স্বপ্ন অথবা সংকেতের বিবিধ ভাবনা

উপল বড়ুয়া



এক আষাঢ়ী পুর্নিমা তিথিতে শাক্যরাজ শুদ্ধোধনের স্ত্রী মহামায়া স্বপ্ন দেখলেন, চারলোকপাল দেবতাগণ তাঁকে পালঙ্কসহ তুলে নিয়ে হিমালয়ের সুউচ্চ এক মহাবৃক্ষতলে নিয়ে দিব্যশয্যায় শুয়ে দিলেন। তারপর দেব মহিষীগণ তাঁকে বিবিধ সুগন্ধজল স্নান করিয়ে সাজিয়ে দিলেন শুভ্রবসন ও মাল্যগন্ধে। হিমালয়ের পাশে রজতপর্বতে ছিল এক মনোরম সুবর্ণ প্রাসাদ। সেই প্রাসাদ থেকে ঋষির মতো নেমে এলো এক শ্বেত-হস্তী। দিব্য শয্যায় শায়িত মহামায়াকে সেই শ্বেত-হস্তী প্রদক্ষিণ করল তিনবার তারপর একটি শ্বেত-পদ্মের রূপ ধরে প্রবেশ করল রানীর দক্ষিণ জঠরে। পরের সকালে রানী মহামায়া তাঁর স্বপ্নের কথা জানালেন রাজা শুদ্ধোধনকে। রাজা স্বপ্ন-বৃত্তান্ত উদ্ঘাটের নিমিত্তে শরণাপন্ন হলেন রাজ জ্যোতিষীদের। চৌষট্টিজন জ্যোতিষী বহু ক্ষণ-দিন গণনা করে সিদ্ধান্ত দিলেন রানীর সন্তানসম্ভবার কথা। যে সন্তান কিনা হবে চৌষট্টিকলাবিদ্যায় পারদর্শী এক রাজচক্রবর্তী রাজা। রাজা না হলে হবেন একজন জ্ঞানী-বুদ্ধ।

[ সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্মকথা ]

পৃথিবীর ইতিহাস যেমন শোষক আর শোষিতের ইতিহাস তেমনি স্বপ্নেরও ইতিহাস। মানবজাতি তার প্রারম্ভিক সময় থেকেই স্বপ্ন নিয়ে ভেবে আসছে। এবং সেই স্বপ্নকে বিবিধ ভাবে ব্যাখ্যা যেমন করতে চেয়েছে তেমনি স্বপ্নের দ্বারা অলৌকিক বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে চেয়েছে। বস্তু-স্থান-সময়-লিঙ্গ নির্ণয় করে স্বপ্নবিশারদগণ সেই আদিম কাল থেকে স্বপ্নকে দেখাতে চেয়েছেন উদ্দেশ্যপূর্ণ বা ভবিষ্যতের দিক-নির্দেশক ‘বিষয়/পথ’ হিসেবে। লৌকিক সমাজে এমনও বিশ্বাস বিদ্যমান যে, মধ্যযামের স্বপ্নে কাউকে সাপে দৌড়ালে অদূর ভবি্ষ্যতে তার বিপদ অনিবার‌্য । কিংবা্ ঘুমের মধ্যে কেউ যদি ‘কৈ-মাছ/ মাছ’ ধরতে দেখে তবে নিশ্চিত তার হাতে প্রচুর টাকা আসবে সামনে। স্থানভেদে আবার এমনও শ্রুতি আছে, মধ্যযামের স্বপ্নে কাউকে সাপে দৌড়ালে অদূর ভবি্ষ্যতে তার জন্য সুখবর/ সুদিন আসছে। কোন কোন ধর্মগ্রন্থে সাপকে খুব বিষধর ও হিংস্র প্রাণী হিসেবে দেখানো হয়েছে আবার কোন কোন ধর্মগ্রন্থে সাপের পুজার প্রচলন ও সাপ অতীব জ্ঞানী প্রাণী হিসেবে নির্ণিত। এসব ব্যাখ্যা যদিও চূড়ান্ত নয় এবং স্থান-ব্যক্তি-সময়-গোত্ র-বয়স অনুসারে স্বপ্নের হাজার ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব। একজন য়ুরোপীয়ানের স্বপ্নের সাথে একজন বাঙালির স্বপ্ন কখনও এক নয়। বা একজন শহুরে বাসিন্দা বা গ্রামের বাসিন্দার। কারণ স্বপ্ন(dream) তার পরিচিত বস্তু, ব্যক্তি, সময, সংস্কৃতি, লিঙ্গের উপর শতাংশে নির্ভর। এইক্ষেত্রে আমরা, ফরাসি দার্শনিক অঁরি বেঁগসর (Henry Bergon) যে ‘গতিতত্ত্ব’ তার বিষয়ে একটা হালকা চিন্তা-ভাবনা করতে পারি; যদি না আপনি স্বপ্নকে ভবিষ্যতর নির্দেশক বা অতীতের অবদমিত রূপ হিসেবে দেখতে চান। সুদুর অতীতে যা আপনার করার ইচ্ছে থাকলেও এতদিন বিবিধ কারণবশতঃ করতে পারেননি। অবদমন করেছেন ও ইচ্ছে বা কামনাকে এখনও বিসর্জন দেননি। স্বপ্নও অনেকটা গতিতত্ত্বের মতো। ব্যক্তি তার অতীত ও বর্তমান বিষয়ের উপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের একটা নির্দেশনামূলক কিংবা ঝাপসা একটা ইঙ্গিতবাহী স্বপ্ন দেখছেন। অনেকটা ত্রি-কাল দর্শন কি উল্লেখ করা যায়?

স্বপ্নকে অতীতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা হতো ‘ভবিষ্যত’ বা ‘অলৌকিক দেবতার নির্দেশনা’ হিসেবে। গ্রীক মিথলজিতে ‘ডেল’র মন্দিরে’ মূলত যে ‘ভবিষ্যদ্বানী’ পাওয়া যেত তা আসলে মাধ্যম পুরোহিতের অবচেতন মনের স্বপ্ন বৃত্তান্ত ও ব্যাখ্যা। কিংবা মিশরের ফারাওয়ের স্বপ্নে আগাম ‘মহামারী’ সংকেতের প্রচুর উদহারণ আছে এমন। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে স্বপ্নের এতদিনকার ব্যাখ্যা-ধারণা সব পরিবর্তন হয়ে গেল যখন জার্মান স্নায়ু ও মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Freud) তারঁ ধ্রুপদী কাজ ‘স্বপ্ন সমীক্ষণ’ (The Interpretation of Dreams) নিয়ে দেখালেন যে, মনের ত্রি-অবস্থান-সচেতন(Conscious mind), অবচেতন(Subconscious mind)ও অচেতনের(Unconscious mind) কথা। এবং যার সাথে জড়িত ‘লিবিডো’ [Libido] বা যৌনাবেগ’র বিষয়। ফ্রয়েড তাঁর মতবাদ ও তত্ত্বকে উপস্থাপন করতে গিয়ে শরণাপন্ন হোন তৎযুগের পৌরাণিক গ্রন্থগুলোর উপর। তিনি বিখ্যাত গ্রীক নাট্যকার সফোক্লিসের ঈডিপাস রেক্স (Oedipus Rex) এর সাহায্যে মানবমনের অবস্থান নির্ণয় করার জন্য আবিষ্কার করেন ঈডিপাস কমপ্লেক্সের (Oedipus complex)। পরবতীতে যা সাহিত্যে তুমুল আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অনেক মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের এই থিওরীকে তারঁ সৃজনশীল কল্পনা বলে উল্লেখ করলেও ফ্রয়েডের মতো কেউ এইভাবে স্বপ্নকে ব্যখ্যা করেননি। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, আমাদের মনের ৯৫% কন্ট্রোল করে অবচেতন মন (Subconscious mind)। এটা ফ্রয়েডের মত। ফ্রয়েডের আগে হাজার হাজার বছরের পুরনো মানুষদের চিন্তা-দর্শন কি ছিল স্বপ্ন নিয়ে? মানুষ তার আবির্ভাবের পর থেকেই প্রকৃতি বিজ্ঞান দ্বারা জীবন ও প্রকৃতি-পরিবেশের বিভিন্ন খুঁটিনাটি নিয়ে জানতে চেয়েছে। স্বপ্ন তাদের কাছে ছিল অনেকটা প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতি পাঠের ভেতর দিয়ে সেই সব আদি-পুরুষ মূলত ব্যাখা দান করত স্বপ্নের বা স্বপ্ন অনেকটা নিয়তি নির্ধারিত রূপ নিয়েই হাজির হত তাদের কাছে। যেমন, যীশুর জন্ম পূর্বে কুমারী মাতা মেরি দেবতাদের যে ভবিষ্যৎবাণী পেয়েছিলেন তা অনেকটা গ্রীক ‘ডেল’ মন্দিরের অনুরূপ।





স্বপ্নের মধ্য দিয়ে অনেক সাহিত্যিক তার মূল্যবান লেখাটি পেয়েছেন। এটা হয়তো হয়েছে, সচেতন ও অচেতন মনের দ্বন্দ্বে অনেকদিন ধরে একটা ভাবনা ও ইচ্ছা (কামনা) জাইগোট পাকিয়ে অবচেতন মনে তার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে দানা বাঁধতে বাঁধতে একপ্রকার একটা উচ্চমার্গীয় সম্পূর্ণ ভাবনার তালা খুলে দিয়েছে। অনেকটা কার্ল মার্কসের যে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তত্ত্ব, (যদিও এই বলাটা বেশি কিছু হয়ে যাবে হয়তো) থিসিস>এ্যান্টিথিসিস= সিনথিসিস। বিষয়টা আদৌ ঐরকম নাও হতে পারে। তবে ভাবনাভাবনিতে যেহেতু প্রবলেম নেই।

এমনও হতে পারে, একজন ছাত্র যে কিনা খুব ইংরেজী ভাষার প্রতি ভালবাসায় অত্যন্ত দুর্বল এবং ফ্লুয়েন্টলি ইংরেজি বলতে চায় অথচ বাস্তবার্থে অবদমিত বা বাধাপ্রাপ্ত, কিন্তু সে বিবিধ উপায়ে ভাষাটা রপ্ত ও বলতে চাচ্ছে অথচ তার জন্য সহজ হয়ে উঠছে না; হয়তো কোন একদিন ঘুমের এমন একটা পর‌্যায়ে সে খুব সুন্দর ও দ্রুত, নির্ভুল ইংরেজি ভাষাটা বলছে। যখন একটু বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে তখনই তার ঘুমটা ভেঙে যাচ্ছে। এটা উদহারণ। এমন ঘটনা হতেও পারে। আমার একজন পরিচিত লোক, যে সম্পূর্ণভাবে ছিল আমার অপরিচিত, আমাকে কখনও ফিজিক্যালি দেখে নাই এবং কথাও হয় নাই; ফেসবুকে কেবল দেখেছে যেমন দেখে সবাইকে আর স্ট্যাটাসে লাইক দিয়েছে; কোন এক কারণে দীর্ঘদিন পর সে স্বপ্নে দেখে আমি তার পাশে বসে গল্প ও চা খাচ্ছি। এই ঘটনার হয়তো অনেক বৈজ্ঞানিক ও মনোবৈজ্ঞনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আদতে আমরা স্বপ্নের ভেতর যে অপরিচিত লোকগুলোকে দেখি তারা আসলে আমাদের অপরিচিত নয় কোন প্রকারে। এবং অনেক কাল আগে দেখা ও ভুলে যাওয়া মুখগুলো কোন ঘটনার ভেতর বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাদের সামনে ‘মুখগুলোকে’ হাজির করছে। যা আমাদের কাছে অপরিচিত ঠেকছে হয়তো। JIM MORRISON এর একটা গান আছে এইরকম-
¬¬¬¬
“People are strange when you're a stranger/ Faces look ugly when you're alone”

আমাদের কল্পনার জগৎ বা স্বপ্নের জগৎ কখনও বাস্তব জীবনের বাইরে নয়। বাহ্যিক ও অর্ন্তজগতের চিন্তার মিশেলে আমরা একটা ‘অন্য’ চিন্তার আকার পায়। সেই চিন্তাটায় আদতে মানুষের গতিপথ প্রকাশ ও গতি দেয়। এটা বিশেষে সংজ্ঞায়িত। মহাভারতে কৃষ্ণ একপর‌্যায়ে মুখ হা করে ‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ড’ কে দেখায় এবং উল্লেখ করে, এই ব্রহ্মাণ্ড তাঁর স্বপ্নের ও নির্দেশনায় আবর্তিত। এই ‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ড’ কি আসলেই প্রকৃতি বা বিশেষ কোন সৃষ্টির নির্দেশনায় ধাবিত? রোমান্ পোলানস্কি’র একটা মুভ্যির কথা মনে পড়ছে। ‘Rosemary's Baby।’ যেখানে রোজমেরির স্বপ্ন দেখে ধারণা হয় তার আগত সন্তানকে ‘শয়তান’(Satan) জন্মের পর নিযে নিবে। কিংবা ধরা যাক, Spellbound মুভ্যির কথা। জন ভ্যালেন্টাইনের (Gregory Peck) অদ্ভুত সব স্বপ্নের কথা। অনেকদিনের চাপ ও ঘটনার পরম্পরা তাকে বিশেষ কিছুর সংকেত দিচ্ছিল। এছাড়া Inception মুভ্যিতে দেখা মিলবে অন্য এক বহুমাত্রিক স্বপ্ন ও স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণের কথা। স্বপ্ন আদতে অনেক সময় সংকেতের মতোন কাজ করে।

এবার কিছু একাডেমিক কথা বলা যাক। স্বপ্নবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি প্রাণী স্বপ্ন দেখে। এবং তা ২৪ ঘন্টার যে কোন সময়। স্বপ্নের স্থায়ীত্ব নিয়ে অনেকের অনেক মত। কারও মতে কেউ এক ঘুমে অনেক স্বপ্ন দেখে। আবার অনেকে দাবি করেন, স্বপ্নের স্থায়ীত্ব অনেক দীর্ঘ। মানুষ এক স্বপ্ন জীবনে অনেক বার দেখতে পারে। যেটা হয় রিপিটেশন। কিংবা স্বপ্নের একটা ধারাবাহিক বিষয় আছে। স্বপ্ন দেখার সময় মানুষের অক্ষিগোলক খুব দ্রুত নড়াচড়া করে এবং শরীর শিথিল হয়ে পড়ে। অনেক সময় শরীর ম্যুভ করা যায় না। সেন্স থাকলেও স্বর করা যায় না। স্বপ্নবিজ্ঞানের ইংরেজি নাম Oneirology। স্বপ্ন দেখার সময় REM (Rapid eye movement) ঘটে। যা কিন্তু বুঝায় চোখের দ্রুত ম্যুভমেন্টকে।

মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় মানুষ কাদামাটির ছাঁচে স্বপ্নের বিষয় লিখে রাখত। গ্রীক মিথলজিতে স্বপ্নের দেবতা মরফিয়স(Morpheus) মানুষের জন্য স্বপ্নের ভেতর দিয়ে পাঠাত বিভিন্ন বাণী ও ভবিষ্যৎবাণী। এভাবেই হয়তো মানুষ তার আকর গ্রন্থগুলো পেয়ে থাকতে পারে। ফান্জ কাফকার ‘মেটামরফসিস’ উপন্যাসের মূল চরিত্র গ্রেগর সামসার মাকড়শাতে রূপান্তর ঘটে এবং হয়ে উঠে সমাজ ও পরিবার বিচ্যুত ও বার্ডেন। সামসা মূলত যে কর্পোরেট কর্মী ও যার উপর নির্ভর তার পরিবার। তার বাহ্যিক-মানসিক চাপ, সারভাইভাল যুদ্ধ, প্রেমহীনতা, দায়বদ্ধতা হয়তো তার ভেতরে দুঃস্বপ্নের জন্ম দিয়েছিল। যার রূপান্তর ঘটছে মাকড়শার ভেতর দিয়ে। আমরা হয়তো একটা স্বপ্নের দুনিয়ায় বাস করছি। সপ্ন বা দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে। আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের মতো হয়তো আরও প্যারা য়্যুনিভার্স থাকতে পারে। যেখানে আমার অগণিত ছায়ার সাথে আমি অবচেতন মনে যোগাযোগ করছি স্বপ্নের মাধ্যমে।