লাফ দিন

তানিয়া চক্রবর্তী




শুধু চোখ নয় আর তার ভেতরে যেন ভার্টিগো আছে আপনার, এইভাবে চোখের ওপরের তলা থেকে নীচের তলায় লাফ দিন। স্বপ্নের কারণ কী, রূপক কী, স্লিপ প্যারালাইসিস (যদিও আমি ভুক্তভোগী) ইত্যাদি বহু কিছু খোঁজ করলেই পেয়ে যাবেন আধাআধো বুলিতে। কিন্তু আমি যা বলব তা আমি না বললে কিছুতেই খুঁজেও পাবেন না, কারণ এই প্রত্যেকটা আমাদের আমিরা বিচ্ছিন্ন , নিরুপায় ও স্বপ্নিল। স্বপ্ন বোধহয় ক্ষতিপূরণের একটা বাহানা---সবকিছু যদি জীবন বলেই দেয় তাকে তাক না লাগানোর কোনো ব্যবস্থায় না রাখে তা হলে এত কিছু মৃত্যুকালীন আবিষ্কার হওয়ার পর কেন আমরা জীবন বয়ে নিয়ে বেড়াই! কারণ স্বপ্ন! নচিকেতার সেই গান “স্বপ্ন স্বপ্ন স্বপ্ন/ স্বপ্ন দেখে মন”! আসলেই তাই! স্বপ্নের কোনো সিদ্ধান্ত মূলক কিছুই তো আমরা পাই নি তাই স্বপ্ন এত প্রহেলিকাময় আমাদের কাছে। আচ্ছা স্বপ্ন কে দেখে ? দেখে মন। যে মনের কোনো তল নেই সেই মনের স্বপ্নরাজির তল পাওয়াটাই তো অস্বাভাবিক।

#
আমাদের বিছানায় এসো , বিচ্ছিন্ন করে রাখো
আদরে গুচ্ছিত ফলের মতো নাভিমুখে এসে
আদর ঘনিয়ে মাখোমাখো করো আমাদের চোখ
চোখ থেকে চোখের গুহা
তারপর সে সমস্ত পাওয়া আর না পাওয়ার ভেতরে
সর্পিল গতি মেদিনীর গলিতে কিচকিচে ধুলো এনে
ভরিয়ে দেবে স্বপ্ন জাতক-জাতিকার গাল
আঃ আমাদের চুম্বিত তোড়ায় ভরা দেহ
পেট ফাঁক করে তাকে আলোতে মুড়িয়ে নেব
এভাবে আসুন দেশ গড়ি মনের
যেখানে অপার্থিব ভয় শরীরী নগ্নতার গায়ে
উল্কির মতো ছেয়ে ধরবে শীধু রসের আলো


#
আসুন স্বপ্ন দেখি, জেগে- ঘুমিয়ে, তাড়নায় ভরিয়ে দি স্বপ্নের গোছা গোছা খিদে। আমরা কত জীবন আলোয় ভরিয়ে দিয়েছি স্বপ্নে, ভেঙে দিয়েছি স্বপ্নে। স্বপ্ন সবসময় দেয়ালার মতো নিজেই শিশু।সে শুধু মুক্ত হতে জানে।ঘুমন্ত পক্ষাঘাত স্বপ্নের এক দানবীয় আলেয়া , এক একটা সময় বিশেষত যখন প্রেমের মতো কিছুর ঘন বিচ্ছেদে মাংসের আস্বাদন নিচ্ছিলাম তখন প্রতিরাতে প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মতো রাত তিনটে তে আমার ঘুম ভাঙাত কোনো অবয়বহীন সমাচার।কেঁপে উঠে দেখতাম এ অসাড় দেহ শুধু স্বপ্নের নেশায় আচ্ছন্ন। হেরে যেতে শিখিনি বলে হারের ডঙ্কা শোনার আগেই জেতার শিঙা বাজিয়ে দিতাম। আসলে এই গোটা যাপনটাই বিরাট একটা স্বপ্ন যার পাদদেশে স্বপ্নটাই আসলে হয়ত জেগে থাকা। সে ডানাওলা মেয়ের পিঠে চড়ে কেকের ঘরে জিভ দিতে গেছিলাম।দেখলাম হাত চুড়ি হয়ে গেল।কপাল টিপ আর পা ঘুঙুর ,গলায় ঝিনুক এর মতো মালা, শরীরে চড়াই-উতরাই ,চুলে সমুদ্র , নিজের অজান্তে চারিদিকে বাঁশির শব্দে শরীরের সঙ্গে মন বড় হয়ে গেল। সে কাঁদতে শিখে গেল।শিখে গেল যুঝতে। সে ঘন রাতের মুখহীন শরীর মিথুন দেখল। সে নারী হল। সে নিজেই জন্ম হল। সে আবার দেখল স্বপ্ন তাকে মহাজাগতিক আলোর কাছে লাভা হয়ে কুচিয়ে কুচিয়ে ফেলে দিচ্ছে নগরের কোলে।নগরের কোল থেকে বেরিয়ে এসেছে রাস্তা।সেও এক স্বপ্ন!রাস্তায় রক্তাবৃত দেহ।সেও এক স্বপ্ন!এখানে যা কিছু মুখ থেকে পায়ু অবধি। পায়ু থেকে মুখ অবধি।খাদ্য থেকে বর্জ্য অবধি,সবটা স্বপ্ন!

#
এই গায়ে মেখেছি ভবিষ্যৎ গড়ার অক্ষর
উল্কি দিয়ে দিয়ে আমরা লতাপাতার জন্ম আর
আমাদের আদুরে মৃত্যুর ছবি আঁকছি
আমরা স্বপ্ন আঁকছি!
হ্যাঁ আমি গল্প লিখতে পারি না জানেন! কবিতা লিখেই মনে হয় এক একটা স্বপ্ন লিখে ফেললাম।এত অসম্পূর্ণ, অতৃপ্ত কেবল কবিতাই যা স্বপ্নের বিকল্প হওয়ার দাবি রাখতে পারে। আসলে গল্পে স্থিতি থাকে, শেষ থাকে। আমাদের কোনো শেষ নেই। মৃত্যুতে তো নেইই! আমাদের এক একটা ভরপুর অঙ্গজ জনন আছে।এক স্বপ্ন থেকে আরেক স্বপ্নে ঢুকে পড়ার গল্প, গল্পহীনের গল্প , যে অস্থির যে প্রতিমুহূর্তে পথ বদলায় সেই স্বপ্ন। চোখের দিকে তাকান, যে চোখের দিকে তাকিয়েছেন মুখোমুখি সেটাও আপনারই চোখ, আরও ভেতরে তাকান দেখুন তারারন্ধ্রের আরো ভেতরে, ভালো করে দেখুন যেন কোনো মাতৃগর্ভ, আরও ভাল করে দেখুন যেন সৌরজগৎ। আসলে গোটা এই স্বপ্নটা এই বাস্তবতার মিমিক্রি কিম্বা বাস্তবটাই স্বপ্নের মিমিক্রি। এবার পর্দা নেমে গেল আপনার দেখার পালা শেষ এখানে , এখন আপনি কিম্বা আমি ভেতরে খুলে দেব চোখ। চোখের ওপার দেখবে এপারের মণিকে । এভাবে রুটির উল্টোপিঠের মতো কোটরের তাওয়াতে আপনার জীবনের উপকরণ উল্টেপাল্টে যাচ্ছে। আর তার ওপরে পাহাড়ী ধোঁয়াশার আলো ওটার মানবিক নাম মস্তিষ্ক।ওখানে দলা পাকাচ্ছে পাওয়া না –পাওয়া/ দেখা না-দেখার আয়নারা। এই সারাটা জীবন আর জীবন বহির্ভূত সবটাই স্বপ্ন । দুঃস্বপ্ন নয় গোটাটাই শুধুমাত্র স্বপ্ন।আস্তাবল থেকে গোয়ালঘরে গেলাম,গোয়ালঘর থেকে পাখিরালয়,পাখিরালয় থেকে অভয়ারণ্যে। আমাদের স্বপ্নে রাজকুমাররের মিথুনের পর আমরা জেগে উঠলাম, বাস্তবের বিছানা, দেহ, সম্পর্ক সব আকার থেকে নিরাকার হয়ে গেল। যেন একটা অসম্পূর্ণ মৃত্যুর মধ্যে আবার জীবন ফিরে এল।যে জীবন আসলে একটা কাটাকুটি খেলার ভাগ্য তার স্বপ্ন হল চোরাবালি । আহা দেহ থেকে দেহহীনে পৌঁছে যাচ্ছে রস, মস্তিষ্কপ্রসূত ভাবনায় আমরা কী সাহসী! দাপিয়ে বেড়াই আনাচ-কানাচ । যে সমাজের মাথা-মুণ্ডু আমরা বানিয়ে ডান-বা ধরে ধরে হাঁটছি। সেই সমাজের যে কুঠুরিতে আমরা হতাশা খুলি চেঁচিয়ে সব ভেঙে দিই সেই অকুতোভয় জায়গার আধিপত্য একমাত্র স্বপ্নের। স্বপ্ন আছে বলে আমাদের ভাবনার মুখে বাঁক আসে। আমরা সতর্ক বা অসতর্ক হই। আমরা চমকে চলকে ঘর বদলাই।
সে নিয়ে গেল মায়ার গলিতে
আলো নিজেই আলোর মুখে এসে হেসে উঠল
আমরা ইচ্ছাকৃত সেই রামধনু চোখে কুঠুরিতে ঢুকলাম
পর্দা বন্ধ করে আমরা মৃত্যু চাইলাম মুহূর্তে---
প্রত্যেকটা জাগরণ আসলে প্রতারণা বলে
আমরা শ্মশানে শুদ্ধ হতে এলাম
গুমোট খেয়ে আমরা কলকে ফেলে দিয়েছি গঙ্গায়!
গায়ে এসরেণুর দাগ
ত্বক,বুক, বলয়, কেন্দ্র, রাগ, প্রেম
সব পালিয়ে গেল একটি পুনর্জন্মের অবিকল দায় নিতে,
আমাদের কম্পাসের পিঠে
খেইহীন সমুদ্রে দমের জন্য ভ্রাম্যমাণ এ চেতনাকে
খুন করে চন্দ্রিল ময়দানে এসে বসেছি---
গা থেকে খসিয়ে দিয়েছি ইন্দ্রিয় বোধ
কে তুমি বায়বীয় চেতনানাশকের মতো এসো
প্রেমিক বা স্বামী যে কারোর মতো হয়ে এসো
উল্কির নিশানা বুঝে নিয়ে অসাড় করে এসো
জন্ম দাও স্বপ্নের
পৃথিবীতে এত ধুলো
কেবল অন্ধের স্বপ্নের জীবনে কোনো খেলা নেই ছলের
এসো ঘুম, পর্দা নামাও
পৃথিবীতে ফেরার আগে তোমাকে ভক্ষণ করে
যুদ্ধ জয়ের মীমাংসা সহ্য করি---