পলায়ন পর্ব

অপরাহ্ণ সুসমিতো




১.
সকাল ১০টার দিকের রোদে এক ধরণের তারুণ্য থাকে । উচ্ছলতা আছে টগবগে যৌবনের আগমনী আছে মহালয়ার মতো,ঈদের চাঁদের মতো । এক আমুদে অপেক্ষা । খান সাহেবের বড় ছেলেটা আয়েশ করে চা খেতে খেতে টেলিভিশনে কি হচ্ছিল,চোখ রাখতে রাখতে ভাবল,আবারও সেই অভাব দিঘির মাঝে একটি দিন । বাসার ঘ্যানঘ্যান,কোলাহল ভর্তি লোকজনের শ্যামলা কালো কালো মুখ । ঘড়ি মেপে মেপে হকারের ধ্বনি । পুরানো কাপড়চোপড়ের বিনিময়ে হাড়িপাতিলওয়ালা । টেলিভিশনের সেই এক কিসিমের প্রোগ্রাম । রান্নাঘরে মা’র রুটি বানানোর কর্মসূচী । ভাজি বা অমাবস্যার চাঁদের মতো মাংস ঝোলের এক একটি দিন ।

খান সাহেবের বড় ছেলের দিকে তাকিয়ে তার মা স্বপ্ন দেখে । রুটি বানাতে বানাতে স্বপ্ন বানায় । সিনেমা যেমন সবসময়ই দৈর্ঘ্য আর প্রস্থের সীমানায় বন্দী তেমনি মানুষও স্বপ্নের ঘেরাটোপে ফেঁসে থাকে । বড় ছেলেটার চা পানকালীন অবকাশ বিহারের মতো । টেলিভিশনের পর্দায় সিনেমার দিকে তাকিয়ে চলমান চিত্রগুলোর দিকে নজর তার ছিল না । সে ভাবছিল টেলিভিশনটার দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ । আস্ত মানুষের চলন বলন কি আশ্চর্য বিজ্ঞানে আকারবন্দী করে ফ্রেমায়িত করেছে । সমস্ত কিছুই তাহলে ক্ষেত্রফল ।

বড় ছেলে জানে মা এখন বিহারের রুটি বানাচ্ছে,স্পেশাল বাবা রুটি মানে বাবা’র জন্য রুটি । মা চুলার পাশে গরমে ঘেমে ঘেমে ক্লান্তিকর দিনের পর দিন একই সাইজের একই পরিমান রুটি বানিয়ে যাচ্ছে । কি করে করে ? আসলে মা তো শুধু এই মূহুর্তে রুটিই বানাচ্ছে না । স্বপ্ন দেখছে । বড় ছেলেকে নিয়ে । বড় ছেলে বাড়ির সবার চেয়ে পড়াশুনায় ভালো। মা স্বপ্ন বুনতে শুরু করে দিয়েছিলেন । এই ছেলে বিশাল কিছু একটা হবে মানে চাকরী করবে । মা’র কাছে চাকরীর বাইরে জীবন অকল্পনীয় । চাকরী মানেই হয়তো টাকা বা সুখের ডানো কোম্পানীর দুধের টিন ।

মায়ের মাথার উপর যিনি আছেন তিনি খান সাহেব । বিহার থেকে এই বাংলাদেশে কী করে এলেন সে এক ইতিহাস বটে । তিনিও শ্রমিকজীবন থেকে শুরু করেছেন তার এ দেশের জীবন । বিয়ে করেছেন বাংলাদেশের মেয়ে । অভাবী পরিবারের মেয়ে । ক্রমে সংসার হয়েছে । ছেলে মেয়ে অনেক । খান সাহেবের ৭ ছেলে ৩ মেয়ে ।
বড় ছেলে মুর্শেদ চাকরী করল না,শুরু করল ব্যবসা । ব্যবসা গুছিয়ে শুরু করতে না করতেই ছেলে একদিন লতিকাকে নিয়ে পালাল,বিয়ে করল ।

বিয়ের নবম মাসের মাথায় মুর্শেদ বুঝল তার অভাবী মা তার দিকে কী সকরুণ চাতক তাকিয়ে আছে । একেকটা দিন যায় আর তার সাথে লতিকার দূরত্ব বাড়তেই থাকে ।

২.
মনোহরণ চপল চরণ আজ মুর্শেদ । বিড়বিড় করে তার মাথার ভেতরে ভেসে ওঠা গানের এক লাইন ভুস করে ভেসে উঠলে আর রক্ষা নাই । সারাবেলা ঐ এক লাইন গাইতে থাকবে সে বেসুরো শব্দে,লয়ে,ছন্দে । লুঙ্গির গিঁট বাঁধতে বাঁধতে,প্রস্রাব করতে করতে বা সে যখন সর্দার বাড়ির পাশের রাস্তা ধরে হনহন করে হাঁটতে থাকে,তখন গুনগুন করে : মনোহরণ চপল চরণ ..

এটুকুই ।

বৈশাখ মাসের গরমে যখন নিজের কাছে নিজেকে শ্মশানের পাশের পোড়া জমিনের কাঠকয়লার মতো গনগন গরম লাগে,ইচ্ছা করে তার সব আলগা পোষাক খুলে হাঁটতে । সে একদিন রাতের বেলা বাথরুমে যাবার পথে লুঙ্গিটা খুলে হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিল । ঘরের মাঝে কলমের কালির মতো অন্ধকার বলে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। নিজেকে মহাপুরুষ লাগছিল ।

ছোটবেলায় শেখা শ্লোক আওড়ানোর চেষ্টা করে নিজেকে অবদমনের জন্য । কাজ হয় না । খুলে ফেলার পর দিগম্বর শরীরে শতপদীর মতো একটা একেঁ বেঁকে কাম খিলখিল করে নাভীর নিচ থেকে নেমে যায় । অচেনা পুরুষ লাগে নিজের,জোয়ান লাগে । মনেই হয় না সে যে ব্যর্থ লতিকার কাছে ।

মুর্শেদ শ্লোক ভুলে গিয়ে অন্ধকার পাশা খেলা রাতে কোমর দুলিয়ে ফিসফিস করে ছন্দে দুলতে থাকে :

আমার শইলডা দেখ
ও মায়ারানি গতর নাচাও,আমার শইলডা নাড়..
ঝুক্কুর ঝুক্কুর ময়মনসিং/আইতে যাইতে কতোদিন ..

সে কবেকার দেখা যাত্রায় স্বাস্থবতী প্রিন্সেস মায়ারানির ঝাঁকি নৃত্যের কথা মনে পড়ে । সে রাতের গহীনে গ্রীন রুমের চাটাইয়ের ফাঁক গলে চোখ রেখে উঁকি দিয়েছিল প্রিন্সেস মায়ারানির পোশাক বদলানোর দৃশ্য যদি দেখা যায় ।

সকালে ঘুম আর ভাঙ্গতে চায় না । চুলার পাশ থেকে নতুন খেজুরের গুড়ের পায়েশের ঘ্রাণ ভেসে আসে । তার ঘুমের কুমকুম আর ভাঙ্গে না । সে টের পায় স্বপ্নে মায়ারানি তার ডাঙ্গর শইলে কোথায় কোথায় যেন হাত রেখে খিলখিল করে উঠছে । সে যাত্রার সেই মাকুন্দা নায়ক শশীকান্ত হয়ে উঠছে,মায়াকে আকঁড়ে ধরছে ।

উদ্ধত হচ্ছে সে,পালোয়ান হয়ে উঠছে সে । সে আগৈলঝাড়া দিঘির মতো ভেসে যায় ভেসে যায় । ঘুম ভাঙ্গলে রান্নার ঘ্রাণে তার খুব অপরাধী লাগে নিজেকে । কুঁকড়ে থাকে লজ্জায় । পাপ পাপ ।

লতিকা ডাক দেয় জোরে । সে বিছানা থেকে উঠে ধড়মড়িয়ে । দরজা খুলে বাইরে একাকী এসে হাঁপায় । নমোপাড়ার নলাদার সাথে দেখা । নলাদা দাঁড়িয়াবাঁধার কোর্ট কাটছে কোদাল দিয়ে;

: কিরে কাইল রাতে বাসায় আছিলি না কি ?
: হুম
: যাত্রার মায়ারানিরে দেখছস?একদম তোর বউয়ের লাহান। বিষয় কি ?

বলে নলাদা খিক খিক করে হাসতে থাকে ।

মুহূর্তে সে ওখান থেকে হনহন করে চলে আসে । মনে হচ্ছে চারপাশের গাছপালা,আগৈলঝাড়া দিঘি,টরকী যাবার ভ্যান,বরবটি ক্ষেত সব যেন তার রাতের পোশাক টেনে ধরছে । খিলখিল করে হাসছে । সে পালাতে চাইছে । দৌড়ের প্রকোপে তার পোশাক খুলে যাচ্ছে । মনে হচ্ছে নলাদা তাকে টেনে ধরছে । কঁকিয়ে উঠছে সে । ব্যথায় তার অবশ হয়ে আসছে । এটা কি স্বপ্ন দৃশ্য নাকি সত্যি?

সে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে সর্দার বাড়ির পাশের রাস্তা ধরে । কে যেন চিৎকার করে ওকে বলছে;

: দৌড়াও কা ও মুর্শেদ ? বাথরুম পাইসে ?

সে জবাব দেয় না । নিজের ছায়ার সাথে সে দৌড়ায়..বড় আম গাছ,বরই গাছ তাকে সাঁ সাঁ করে পাশ কেটে যায় । ঘামতে থাকে সে কতো আগের ভয় পাওয়া কিশোর । মা’র মজাদার সেই বিশাল মলমল রুটিটাকে দেখতে পাচ্ছে,ঘুরছে বনবন।

আশ্চর্য সে তার নিজের ছায়াকে স্বপ্নে পরাজিত করতে পারছে না ।
একেবারেই না ।