একটি ব্যক্তিগত দুঃস্বপ্নচারণ

অনির্বাণ ভট্টাচার্য



(১)

চোখ বুজলেই জামরুলগাছটা স্বপ্নে আসে। হাত ধরে গোল হয়ে ঘোরে একটা ছোট চুলের মেয়ে। শ্যামলা। টাইটেল হালদার। আমার সমস্ত সমস্ত স্বপ্নকে কাউন্টারব্যালেন্স করার জন্য একটা দুঃস্বপ্ন ওঁত পেতে বসে থাকে। মাচার ওপর থেকে। বাঘটাকে গল্পের প্রয়োজনে প্রত্যেকটা রাতে আলাদা আলাদা ভাবে মরতে হয়। বাঘটাও জানে। কিছু বলতে পারে না। নিয়মমাফিক আসতে হয় রোজ। সিনেমা প্যারাডাইসো। আলফ্রেডো। জীবনে একটা সময় আসে, যখন কিছু বলা আর না’বলার কোনও তফাত থাকেনা। সুনার অর লেটার। স্কুলে ঢোকার ইট সুরকির রাস্তা। কে আগে যাবে, কে আগে। ঠোঁট ফেটে লাগোয়া একটা কি দুটো দাঁতও। হাসপাতালটাকে গত জন্মের ঘোলাটে আবছা বাড়ির মতো দেখতে। দোতলা স্কুলের ছাদ থেকে দেখা যেত। অদ্ভুত সাদা। তিনতলা। ঠোঁটে স্টিচ। গিয়েলো সিনেমার নায়িকাদের মতো সিস্টার। জাম্প কাট। ড্রয়িং কম্পিটিশন। হেডমাস্টার অনেকক্ষণ ঝুঁকে ছবিটাকে দেখছিলেন। একজন ফুচকাওলার পাশে একদল ছেলেমেয়ে। নীচে একরাশ লাল কাদামাখা কিছু একটা পড়ে আছে। বলতে পারিনি কিছু। এক্সিডেন্টালি কিভাবে লাল রঙের শিশিটা উল্টে গেছিল কষ্ট করে শেষ করা ছবিটায়। লাল কাদামাখা। হ্যাঁ, ওরকমই একটা কিছু হয়ে গেছিল জায়গাটায়। পরেরদিন স্কুলের লনে সিঁড়ি থেকে তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে পড়ে গেল অনিন্দ্য। কান দিয়ে রক্ত পড়ছিল। ঠোঁট নাড়াচ্ছিল। ওকে আর দেখতে পাইনি তারপর। কাউন্টারব্যালেন্স। কাদামাখা। লাল। চোখ বুজলে এখনো জামরুলগাছটাকে দেখি। চোখ খুললে হারায়। যখন আমি চোখ বুজি, সমস্ত পৃথিবীটা মরে যায়, চোখ খুললেই আবার জ্যান্ত। সিলভিয়া প্লাথ। সেই স্বপ্নের নারী। ভুল। অন্তত এইক্ষেত্রে। এখানে তো চোখ বুজলেই সিনেমা প্যারাডাইসো হয়ে যায় পৃথিবীটা। আর খুললে লেভিয়াথান।
অশ্বত্থ গাছটা ছাদে চুমু খেয়ে যেত। ছাদ। পার্টিশন। যেকোনো ভাগে যাওয়ার কোনও বাধা নেই। সীমান্ত বলতে ডালের বড়ি। ওটা পেরনো যেত। দুদিকে হাই ভোল্টেজ পোস্ট। ডেঞ্জার। কবে শেষ মেন্টেনেন্স হয়েছে কেউ জানে না। ঘুড়ি আটকে। পড়শির ছুটকিদির বিয়ে। বাঁ কানের নীচে একটা তিল। আর ডান পায়ের কড়ে আঙ্গুলের পাশে। পিটি করত। দেখেছিলাম। দৌড়ে ফার্স্ট। ছেলেদের হারাত। সেই ওরই বিয়ে। ঠিকঠাক। দুদিন আগে ছেলেটা ঝুলে পড়ল। কোনও নোট নেই। ছুটকিদির বিয়েটা হবে না। ঘুড়িটার সমান্তরালে জানলায় বসান ছুটকিদির মুখ। অভিমান নেই। তবে ঘুড়ির বর্ডারলাইনের সঙ্গে ছুটকিদির মুখটা তো ম্যাচ করছে না। কেমন যেন ত্রিকোণাকার। ল্যাম্পপোস্ট। কার ভোঁকাট্টা কে, কে জানে। কারেন্ট থাকত না, থাকলেও মরবিড একটা মফস্বল পাড়া। টিমটিমে আলো। বল হরি। কোন ঘরে গো। ঠাকুমার জিজ্ঞাসা শ্মশানযাত্রীদের। আমি সেই ঘরটাকে দেখতে পেতাম। শুতে যাওয়ার আগে ভাবতাম। খোলা ছাদে। মশারী নেই। তারা, আকাশ। আমি সেই ঘরটাকে ভাবছি। ড্রিম ইনকিউবেশন। বছর তেত্রিশ। হাই পাওয়ায়ের চশমা ছিল। বোধহয় মেয়ে আছে একটা। বউটা আঁচল খসে পড়ছে। চোখে জল টল নেই। মেয়েটা বুকের নরমে বাবার মুখ খুঁজছে। কালি নেই চোখে। আগের রাতে বেশ ঘুমিয়েছে তো। জানবে কিকরে হঠাৎ এরম হবে। নাহলে তো জড়িয়ে বাপী বলে ...। দুরের আত্মীয়, পরশীদের অনেকে কাঁদছে। অদ্ভুত ব্যাপার, এর মধ্যে আমিও আছি। ছবি তুলছি। পরপর। আর, লোকটার বাবা নেই। বুড়ো দাদুটা বেঁচে আছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে যে কি খিস্তি ...। আর তখনই তারা খসতে দেখে বোন ডেকে তোলে। ‘দাদাভাই, কেন খসে ওরা?’ কেন খসে? মেয়েটা ওর মায়ের নরম বুকে উত্তর পায়নি। আমি সহোদরার নরম হাতে খুঁজতে চেষ্টা করি। তারপর পকেট থেকে মানতের ফুলগুলো বের করি। ঈশান কোণের পাঁচিলের দিকে তাকিয়ে ভেতরটা হুহু করে ওঠে। একটা ছায়ার মতো। বাতিল কাঠের ঘোড়া। আমার ছিল। বোনের খেলা হয়ে যাওয়ার পর এখন আর ঠিকমত নড়তেও পারে না। ফেলে রাখা। বাকীটুকু রাত ওর পিঠে বসে কাটিয়ে দিই। মশা। হাওয়া নেই। তবু, উড়তে তো পারি। ওই আমার পেগাসাস। সাদা ঘোড়া। লুসিড ড্রিমস। ভ্যানিলা রঙের আকাশ। চোখ খোলো। ওপেন ইওর আইজ। তুমি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো? নীচে রাস্তায় খই। ‘আই রিমেমবার্ড। সামবডি ডায়েড। ইট ওয়াজ মি’ ...
কাল্লু বলে কুকুরটা মরে গেল হঠাৎ। দুপুর। একটু এগিয়েই ঢালু চালার বাড়ি। সাহেবদা। টকটকে গোলাপি গায়ের রঙ। চিৎকার। ‘কাল্লু মরেছে, কাল্লু মরেছে’। দোতলা থেকে দুবার চোখে চোখ। সাহেবদা চুপ করে গেল। স্কুলের ভ্যান চালাত। কোলে করে ওঠাত ভ্যানে। দুই ভাই। মন্টুদা একদিন চলে গেল। বাবলুদা কয়েকদিন পর। তখন মনে হত ক্রিকেটে আউট হওয়ার মতই চলে যেতে হয়। ফিরে আসার জন্যই হয়ত। লাল্টু। একটু তোতলাত। দুজনে একই পজিশনে খেলতাম। ওর বাবাও হঠাৎ। সিলিং থেকে। লাল্টু নির্বিকার। পরেরদিন থেকেই একইরকম কথা আটকাত। হাসত। তবে গোল মিস করার পর অনেকক্ষণ বারের দিকে তাকিয়ে থাকত। যেখানে জালগুলো ঝোলে। তখন ভুলটা ভাঙল। ক্রিকেট না, ক্রিকেট না। এটা লাইফ। এখানে কেউ পরের ম্যাচে ফেরে না। একটা শরীর। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পোকা। পচন। দেয়ালের সঙ্গে কথোপকথন। মুলহল্যান্ডের রাস্তা। নীল চুলের মহিলা। সাইলেন্সিও ...। সাইলেন্সিও...। আর ভাবতে পারিনা। যাই হোক, যেকথা হচ্ছিল। সাহেবদা। কাল্লু। পরের দিন ওদের রাস্তায় একটা ছাগলকে বাইকের ধাক্কা। শিংদুটোয় রক্ত। তুষারকাকা আসত। না, রোববারের বই পড়েছে বলে না, এমনিই। ঠাকুমার সঙ্গে বছর তিনেক ছোট। বিয়ে করেনি। লোকে বলত কিছু। তবু আসত। কাকী। একবারই দেখা। ঘর থেকে বেরতেন না সচরাচর। হাতে সারাক্ষণ ক্রুশ। উল। সোয়েটার। মুখে অস্বাভাবিক মা মা পেলবতা। চশমা। স্পেলবাউন্ড। ইংগ্রিড বার্গম্যান। চলে গেলেন হঠাৎ। তুষারকাকা বছরখানেক পর। জণ্ডিস পেকে গেছিল। তার পরেও ঠাকুমা গ্রিল ধরে অনেকদিন দাঁড়িয়ে থাকত। দুই ছেলে। দুর্ধর্ষ একটা হেড করার পর পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল। ‘তোর হবে, খেলে যা’। আমার হয়নি কিছু, অন্তত ফুটবলটা। তবে বাপ্পাদার হয়েছিল। কেরোসিন খেয়ে। ওই তো বড়। আগে ওই যাবে। হাসপাতালে তিনদিন পর। ছোটটাও গেছিল, কিভাবে মনে পড়ছে না। একটা পরিবার। দু বছরের ভেতর। স্মৃতি। সময়। গলে গলে পড়া। ঘড়ি। পিঁপড়ে। স্পেলবাউন্ড। দালি। ড্রিম সিকুয়েন্স। মৃত্যুরও। যার শুরুটা কাল্লুকে দিয়ে। ‘কাল্লু মরেছে’। সাহেবদার চিৎকার। আমি ওই দুপুরটা ভুলতে পারিনা ...
খোলা উঠোন। তুলসী গাছ। একটা খয়েরী বেড়াল ঘুমিয়ে। ওকে জেগে থাকতে দেখেছি খুব কম। খেতে চাইতও না বেশী। লোহার সিঁড়ি। ঘোরানো। উঠে গিয়ে পাশের একতলা ছাদ। অজস্ত বিষ্ঠা পাঁচিলে। পাশে কাঁটাগাছের ঝোপ। অন্ধকার। তবু ওখানেই, ওই ছাদ ঘেঁষেই এক নারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম। তখন না। ওই বাড়ি ছেড়ে দিলাম যখন, তার পর। সেই যে ড্রিম ইনকিউবেশন। মিলিয়ে দেখেছি। অন্তত এক্ষেত্রে খাটেনি। সাইড ভিউ। লম্বাটে মুখ। সরু চিবুক। চুল ঈষৎ ঢেউ খেলা। খোলা। ‘কালো দরজা খুলে বাইরে তুমি এলে’। কী করব? কোথায় যাব? যখন কোনও উত্তর পাইনা। তখন তার কাছে যাই। সে শুধু তাকায়। আমি উত্তর পেয়ে যাই। মনে আছে ছাদের ঠিক ওই জায়গাটাই মরে যাওয়া মানুষদের দেখতে পেত এক পড়শি কাকিমা, যেখানে আমার নারী দাঁড়িয়ে থাকে। ‘সেই বাড়ির নেই ঠিকানা, শুধু অজানা লাল সুরকির পথ শূন্যে দেয় পাড়ি’। লোহার ঘোরানো সিঁড়ি না। আমি জ্যাকবের মই বেয়ে ওই পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়াই। ‘তুমি যদি মরতে ভয় পাও, তাহলে শয়তান তোমায় ছিঁড়ে খাবে। আর যদি শান্তি খুঁজে পাও, সে-ই ফরিস্তার মতো এসে দাঁড়াবে। তোমাকে মুক্ত করতে’। আমি তো হাত বাড়িয়েই আছি। আসবে না?
নির্মাল্য আসেনি তারপর। তবে কোপাই থেকে মিলিয়ে যাওয়ার সতেরোটা বছর পরও ও আমার সঙ্গেই আছে। ও আমার জীবন নাইয়া, আমি ‘চিলেকোঠার সেপাই’। ওর টকটকে ফর্সা মুখে ‘সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মতো ঠোঁট’। ওর ডাকনাম কি রঞ্জু ছিল? আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার ‘দৃষ্টির ঘষায় রঞ্জুর গলার আঙ্গুলের নীল দাগ মুছে যায় এবং এমনকি তার বয়সও বাড়তে থাকে। বয়সের সঙ্গে পাল্টায় চেহারা, শরীরের গড়ন’। চোখের নীচে একটা গভীর ক্ষত দেখতে পাই ওর। আমি নীল ভেলভেট দিয়ে ঢেকে রাখি ওকে। স্বপ্নে ক্যান্ডি রঙের জোকারটা পা টিপে টিপে ঘরে আসে। ইন ড্রিমস। রয় অরবিসনের গলায়। বলে ঘুমিয়ে পড়ো। ‘ঘুমোলেই সব ঠিক হয়ে যাবে’। ঠাকুমার একটা কুলুঙ্গি ছিল। তার পাশে দেয়ালে দাদুর মাথার দাগ লেগে একটা তেল রঙের প্যাস্টেল ছবি। ওগুলো ফিরে আসছে। ভেঙ্গে পড়া চাঙ্গরগুলো ওপরে উঠে লেগে যাচ্ছে ছাদের সঙ্গে। পার্টিশন করা ঘরগুলো আবার আগের মতো। একান্নজন একসাথে ভাত খাচ্ছে। জ্যোতি বসু, লোডশেডিং, ইয়েলেতসিন, কারফিউ, কবুতর যাহ্‌ যাহ্‌ যাহ্‌ ...। কোথায় শরিকি বিবাদ? সবাই যেন ঘুম থেকে উঠল। সব ঠিক হয়ে গেছে। অথবা শান্তিচুক্তি। ‘আই ড্রিমড দা ওয়ার্ল্ড হ্যাড অল এগ্রিড টু পুট অ্যান এন্ড টু ওয়ার’। ওই কুলুঙ্গির ভেতর তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। আমার নীল ডায়েরীটা পাই কিনা। সুকুমার রায়ের কবিতার পেছনেই প্রথম স্বমেহনের মুহূর্তের খুঁটিনাটি লেখা ছিল। লুকিয়ে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম কোনও অসুখ। কাউকে বলতে পারিনি, ভয়ে। ‘কাচের তলায়, ওপারে, মরা কাক জমছে’ ... ‘হারবার্টকাকা, পুজোর ঘরে, ডায়রি, হারবার্ট...কাকা কালীর ফটোর পেছনে...ডায়রি’। ডায়রিটা পাইনি। নির্মাল্যও আসেনি ফিরে। ক্লাস টেনে দশ দিন পর কোপাইএর কোনও এক বাঁক থেকে ওর শরীর পাওয়া যায়। ও আসেনি। তবে নতুন কেনা সাইকেলটা বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল কেউ। কুঁজো হয়ে হাঁটাচলা করা ওর ঠাকুমা দরজা আগলে পাড়া মাত করে কাঁদলেন, নিমাই, ও নিমাই। ‘ওর জন্য মাগুর মাছের ঝোল রাঁধলাম, জ্বর থেকে উঠি আজ পথ্যি করবে, ছেলেটা আমার এক লোকমা ভাত মুখে দিতি পারলে না গো’। না, নির্মাল্যকে বৃদ্ধা নিমাই বলে ডাকতেন। ওর নাম তো রঞ্জু ছিল না। তবে, হতেই পারত ...
(২)
লেখাটায় যারা টুইস্ট আশা করবেন, পাবেন না। কারণ স্বপ্নটা আমার শেষ হয়নি। ওই অব্দি দেখে ভেঙ্গে গেছিল। তবে আমি নিশ্চিত, আরেকটু ঘুমোলেই নির্মাল্যর চোখের নীচ থেকে ওই দাগটাকে আলাদা করতে পারতাম। চাঙ্গরগুলোকে ছাদের সঙ্গে জোড়া লাগাতে পারতাম। সেপারেশনে যাওয়া মুখগুলোকে শেকড়ের উপর আবার একসঙ্গে এনে বলতে পারতাম, কেমন আছো মানুষেরা? ঠকঠক করে কাঁপা ছাগলটাকে একহাতে রেখে অন্যহাতে বাইকওলার দুটো দাঁত ভেঙ্গে দিয়ে বলতে পারতাম, এত তাড়া?

হল না কিছুই। আবার কি ফেরার চেষ্টা করব? ভাবব আবার ওই ছাদের কোণটার কথা? শ্যামলা তন্বী ছোট চুলের মেয়েটির কথা? উইল অল রিসিউম এগেইন? যেখানে শেষ হয়েছিল সেখান থেকেই?

‘না এখন ঘুমোনো দরকার। কাল ভোরে উঠতে হবে’।