমিনা নামে কেউ ভর্তি হয়েছে?
: ভর্তিখাতা দেখে নে, একটু কষ্ট করে।
সুতরাং, ভর্তি খাতা দেখতে যাই। না, এখানেও লাজমিনা নামে কাউকে খুঁজে পাই না।
এবার আমার মেজাজ খারাপ হয়। একে তো ঘুম বাদ দিয়ে এসেছি, পথে সেই উদ্ভট লোকের খপ্পরে পড়া, লাজমিনার স্বামীর মোবাইল বন্ধ এবং ষোলকলা হিসেবে লাজমিনাকে না পেয়ে বের হয়ে যাই। বারান্দায় এসে খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিই কিছুক্ষণ। ঘাড়ের কাছে অন্য কারো নিঃশ্বাস টের পেয়ে সচকিত হয়ে উঠি।
: কাজটা ভালো করলেন না।
কে কথাটি বলেছে ঠিকঠাকভাবে বুঝে ওঠার আগেই আবিষ্কার করি নিজেকে বিছানায়। দীর্ঘ ডিটেইলসের স্বপ্ন দেখছিলাম এতক্ষণ, যা এইমাত্র ভেঙে গেল।

তিন

মোবাইলে সময় দেখি। রাত তিনটা ত্রিশ। মাথায় ভোঁতা যন্ত্রনা। কললিস্টে লাজমিনার স্বামীর নাম্বার নাই। তারমানে পুরোটাই স্বপ্ন ছিল। তাছাড়া হুট করে ওদের ফোন পাব, এমন কোনো কথা বিনিময় ঘটেনি অনেকদিন। সত্যি বলতে কী, মন খারাপ হয়। কে জানে, হয়তো ঐ উদ্ভট লোকটি আমার স্বপ্ন সত্যি করতে পারবে এমনটি ভেবেছিলাম কিনা। আদৌ, কি লাজমিনা আমার স্বপ্ন ছিল? তাও তো না।
বাচ্চার কান্না শুনে চমকে উঠি। তার চেয়েও চমকে উঠি, ঠিক পাশে দেবশিশুর মতো এক শিশুকে শুয়ে থাকতে দেখে।
: এতক্ষণ, আমি সামলেছি। এখন তুমি সামলাও কিছুক্ষণ। একদম ঘুম হয়নি আমার।
বাচ্চাটির পাশ থেকে লাজমিনা কথাটি আমাকেই বলে। বস্তুত, কথাটি শুনে নিজেকে চিমটি দিয়ে বাস্তবতা সত্যতা যাচাই ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসে না আমার।