স্বপ্ন দর্পণ

জয়শীলা গুহ বাগচী




ঠোঁটের ফাঁক বরাবর একটা স্বপ্ন গড়িয়ে পড়েছে অল্প জীভ মুছে নিচ্ছে অল্প অল্প রোদ । অপর ঠোঁটের সীমান্তে সেজে উঠছে বলা না বলা অবস্থান , ছড়িয়ে যাচ্ছে জীভ থেকে জীভে । একটা বর্ষাকাল ভেঙ্গে পড়ছে যেন । ঘুমের ভেতর চুমু খাচ্ছে বিদ্যুত । এই বিদ্যুতে যথারীতি দেখা গেল হাল্কা ভেজা রঙের শার্ট । হাতের টুপিতে কেবলই খরগোস ।
এই হল স্বপ্ন । প্রতি সপ্তাহে কোন না কোন দিন অথবা মুহূর্তে মুহূর্তে সে আসে । এদের একটি অনুষঙ্গ খাট ...পশমী নরম সরম ,ঘুমের আনাচ কানাচ এদিক সেদিক বাজিয়ে তরলিত চন্দ্রিকা ঝরঝর পড়ে যায় , পড়েই যায় । হি হি হাসিতে কিচেন কিচেন চিকেন চিকেন, কী রূপ আহা ! নিবিড় বরমাল্য কনেমাল্যে সেজে ওঠে একটি মৌলিক সংখ্যা । একক ...
সমাজের কোলে
বেবী কটে দোলে
দুলতে দুলতে আমরা পতিপত্নী স্বপ্ন দেখি লেসের বাড়ী , লেসের ল্যাম্প , লেসের বাঁধনে গোলাপী হার্ট ।
স্বপ্নের বাইরে বলি না তো ...এই পুরুষ , এই নারী, এই সন্মতি , চল জয় করি ।
এরপর............
যৌথতা বাড়ে , কমে। হাত ধরাধরি করে যেমন জ্বলে নেভে, টুনি বাল্বের আলো , সতত শব্দের যেমন ধরণ , জীভের ওপরে মিঠে মিঠে স্বাদ । কাঁচা মিঠা ।আমরা কাঁচা, কচি কচি স্বাদ ভালোবাসি , পাকা হতে ভয় । স্বপ্নের ভেতর নিখাদ যৌথতা চিকমিক করে , আমাদের এক হাঁটু , এক কোমর , একই ছাতি। জীবন জুড়ে আছে এক জাতি …। ক্লাস ফাইভে চিবুকে তিল মেয়েটি গেয়েছিল – “আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরাধরি ।’’… ও কিছুটা বড় হয়ে স্বেচ্ছামৃত্যুর ভেতর পড়ে আছে বলে গানটা তো মিথ্যে হয়ে যায় না । আমরা সহচর সহচরী অল্প নাচি , অল্প গাই , অল্প অল্প বাঁচি । ভাতের ফ্যানের সাথে বেশি না , অল্প স্বপ্নগুলো ছেঁকে ফেলি । তারপর সে আছে বা নেই । নেই এর তত্ত্বে সে আছে , আছের তত্ত্বে সে নেই । এইসব উপাখ্যান চলতে চলতে আমরা ম্যাও বলতেও ভুলে যাই । থুড়ি ভয় পাই । বাপ জ্যাঠারা গলা ছেড়ে স্বপ্নের যৌথ খামার শেখালে কী হবে আমরা খোঁয়াড়ের হালুম , তাই স্বপ্নরা কীরম যৌথ বিনীত দূর্বাদল । বাড়ে না মরে না ।
এ পর্যন্ত স্বপ্নের রোমাঞ্চকর একতলা বাড়িতে চুরুটের ধোঁয়া মেঘ । এ পর্যন্ত মধ্য মধ্য ভাষা ভাষা প্রতিরোধের ঘামাচী , খুব চিটপিটে । এই পর্যন্ত...।
তারপর সব কেমন গুলিয়ে ওঠা আইডেন্টিটি । হাতিমি আর হাঁসজারুর মার্কামারা দেশাত্মবোধে স্বপ্নরা বড়ই বিবেচনাধীন ইকড়িমিকড়ি । কেবল মহেঞ্জোদরো বললে নিজেকে না পাওয়া ঘোড়া মনে হয় । অথবা ধ্রুপদী সঙ্গীত থেকে যখন দেয়া শুনি তখন কেমন অনুগত দর্পণ মনে হয় ওকে মানে স্বপ্নকে । এ বাদে বাকি সব বোধ অথবা কিছু তথ্য যা কিনা শিশুকাল থেকে পতাকার মত টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে ।এর কী মানে? বাকিদের সাথে আমার মিল কোথায়? মহান স্বপ্নের থেকে আমি ও ঘোড়া পালাতে থাকি । হয় ও আমার পিঠে নয়তো আমি ওর পিঠে ।আমি নিরক্ষীয় থেকে সরে আসি, আমি মালভূমি থেকে সরে আসি । ঘোড়ার গা থেকে কলোনিয়াল গন্ধ বের হলে ওকে ছেড়ে দিই মাঝপথে । ও কলোনিয়াল হ্যাং এর মত পেছন পেছন হাঁটে , আগে আগে হাঁটে । আমি গাঙুরে নামি গা ধুতে । তখন বেহুলা ভাসে , বেহুলা যেতে থাকে নদী পথে , দাম্পত্যের মৃতদেহ কোলে । ফুলওয়ালা আমাকে সাজায় আর বলে এইসব নদীর মেলাঙ্কলি নাকি বেঁচে ওঠার মত স্নিগ্ধ ভারী । আবহবিকার থেকে, চর্যাগান থেকে আমার কল্পিত দেশ শুরু হয় । আমাকে বাউল বাজায় , স্বপ্নেরা গান থেকে তুলে দেয় অজস্র কোমল রে । আমি এতসব কোমল রে দিয়ে শুকতারা ধুয়ে দি। এইই দেশ এইই স্বপ্ন ।
ঘড়ি আর মা, সময় সংক্রান্ত স্বপ্ন বুনতে বুনতে কড়া গলায় বলত , -‘ সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায় ’
সেই থেকে তো শুধু চলে যাওয়া দেখছি । আগে হাঁটছি সে পেছনে চলছে । থেমে পড়ছি সে আগে বেড়িয়ে যাচ্ছে । কিছুতেই মেলেনি , কড়ায় গণ্ডায় বেঁচে ওঠাকে তছনছ করে বার বার হারিয়ে দিয়েছে । হার মেনে বলেছি আমার মাথায় যথাযথ তরঙ্গ নেই , ছেড়ে দাও এবার । আমার মিনতিতে কার কী যায় আসে ।
গ্র্যান্ড ফাদার ক্লকের নীচে চাপা পড়ে আমাদের আত্মবিশ্বাস ।সুমহান কাঁটা বুলিয়ে বাপ ঠাকুরদা আমাদের গন্তব্য বলে দেবে , স্বপ্ন সাজিয়ে দেবে , আমরা স্টপ ওয়াচ হাতে দৌড়ে যাব সারাজীবন । দৌড়তে দৌড়তে কতবার ভেবেছি আমার স্বপ্ন আমি দেখব , কার কী ? সাথে সাথে অবচেতনের সেপাই সান্ত্রী দৌড়ে আসে । লুকিয়ে রাখে বেপরোয়া কে । যুঝতে যুঝতে চালাকি এবং কৌশল শেখা গেল । তাই তো ! একই সময়ের শ্রোয়েডিংগারের বেড়াল বেঁচেও থাকতে পারে মরেও যেতে পারে । সময় একটাই , একাধিক বিশ্বে আমি নতুন নতুন ... বেঁচে উঠলাম একাধিক ...... একাধিক কণায় কণায় স্বপ্নের ঝুমঝুমি । এই তো বুক চিতিয়ে হারিয়ে ফেলা , হেরে থাকা । অনেক স্বপ্নে অনেক বেঁচে ওঠা।