একটি তিন পর্বের স্বপন

আনিফ রুবেদ



স্বপ্নের প্রথম পর্ব

লোকটা যখন দুটাকার নোটটা ড্রেন থেকে তুলে তার ঝোলাতে মুছল আর ঝোলাতেই ঢোকাল তখন তাকে প্রথম লক্ষ করি। ঐ সময় আমি মেস থেকে বের হচ্ছিলাম। লোকটি যে বাড়ির সামনের ড্রেন থেকে তুলে নেয় সে বাসার দ্বিতীয় তলার দিকে একবার তাকায়। আমিও লোকটির তাকানো মোতাবেক তাকাই এবং একজন সুন্দরি মেয়েকে দেখতে পাই। মেয়েটিও লোকটির দিকে তাকায় এবং আমি তাকানোর সময় মেয়েটি একটু কেবল হাসির আভাস মুখে রেখে ভেতরে ঢুকে যায়। এবার লোকটি আমার দিকে যখন এগিয়ে আসে। তখন আমি চিন্তা করছিলাম, লোকটা টাকাটা কুড়িয়ে পেল, না উপরের মেয়েটি উপর থেকে নিচে ভিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু লোকটা যখন আমার কাছে এসেও টাকা চাইল তখন বুঝলাম উপর থেকে নিচে ভিক্ষাই দেয়া হয়েছে। আমি যখন মানিব্যাগে হাত দিতে যায় তখন মেয়েটিকে আবার বারান্দায় দেখতে পায় এবং মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করার সময় আবার ভেতরে চলে যায়। মেয়েটি এত বেশি সুন্দর যে তাকে দেখলে অস্বস্তি লাগে। যত দ্রুত সম্ভব তার দিক হতে চোখ টেনে নিই। সে যেখানে থাকে সেখানে আমি থাকি না, তার দিকে বেশিবার তাকাতে পারি না আবার না তাকাতেও পারি না। মানিব্যাগ বের করে তার ভেতর সর্বোচ্চ নিম্নমানের পাঁচ টাকার নোট পেলাম। এর চেয়ে নিম্নমানের কোনো নোট বা কয়েন নেই মানিব্যাগে। আমি তাকে পাঁচ টাকা দিয়ে তিন টাকা ফেরত দিতে বলি। লোকটি তখন আমার দিকে তাকায় এবং সে ড্রেনের জলে ভেজা দুটাকার নোটটা আমাকে দেয় এবং আরো এক টাকা নাই বলে জানায়। তার কাছে আরো একটাকা নেই ব্যাপারটা জেনে নিয়ে ভেজা দুটাকা মানিব্যাগে রাখব না প্যান্টের পকেটে রাখব ভাবতে গিয়ে টাকার গায়ে একটা মোবাইল নাম্বার লেখা দেখতে পাই। তাতে ঐ মেয়েটির নাম লেখা রয়েছে। এও লেখা আছে - যদি কোনোদিন টাকা মিনহাজের হাতে পড়ে তবে সে যেন আমাকে ফোন দেয় এই নম্বরে।

স্বপ্নের দ্বিতীয় পর্ব

তার সাথে ফোনে তুমুল কথা শুরু হয়। উপরোক্ত বিষয়ে একদিন তাকে প্রশ্ন করেছিলাম। সে শুধু বলেছিল, কোনো একদিন ওসব নিয়ে কথা বলা যাবে। তারপর দুবছর পার হয়েছে। মেয়েটির সাথে আমার বিয়ে হল। মধুরাত। বাসর ঘরে। সেসব কথা সে আমাকে আজ বলবে। আমিই তাকে আগে প্রশ্ন করলাম - তুমি যে ভিখারীর হাতে ওভাবে টাকাতে ফোন নম্বর লিখে এভাবে আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলে সেটাতো অন্যকারো হাতেও পড়তে পারত, আর সবাইই মিনহাজ বলে তোমাকে ফোন করতে পারত। সে বলল - এমনটা কখনোই হতো না। যে ভিখারিটি তুমি দেখেছিলে তিনি ভিখারী নন। তিনি আমার মামা। আমি বিস্ময়ে তার দিকে তাকাই। সে আবার বলা শুরু করল - আমার বাবা মা মারা যাবার পর আমি মামার কাছেই বড় হয়েছি। তিনি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন এবং চিন্তিত থাকতেন। তার ধারাবাহিকতায় একদিন জিজ্ঞাসা করলেন - তোমার পছন্দের কোনো ছেলে আছে? আমি বললাম - আছে। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন - কতদিন থেকে সম্পর্ক? আমাকেতো কখনও বলনি। আমি বললাম - তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার কথা শুনে তিনি বিস্মিত হলেন। আমি বললাম - তাকে শুধু আমি চিনি, কোনোদিন কথা বলিনি, মনে হয় সে ভাল ছেলে। তাকে বিয়ে করতে পারলেই সবকিছু স্বার্থক হবে। আমি তোমাকে চিনিয়ে দিয়েছিলাম। তোমার সাথে আমার বিয়েপূর্ব একটা সম্পর্ক যাতে তৈরি হতে পারে সে চিন্তা তিনি করছিলেন। ভিখারি সেজে তোমার হাতে আমার ফোননম্বরটা দেবার মজাদার বুদ্ধিটা মামাই বের করেছিলেন। এতদূর বলার পর সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আমার বুকে এতদিন পরে পাওয়ার সুখে। মেয়েটি হাসিতে ভেঙ্গে পড়ে আমার বুকে এতদিন পর পেয়েছে তার দুখে। যে লোকটা আমার হাতে তারামিনকে তুলে দিয়েছে তার চেহারা মনে পড়ল। আমার হাতে তুলে দেবার সময় তার কান্না মনে পড়ল। আমি ভাবছি আমি পৃথিবীর সেরা বীর।

স্বপ্নের শেষ পর্ব

আরো তিন বছর ধরে স্বপ্নটি দেখেছি আমি। স্বপ্নটি আমার পূরণ হয়নি। আজ সত্যি সত্যি মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে। আমি যখন স্বপ্নে প্রেম করতাম তার সাথে সে তখন সত্যি প্রেম করতো যার সাথে, তার সাথেই বিয়ে হচ্ছে তার। আমি কাঁদছি ভেতর থেকে দারুণভাবে। আর ভাবছি - এটাও কী স্বপ্ন নয়? হ্যাঁ, এটিও একটি স্বপ্ন যা আগামী সমগ্র জীবন ধরে দেখতে হবে আমাকে।