নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ

রেজওয়ানা জাহান



: এই, কী হচ্ছে এইসব!
: শশশশ....
: কী?
: ঘ্রাণ! বেলী ঝরে পরছে মনে হচ্ছে। কবে দেখবে আমায় আর খুঁজে পাচ্ছো না। নিরুর বর কই? নিরুর চুলে হারিয়ে গেছে.. হা হা হা।
: হলো তোমার! খালি বোকা বোকা কথা। ছাড়ো তো!
: উহু, চুলে মুখ গুঁজে থাকবো।
: আর হাতের কাজ গুলোর কী হবে?
: চুলোয় যাক। আজ আদর দিবস। কোনো ছাড়াছাড়ি নাই। পৃথিবীর ছুটি। শুধু তুমি আর আমি।
নির্ঝর এবার চোখ বুজে চুপ করে মুখ ডুবিয়ে দেয় তার বুকে। নেরুদা ভাসে, বর আওড়ায়...

When you lose yourself in your own hair,
Don't forget me, remember that I love you,
Don't let me be lost wandering without your head of hair

Through the dark world of all thee roads
Which holds only shadow, feeling sorrow,
Until the sun climbs the tower of your hair..

নেরুদা ধীরে ধীরে সূরা ইয়াসিন হয়ে যাচ্ছে।
নির্ঝর চোখ খুলতে চাইছে না। শরীরটা বড্ড ভার লাগছে। গলা শুকিয়ে আসছে। মুখ নোনতা লাগছে।
: ঘুম ভাঙলো?
: হুম। কে?
: হা করুন। গাম ব্লিডিং হচ্ছে। মুছে দেই।
: আপনাকে চেনা চেনা লাগছে। কে আপনি? আমি কোথায়?

নার্স মেয়েটা প্রশ্নের উত্তর দেয়ার প্রয়োজনবোধ করলো না। নির্ঝরের মেন্টাল ফগিনেস বড্ড ভোগাচ্ছে। জেগে উঠলেই প্রশ্নের শিলাবৃষ্টি।

: কী হয়েছে আমার? কথা বলছেন না কেনো?
: আহ্, আস্তে। ভেন্টিলেশন হচ্ছে তো। নল খুলবন না।
: আমি কোথায়? কী আশ্চর্য! কিছু বলছেন না কেনো?
: আপনার AML হয়েছে। Acute Myeloid Leukemia । আপনি ICU তে। এখন একটু শান্ত হোন, আপনার Blood transfusion হবে একটু পর।

নির্ঝর চুপ। কার্ডিক মনিটরে বিজলী চমকাচ্ছে একটু পরপর।
বিপ বিপ... সূরা ইয়াসিন... বিপ বিপ...
পালস অক্সিমিটার, ৬ মাত্রা কাহারবা? তাল কাটছে?
হাতটা রোমশ ছিলো। এখন একদম শাদা লাগছে। মাথাটা ফাঁকা লাগছে আর দূর মহিলাকে আম্মা লাগছে। তেলাওয়াত করছেন এক মনে। কাহারবাতে?
সে কোথায়? ওকে দেখছিনা যে!
: আমার বর কোথায়?
: আপনি আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন!
: আমার বর কোথায়? ওকে ডাক দিন, প্লিজ।
: আপনার বর এখানে নেই মিসেস নির্ঝর।
: নেই! নেই মানে কী! ওকে খবর দিন। আসতে বলুন। এক্ষুণি।
: আপনার মেয়েটাকে একটু সামলান গো। সিডাটিভ দেয়া আছে। অল্পেই ঘুম চলে আসবে। ততক্ষণ একটু সামলান।

আম্মা বিরক্ত।

: মুখটা বন্ধ করবি তুই? বান্দীর পোলার কথা তুলবি না আমার সামনে। বৌ মরার আগেই তার হেঙ্গা বান্ধাইতে হইব! অমানুষ, বেঈমান। তার তো লোকলজ্জাও নাই। প্রথমেই বলছিলাম পোলাডা ভালানা। গেলোতো এখন? বান্দীর পোলা আমার ওযু খাইলো।

আম্মা ঝাপসা লাগছে। নার্সের গোলাপী মুখটা আস্তে আস্তে মনে পড়ছে। মনে পড়তে পড়তে ঝাপসা হতে শুরু করলো। হাড় সমেত কী ব্যথা! ব্যথা বেড়েই চলছে। নির্ঝর সহ্য করতে না পেরে এবার চিৎকার করে উঠলো।

: এই, কী হয়েছে তোমার?
: তুমি!
: কী হয়েছে লক্ষ্মী? দুঃস্বপ্ন?
: তুমি ধরো আমায় প্লিজ। ধরে রাখো। তুমি কোথায় ছিলে আমায় ছেড়ে?
: কী হয়েছে? আমি তো এখানেই। এইতো। ওয়েইট, এই নাও। পানি খাও। ফ্যান ছেড়ে দেই লক্ষ্মী? ঘামছো।
নির্ঝর পিঠ খামচে আঁকড়ে রেখেছে।
: নাহ, কোত্থাও যাবে না তুমি! কোত্থাও না।
: পাগলিটা! কই যাবো তোকে ছেড়ে! স্বপ্নই তো! এতো ভাবতে নেই। আয়,বুকে শুয়ে থাক, মাথায় হাত বুলিয়ে দেই।
: আমার চুল? আমার চুল?
নির্ঝর লাফিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালো। নাহ্, চুল ঠিক আছে। রোমশ কপালের নীল টিপটাও।
: এই বোকা মেয়ে। এদিকে আয়।
: হু। এই শোনো, আমায় চিমটি কাটো তো।
: নাহ্, আমি আপনাকে কামড় দিবো... এখানে এখানে...
:আহা, কী হচ্ছে!
: প্রেম হচ্ছে। শুনো, তুমি কিচ্ছু খাওনি সারাদিন। তাই এমন দুঃস্বপ্ন দেখছো। তুমি বসো আমি খাবার গরম করে আনছি।
: না তুমি যাবে না।
: ঠিক আছে, যাচ্ছি না।চোখ বন্ধ করো। আমি বিলি কেটে দিই।


হাতটা কেমন যেনো তেল তেলে হয়ে যাচ্ছে।

: কি রে মা? কী বিড়বিড় করিস!
: তুমি?
: কদুর তেল, আরাম পাবি। চুপ করে শুয়ে থাক।
: আম্মা, আমি কতোদিন ধরে এইখানে?
: ৫ মাস হয়ে যায়গো মা।
: আম্মা, এইটা তো হয় না। এগুলা কীভাবে হয়? আম্মা একটু ব্যথা দাও। একটা চিমটি কাটো।
: কী উড়া উড়া কথা কয়! চিমটি কাটতে হইবনা। এখন পায়ে ক্যানুলা লাগাইব। হাতেরতো কিচ্ছু বাকি রাখে নাই। এইসব আর সহ্য হয় না । এইসব দেখার আগে ক্যান যে আল্লাহ আমারে নিয়া গেলো না।

নির্ঝরের ক্লান্তি লাগছে। পিছন থেকে কেউ একজন জড়িয়ে রেখেছে। একটা ভালোবাসার হাত। সেটা কার কে জানে! নির্ঝরের আর তাকাতে ইচ্ছা করে না...