অ্যালবেয়ার কামুর আক্রমণাত্মক গোলরক্ষা

শুদ্ধসত্ত্ব

গোলরক্ষক কথাটা খুব খাটো কথা! গোল রক্ষক কথাটার মধ্যে বোঝা যায় না যে ওর একটা আক্রমণ আছে। খেলাটা দেখলে এ শব্দটা অকুলান বোধ হতে বাধ্য। গোল রক্ষার/ না রক্ষা করতে পারার পরে ওখান থেকেই তো প্রতি-আক্রমণটা শুরু হচ্ছে। মজাটা হচ্ছে এইটা চোখে পড়তে চায় না। আমার উৎকন্ঠা আমাকে ঘিরে রাখে গোল খাবার ভয় হয়ে। অথচ আলবেয়্যার কামু একজন গোলরক্ষক।
"The only way to deal with an unfree world is to become so absolutely free that your very existence is an act of rebellion."
হবে কী হবে না পরের কথা, ভাবখানা দেখতে হচ্ছে! দিদিমা ষাঁড়ের মেরুদণ্ডের উপরের অংশ দিয়ে তৈরী চাবুকে সংসার দাপাচ্ছে। বাসনাতো জন্মাবেই স্বাধীনতার। সেখানেই শেষ না। আমার স্বাধীনতা যেন তোমার চোখে পড়ে। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেব। আমি আছি এইটা এটা-ওটা না, পাতাবাহার গাছ না, হাট্টিমাটিমটিম না। আমি আছিটা একটা বিদ্রোহ।
স্ট্রাইকার আক্রমণাত্মক। উইং দুটোও আক্রমণে যায়। রক্ষণে আসে। মিডফিল্ডে আক্রমণ ও রক্ষণ আছে। ডিফেন্সে রক্ষণ আগের কালে শুধু প্রাসঙ্গিক, এখন তারাও গিয়ে গোল করে আসে কর্নার কী ফ্রী কিক থেকে! গোলকীপার হিগুয়েতা হলে গোলের দিকে দৌড়োনো যায়। কামু হলে একটা সিগারেট ধরিয়ে যক্ষাগ্রস্ত লাঙ-এ ধোঁয়াটা ভরে নিয়ে ফুটবল থেকে নীতিবোধ নিতে হয়।
নীতিবোধ নিলেই একটা মানে খোঁজার প্রবণতা চলে আসে। এই যে জন্মালাম, মানে কি? আমাকে তো কেউ জিজ্ঞেস করে আনেনি। মানে খুঁজতে গেলেই একটা প্রায়ান্ধকার গলি চলে যায়। দু পাশে খাড়া খাড়া বাড়ি। সারি সারি জানলা, বেয়াব্রু, বদরসিকতার মতন কেতরে হাওয়া-বাতাস ঢোকায়। দেওয়ালগুলো এত বেশী উদাসীন যে টিকিটিকিও তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। মানুষ বাঁচে কিসে?
"You will never be happy if you continue to search for what happiness consists of. You will never live if you are looking for the meaning of life."
মাঠটা গোলে দাঁড়ালে সম্পূর্ণ দেখতে পাওয়া যায়। প্যাটার্নটা চোখে পড়ে। অথচ সার্ত্রের তৃতীয় অবস্থানের চেয়ে অন্যরকম। কেন না ওপর থেকে দেখলে তো নিজে দেখার অংশ না। এখানে কিন্তু তা হবে না । নিজেও দেখার অংশ হয়ে যেতে হয়। গোলপোস্টটা আছে যে!
"এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না—
শুধু সুখ চলে যায়,
এমনি মায়ার ছলনা। "
সুখ খুঁজতে গেলেই বাইশটা লোক একটা মাত্র বল নিয়ে মারামারি-কাড়াকাড়ি করে। অথচ বাজারে তো ফুটবল পাওয়া যায় আরো। কিনে আনলেই হয়! কেউ বোঝে না যে এ কী রকম খেলা! যে যারটা নিয়ে খেলছে না, বস্তুত কারোরটা নিয়েই খেলছে না, খেলছে একটা আলাদা কিছু নিয়ে যা কারোর কাছেই শেষত নেই, থাকবেও না। অথচ তারই দখল নিয়ে বাইশটা লোক, রেফারী, লাইন্সম্যান,ফোর্থ রেফারি, ফুটবল স্টেডিয়াম, দর্শক হাজারে-লাখে, সংস্থা, বিজ্ঞাপন এজেন্সি, দেশবাসী, রাষ্ট্রনায়ক সবাই খেলে চলেছে। ব্রহ্মাণ্ডে এমন খেলাও হতে পারে, ভাবা যায়!
দখল করতে গিয়ে ফাউল, ফল্‌স ড্রাইভ, কনুই মারা, বুট দিয়ে হাঁটুতে মেরে চিরজন্মের মতন খেলা ঘুচিয়ে দেওয়া, নিদেনপক্ষে পায়ের পাতাটা থেঁতলে দেওয়া স্পাইক দিয়ে যে অপরাধগুলো সংঘটিত হয়, লাল, হলুদ এ সমস্ত কার্ডে তা কিন্তু ঢাকা যায় না। তার শাস্তি দেওয়া হলেও সেটা আসলে একটা ক্রীম মেখে ফরসা হবার প্রচেষ্টার মতনই ফ্যাকাশে। যে পা, যে হাত, যে মাথা এ কাজ করে তাকে শাস্তি দিতে গেলে তার চৈতন্যকে ধরতে হবে। সে চৈতন্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে কেন? মানুষটা বাড়ি থেকে যতটা পথ এসে স্টাডিয়ামে বা মাঠে পৌঁছেছে খেলতে ততটা পথই তো আসলে সে এগুলোই পেতে পেতে এসেছে। কেউ না কেউ, কোথাও না কোথাও তাকে দিয়েছে এই উপহার, যা বদ একটা গন্ধের মতন। সে সবের শাস্তি যে হয় না বেশীরভাগটাই, সে সব দুনিয়ায় যারা পেল তারা স্বার্থক বলে পরিচিত এ কী সে দেখেনি! তাহলে এখানে কেন অন্যরকম হবে? এরপরে যখন তার পাপবোধ সঞ্জাত হবে অন্যকে মেরে-ধরে তখন তার ছাপ লাগবে অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের। তখন বেদনার জন্ম হলেও হতে পারে। মারাদোনার প্রথম বিশ্বকাপে বিপক্ষের থাইতে পা তুলে দেওয়া বেদনার্ত পা পরের বিশ্বকাপে শিল্প।
"A guilty conscience needs to confess. A work of art is a confession."
অথচ শিল্পী মানেই বেদনার প্রতি শ্রদ্ধাবনত থেকে প্রত্যাহার করে নেবেন এমন হবে না। হতে পারে না। যেখানে জয়-পরাজয়ই একমাত্র মাপকাঠি হয়ে ওঠে, ভাল খেলিয়াও পরাজিতরা দুয়ো পাওয়ার যোগ্য বলে নির্ধারিত সেখানে কেউ না কেউ বলবেই,
"Those who lack the courage will always find a philosophy to justify it."
দাঁতে, নখে ছিঁড়ে খেতে হবে আমাদের। না হলে আমরা উপনিবেশের লোক চিরকাল বিজীত থেকেই যাব। আমরা উপনিবেশ থেকে একদিন উপনিবেশকারী হতে চাই। একেই প্রগতিও বলা চলে। যতদিন না আমাদের উৎপাদিত সব অন্য দেশের বাজারে মূল্য পাচ্ছে ততদিন আমরা সভ্যতার নির্ধারক ফ্যাক্টর হব না। ব্রাজিলের ফুটবলার অন্যদেশের জার্সি পরে খেলে। রপ্তানী শিল্পের চেয়ে বড় আর কিছু নেই। আমদানী ভিখারীর স্বভাব। যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ। প্রতিবেশীকে ঘৃণা করতে চাই। মাঠে এক ইঞ্চিও ছাড়বো না। বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী! ফুটবল মাঠে ফয়সালা হবে ফক্‌ল্যান্ডের। ফয়সালা হবে কালো, বাদামী আর সাদার লড়াই-এর, ফয়সালা হবে উন্নত-উন্নয়নশীল ও অনুন্নত বিশ্বের। সেখানে টাকা থাকলে রেফারী কেনা যাবে, সংস্থা কেনা যাবে, দরকারে দেশ কিনে নেওয়া যেতে পারে। মিলিটারি জুন্টা দরকারে প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশকে আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্যের বিনিময়ে ডালিয়েল পাসারেল্লাদের জন্য উপযুক্ত গোল পার্থক্যে জয়ও কিনে নেবে। দেশের লোক যেন মজে থাকে, মেতে থাকে। দেশের লোক যেন দারিদ্র্য নিয়ে মাথা না ঘামায়। দুর্নীতি, কুশাসন,গুমখুন, ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য নিয়ে না ভাবে। ফুটবলের মাঠে ফুটবল দিয়ে পাশাও খেলা যায়। অন্যায়? অপরাধ? তাহলে বলতে হয়,
"For centuries the death penalty, often accompanied by barbarous refinements, has been trying to hold crime in check; yet crime persists. Why? Because the instincts that are warring in man are not, as the law claims, constant forces in a state of equilibrium."
নীতিবোধ প্রতিরক্ষার ছদ্মবেশ ধরলেও সে একটা আক্রমণ ভিন্ন কিছুই না। আক্রমণের সূচনাবিন্দুতে নির্ধারিত বাঁশী অনেক লক্ষ কোটি বছর আগেই বেজে গিয়েছে। খেলা চলছে, চলবে।