স্বপ্ন নয়, মানুষই দ্রষ্টা...

সারাজাত সৌম



আমি তো আসি নাই এখনো—যে, বলবো আমি এসেছি। তাহলে কি নিয়ে এতো কথা বলা, ভাবনা বা কল্পনা/স্বপ্ন বলি তারে! অথচ এখানেই ভাবনার বিস্তর জাল ফেলে বসে আছে আমাদের মস্তিষ্ক, এই ভূ-চড়াচরে। সেখান থেকে কিভাবে বের হয়ে আসবো আমি? আর এলেই বা কি হবে আমাদের এই অস্তিত্ত্বের, সে দেখতে কেমন হবে? এই একই রূপ কী সে পাবে, নাকি ফের ধুয়ার কুন্ডুলির মতো কোথায়ও উড়ে উড়ে হাওয়া হয়ে যাবে ছিন্নভিন্ন অর্থের অতীত। যদি বলি, কে দেখেছিলো প্রথম কাকাতোয়া এই পরগনায়—জানা নেই! জানা নেই—কোন নদীর তীর ধরে আমি নেমে এসেছিলাম এই মাটির পাত্র হয়ে জ্ঞানে ও নির্জ্ঞানে। তবে বোধ করি এখানে ছিলাম না কোনো কালেই এইভাবে। এটাই বিস্মৃতি এবং বিস্মৃতির এই বিস্তর ছায়া হয়তো কোথাও পরে আছে নিরালায়। আবার বলতে হবে আমাকেই, আমি তোমাদের পাশেই তো আছি এই কায়াময় রূপের রঙ নিয়ে নানা আকার ও আকৃতিতে। শৃঙ্খল তো শুধু প্রোথিত আছে মানুষে আর ঈশ্বরে। আর তার বাকি সবটাই যদি স্বপ্ন হয়, তবে তারও তো আছে এক অপরূপ রূপ—পরানের কুঠরে, নিদ্রায় বা জাগরনে। জেগে থাকা সে তো দেহ গঠনের বিলাপ, যা ফেলে আসা হয়েছে পৃথিবীরও বহু বহু বছর আগে! শীতল ছায়ায় ঘেরা আমার বা আমাদের প্রেমে—কামে—শ্রমে এবং ঘামের মঠ ফেরত আত্মার সরূপে। তবে কেন আমি শিশু থেকে বড় হয়ে উঠছি নিয়ত! নাকি আবার পেছনের দিকে হেঁটে যাচ্ছি কায়মনোবাক্যে। এই বাগান ঘেরা গলিগুপচি এমনকি কীট—পতঙ্গেরাও টুপ ফেলে বসে আছে যে যার মতো। দেখো, আমার পা উল্টোভাবে দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। বেঁকে যাচ্ছে চোখ—হাত—পা—নাক—কান—আ র যা যা আছে অঙ্গ-প্রতঙ্গ আমার, তার নানাবিধ কার্যকারণে। পাখির সাথে কেনো এতো সখ্য আমাদের এই নীল পাতাবরণ দিনে। কেনো তারা বাজনা বাজায় আমার কানে। আমি কি এমন তার ভাষা বুঝি—বলো, ওই রফরফ গতির ঘোড়াও কী একদিন আমার ছিলো। যে আমায় নিয়ে ভেসে বেড়িয়েছে আরশে মোয়াল্লায়? আমি জানি না। আবার জানি এও যে, ওটাই ছিলো আমার ভূমি। আমি তো ওখানেই ফিরি। তবে আমি প্রেমের নারীদের কীভাবে ছেড়ে এলাম এইখানে! আমি জানি কিন্তু আমি বলতে পারি না সে ভাষা। স্মৃতি তো এমনই। স্বপ্ন বলে যে ভ্রম আমার, জগতে তাকে ধরতে মানুষই ব্যবহার করেছে নানা শব্দ এবং দৃশ্যকল্প আর সংকেত ঘেরা এই ভাষার পাহাড়। অথচ পূর্বের যে কোনো ঘটনা ছাড়া তাকে দেখবার বা বোঝার কোনো বাহন তো নাই মানুষের মনে। তবুও যেন আমি আমার সকল ছবি ও সুরত রেখে এসেছি অগনিত ফুলের কাছে। তারা তো মৌমাছি নিয়ে খেলেই দিন পার করছে আজও। অথচ কে আমি? এই রাত—দিনের হিসেব নিয়ে এভাবে পরে আছি আবার কেউ কেউ ফিরেও যাচ্ছি এক লহমায় আলো থেকে দূরে এবং বহুদূরে। মানুষের সাথে আমার কোনো সখ্যতা তো নেই। সকলেই তো সকলেরই ছবি। কখনো এমন মনে হয় যে, নারীদের পোশাক থেকে খসে পরেছি আমি একটি অতি সাধারণ মুক্তার মতো—তার আলো থেকে—দেহ থেকে বাস্তবিক আশায়। যেন কেউ কাছে নেই, এই মাঠে প্রান্তরে আর। কেবল দেহই স্বর্গের আশা করতে পারে আর আমি মর্ত্যের আশায়। এখন কে বলে দেবে স্বপ্ন আর আমার এই আত্মার দূরত্ব কতোদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সাপেদের সঙ্গে যে একদা আমার বন্ধুত্ব ছিলো বেশ, এটা জানতেন ঈশ্বরও। অথচ আমার ঘুম থেকে টুটে গেছে সেই দিন মহৎ কারুকার্যের দিকে। যেদিকে আমি ফেলে এসেছি আমার জীবনসমগ্র এক তূবা বৃক্ষের নিচে। তার পাশেই তো নদী—মাছেদের এই পাপ জলের নিচে যে বেদনা জাগায় কিংবা যে জল এই পাপ নিয়ে ঢেউ খেলে যায় অন্তহীন ভাবে তাকে তোমার চোখ কেবলই ধরে এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যের মতো স্বচ্ছল আর নিরবতার মতো গভীর রাতে। এখন আমার পোশাক খুলে নাও। খুলে নাও—হাত ও পায়ের বাঁধন, এমনকি মাংসের সকল জটিল রক্তের নেশা। খেয়ে যাক যতো আছে পোকার দঙ্গল। মহৎ বলে আমি তো কাউকে খুন করিনি কখনো কিংবা ভালোও তো বাসিনি এই গৃহে। নখের সাথে ব্যবহার করেছি কেবলই নখ। রাতের সাথে রাত। তোমার সাথে আরো একটা তুমি। আমার সাথে আরো নানা রকমের তুমি আছে জড়িয়ে। দেখো, ডেকে যাচ্ছে কতো মানুষ কতো ভাষা নিয়ে। কতোভাবে এই মিলে মিশে থাকার চেষ্টা মানুষের। আমি একটা ক্ষুদ্র পতঙ্গের দিকে তাকালেও সে আমার দিকেই তাকায়। একটা হাঁসের দিকে তাকালেও সে আমার দিকে তাকায়। যদি তুমি বিশ্বাস রাখো, তাহলে সকলেই তোমার দিকে তাকায় এমনকি তুমিও সকলের দিকে। এটাই ফিরে যাবার পথ আমাদের সকলের দিক থেকে। এটাই সমাধান। অথচ আমি আজও জেগে উঠি নাই—উঠি নাই এই গৃহ ছেড়ে। উজ্জ্বল আলোর দিকে কে যায় বলো সবুজ রঙ গায়ে মেখে। যার কোনো অস্তিত্ব নাই কিংবা যার নাই কোনো মায়া—কায়ার রূপ। তবুও আমি দ্রুতগামী। আরো দ্রুতগামী এই যে, আমি সব কিছুকেই দেখতে পাই অথচ যখন ফিরে আসি তখন কিছুই সাথে করে নিয়ে আসি না! আমি চাই সমস্ত কিছু নানাভাবে—নানা রঙে। এই দাসত্ব নিজের সাথে। মনের সাথে যা কিছু বেঁধে দেওয়া হয়েছে আমার। সম্পর্ক তো সেই, নিজের সাথে তাকে মিলিয়ে নেয়া। ঈশ্বর আর আমার সাথে যে বন্ধুত্ব তাকে ফেলে আসা হয়েছে সকল স্বপ্ন দেখবার আগেই। তবুও আমি আছি। এই যে আছি বলে মানুষ বলা হয় আমাকে। কেউ তো আর এমনিতেই আসিনি এই চরাচরে। এসেছি স্বপ্নের মতো দীর্ঘ আর বৃত্তাকার হয়ে। কখনো বা এমন হয় যে, নিজের সাথে মিলিয়ে নিই নিজেরই চেহারা। কই এখন তো আর কিছুই দেখতে পারছি না আমি! আথচ আমার হাতের রেখার ভেতর দিয়ে যে নদী চলে গেছে আয়ুর সমান মাছের আঁশ ঘেঁষে কিংবা চোখের ভেতর থেকে যে নৌকা উড়ে যাচ্ছে অসংখ্য মেঘের ভেতর দিয়ে। কই তারা কেউ তো আর আমাকে ডাকছে না নাম ধরে। বলছে না—উঠো, তোমার ঘুম ভেঙে গেছে। উঠো—এই পৃথিবী তো তোমার না। যতোদিন ছিলে এবং থেকেছো তা কেবল বিভ্রমে। হঠাৎ তড়িঘড়ি কোথায় পৌঁছালাম আমি আজ? আমি জানি এটা স্বপ্ন—আর এটা সেই স্বপ্ন যা ভেঙ্গে গেলে মানুষ—মানুষ হয়ে উঠে নিশ্চয়।