নির্জনার জার্ণাল থেকে

বৃতি হক




“চিরতন হরতন ইস্কাবন অতি সনাতন ছন্দে করতেছে নর্তন...”
তারপর একদিন, আলগোছে আমি গোপন কক্ষটিতে ঢুকে যাই। ক্লজেটে ঝুলিয়ে রাখা সারি সারি মুখোশ, মান্ধাতা ঘরানার বা হাল ফ্যাশানের রংচঙে পোশাক, বাহারি পরচুলা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। তোমরা প্রায়শঃ এই ঘরে এসে নিজেকে গুছিয়ে নাও জানি। কোন চরিত্রে অভিনয় করবে আজ-- তার ওপর নির্ভর করে তোমাদের সজ্জা, ভঙ্গিমা, কথা বলার ধরণ। পাকা খেলুড়ে তোমরা, দ্রুত গেট আপ বদলাতে সক্ষম। তীক্ষ্ণ ছুরি আর বক্র হাসি পকেটে পুরে আয়নায় সঠিক ভঙ্গিটি খুঁজে নিয়ে স্টেজে আসতে তোমরা। শব্দের পিঠে শব্দ। ছুরির বাঁটে আঙুল রেখে কথার চাতুর্য, সুর ও ভাষার মায়াজাল, দৃশ্যের পর নতুন দৃশ্যের অবতারণা। আনকোরা কেউ কেউ অবশ্য খেলার নিয়ম না জেনে ক্লাইমেক্স শুরু হবার আগেই যবনিকা ফেলে দিত। ধুওউউউউর!! বিরক্ত হতো তোমাদের কেউ! আমি অবাক হতাম, এইসব শৈলী আর কারিগরী নৈপুণ্যে ভীষণ অবাক হতাম। নিঃসঙ্গ আমি তোমাদের বন্ধু হতে চেয়েছিলাম শুধু। প্রত্যুত্তরে আমাকে পাকা খেলোয়াড় হতে বললে। তোমাদের নিয়ম মেনে খেলেছিও মাঝেমধ্যে। উজ্জ্বল রোদ, তুমুল বৃষ্টি, দমকা হাওয়া কিম্বা তমসাচ্ছন্ন আঁধার-- সে খেলা থেমে থাকেনি কখনো।

তারপর একদিন, নীল-শাদার ব্যাকগ্রাউন্ড আমার অসহ্য লাগতে থাকে। চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি তোমাদের উচ্চারিতব্য বাক্য। তোমরা প্রেডিক্টেবল। সেই মেয়েটার কথা মনে আছে? তনু? নিতান্তই সহজ সরল ছিল সে। ভ্রু কুঁচকে বললে, চলবে না একে দিয়ে, রীতিমত ফ্লাট ক্যারেক্টার! গেট আপ সেন্স একেবারেই নেই। ভেরিয়েশনের অভাব। অজন্তা? রেহনুমা? অভিনয়ে ভীষণ কাঁচা ওরা, কথার জাদু তৈরি করতে জানে না। আয়েশা? নাহ, ফেসভ্যালু কম! গুরুত্বহীন। তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলে। পূর্ণিমা? কাম অন! পাবলিক এসব খায় না! রুমা-লাকি-মর্জিনা-শিউল ি? নোপ। নতুন মুখের সন্ধান করো। তারপর একদিন, এসব ডার্ক কমেডির স্ক্রিপ্ট আমার অসহ্যবোধ হয়। এইসব ব্যবচ্ছেদে অন্য কেউ-ও একই সাথে ক্ষতবিক্ষত হয়, এইসব মুখোশে অন্য কারো মুখ ক্রমশঃ কেটে যায়। I’m not your cup of tea, Dudes! Not anymore! Game’s over now! সবুজ লাইট বন্ধ করে বেরিয়ে যাই সে ঘর থেকে, অজ্ঞাতবাসে যায় যেভাবে কেউ, কখনো অবশ্য আবার ফিরেও আসে। যেভাবে একজন ডুব দেয় পুকুরজলে, এইসব নিমজ্জন থেকে উঠে দেখে নব্য লেবাসে নব্য খেলোয়াড়। এইসব খেলা থেমে থাকে না কখনো।

“প্রত্যহ সেই ফুল্ল শিরিষ প্রশ্ন শুধায় আমায় দেখি, এসেছে কি? এসেছে কি?...”
ছোট পাহাড়ী শহরটা ধোঁয়াশার চাদরমুড়ি দিয়েছে আজ। অফিস ছুটির পর বাইরে এসে বুকভরে শ্বাস নিই। আহা! পাইনের গন্ধ! ভীষণ কুয়াশায় ছেয়ে আছে চারদিক, ধীর সন্ধ্যেয় দশ-পনেরো হাত দূরের কিছু দেখতেও কষ্ট হচ্ছে। শহরটার উঁচু নিচু রাস্তাগুলোতে অনেক দূরত্ব রেখে একেকটি স্ট্রীটলাইট, কুয়াশায় টিমটিমে আলো ছড়ায়। সামনের সরু রাস্তাকে অন্ধকূপের মতন মনে হয় আজ। হেডলাইট জ্বেলে খুব ধীরে ধীরে এগুচ্ছি। রেডিওতে হালকা জ্যাজ বাজছে, মন আমার জ্যাজ- কুয়াশায় দ্রবীভূত। ঠিক তখন, ডানপাশের রাস্তা থেকে হঠাৎ ত্বরিতবেগে ছুটে এলো এক সবুজ বিশাল ট্রাক, তার রেড স্টপসাইনের তোয়াক্কা না করে। ইচ্ছের বিরুদ্ধেই আমার পা ব্রেকে প্রবল চাপ দিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিলো, নিজের অজান্তেই চীৎকার করে প্রাণপণে হর্ন দিতে থাকলাম! আমার গাড়ি থেকে যেন ছ'ইঞ্চি দূরে থামতে পারল সেটা। খুব কাছের থেকে ড্রাইভারের চাউনি দেখলাম, ক্ষমাপ্রার্থনার লেশমাত্র নেই সে চোখে, বিশাল সবুজের পটভুমিতে দুটো ক্রুর শিকারী চোখ! রথবার্ট! এখানেও! জবাবদিহি চাওয়ার বদলে দ্রুত স্টার্ট দিলাম, সশব্দে সেই ট্রাক ধেয়ে এলো আমার দিকে, আবার, তার বিশাল তিরিশটনি দেহ নিয়ে, যেন অতিকায় সবুজ ড্রাগন এক! গার্বেজের ছানা, চারপাশের নির্জনতার সুযোগে আমাকে টেইলগেটিং করে ভয় দেখাচ্ছে! দুটো হার্টবিট মিস করলাম মনে হলো, তারপর প্রাণটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে উড়ে চললাম যেন, সেই ওডেট আমি – যেন আকাশে উড়ছি, উড়ে যাচ্ছি হিমকূপের অতলে, পাতালে; পেছনে সবুজ রঙা দানব! বইয়ের পাতা হোক, মাটির পৃথিবীতে হোক—রথবার্ট জন্মশিকারী। ধাওয়া করে চলে শিকারকে, সর্বত্র! লোকালয়ের ভেতর চলে এলাম দ্রুত, এক গ্যাসস্টেশনে তড়িঘড়ি করে ঢুকে পড়লাম! হাঁপাচ্ছি তখনও! মুখ খিঁচিয়ে খিস্তি করে চোখের সামনে দিয়ে সবুজ দুঃস্বপ্ন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল!

“আমার মন কেমন করে, কে জানে কাহার তরে...”
আঠারো তলার সুশীতল ঘরের জানালার ভারি পর্দা টেনে সরিয়ে দেই। নিচে জোনাকফোটা রাতের মায়াবী শহর। আমাকে সুস্থির করতেই যেন, বিস্তৃত কাচের দেয়াল ভেদ করে কোজাগরী চাঁদ তার আলো, কিছু স্বপ্ন আর তোমাকে নিয়ে আমার ঘরে বেড়াতে এলো। মেঘ আর কুয়াশায় ভেজা আজ এই রাতে আমার ঘর ঠিক যেন Swan Lake! পুরনো বাক্স খুলে ব্যালে-শ্যু আর টুটু বের করলাম। আহ, দু’পায়ে মন্দ্রতাল তুলে নাচতে ইচ্ছে করছে ভীষণ। প্রিয় প্রিন্স সিগফ্রিড, এ ঘরে তুমি এসেছ জানি। মাথা হেলিয়ে তোমার বিস্তৃত বুকে ঠাঁই পেতে পারি, হাতে হাত মিলিয়ে হৃদয়ের কম্পন অনুভব করতে পারি—এতোটাই কাছে যেন তুমি! পেরি অ্যালিসের গন্ধ উপচে তোমার সৌগন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে ঘরজুড়ে! জানো, ব্যালে স্কুল থেকে একবার আমরা Swan Lake কম্পোজিশানটা পারফর্ম করলাম, আমার ষোলো বছর বয়সে। ইট ওয়াজ আ হিউজ সাকসেস! ওডেট এর ভূমিকায় আমি, কি খুশি-ই না হয়েছিলাম! স্কুলছুটির পর অনেকটা সময় ধরে অনুশীলন করতাম, গ্রীষ্মের ছুটিতে আরও বেশী। ফুয়েটে আর পিরুয়েটে তাল মেলাতে গিয়ে দু’পায়ের আঙুল কতবার ক্ষতবিক্ষত আর রক্তাক্ত হয়েছে। বাসায় ফিরে হালকা গরম পানিতে পা ডুবিয়ে রাখতে হতো। সবচেয়ে কঠিন ছিল যন্ত্রণাবিদ্ধ ওডেট এর অনুভূতিগুলো নাচের মুদ্রায় প্রকাশ করতে। ওডেটকে তোমার ভেতরে ধারণ করো, নীর। তুমি-ই ওডেট। তোমার পুরো শরীরজুড়ে, অন্তরে ধরে রাখো ওকে-- পারফেকশনিস্ট ব্যালে টিচার মিস এরিকা বারবার মনে করিয়ে দিত। দু'বছর পর, যেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যুর খবর এলো, কি আশ্চর্য জানো? মা'র ভেতরে আমি ওডেটের সেই অদ্ভুত যন্ত্রণা দেখলাম। কোন চর্চা ছাড়াই কি নির্বিঘ্নে, কি আশ্চর্য দক্ষতায়, মা দু'চোখে, তার একহারা শরীরজুড়ে, সেই বিবর্ণ কষ্টের নির্যাসটুকু কত সহজে ফুটিয়ে তুললো! কান্না ভুলে অবাক হয়ে সেদিন আমি শুধু মা'কে দেখছিলাম! কিছুটা হিংসে কী হচ্ছিল আমার? জানা নেই। আবার সেইসাথে তখন ভীষণ ইচ্ছে করছিল মা'কে ব্যালে শ্যু'দুটো পরিয়ে দিতে-- এক মহার্ঘ শিল্পের জন্ম হতে পারত সেসময়!
তারপর একদিন, দৃশ্যপট থেকে মা'ও হারিয়ে গেল, বাবার মত। রুপকথার পাতা থেকে নেমে এলো ওডেট, আমায় ভর করে, কাদামাটির পৃথিবীতে – অভিশপ্ত আত্মা এক। সোয়ান লেকে সারাদিন রাজহংসী হয়ে ঘুরে বেড়ায় সে, দিনশেষে একা মানবী! “Forever her soul would be a swan until she feels the love of a nobleman…” অবশেষে তুমি এলে সিগফ্রিড! আমাকে মুক্ত করলে একাকীত্বের এই অভিশাপ থেকে! যখন নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয়, তোমাকে দেখি আমার আঁধার ঘরে, আলো জ্বেলেছ প্রিয় বন্ধুর মতন। ডিয়ার প্রিন্স সিগফ্রিড, ক্যান আই হ্যাভ দ্য লাস্ট ড্যান্স উইথ ইয়ু? ট্যুনাইট? আজ আমার কোন ক্লান্তি নেই। কোন কষ্ট নেই, অনুতাপ নেই, শোচনা নেই, বিস্মরণ নেই! রথবার্টের কালোজাদুর ভয় নেই। আজ আছো তুমি! চন্দ্রস্নানে ওডেটের মত আলতো করে মেঘে ভেসে যাবো, আজ জোছনা ছুঁয়ে দেখার রাত...

একটি স্বপ্নের ভেতর স্বপ্নের প্রতীক্ষায় নির্জনা কেউ
বিশ্বাস হন্তা ঢেউ যেন, এক নির্যাতিত তীরে
তোমার হাতে সুবর্ণ-দানা-বালি কিছু দিতে
একটি রাত, অথবা একটি দিন,
নিযুত ক্রোশ পাড়ি দেয়া রাজহংসীদের ভিড়ে
আমি ডুবে আছি, ডুবে গেছি ।

একটি দৃষ্টি, অথবা শুধু ভ্রম-- কেউ নেই,
তবু তোমার কথা ভেবে
মৃত্যুকে গুনে গুনে স্তব্ধতায় জেনে গেছি
আজও হৃদয়ে জোছনা আছে, দীপ্তি আছে।

শূন্যের নীল সংঘর্ষে একদিন সৃষ্টি লোপ পেলে প্রিয়
আমায় জাগিয়ে দিও।
অন্তহীন নিমগ্নতায় শুধু আমরা দুজন,
সে সময় শুধু ভালবাসাবাসির।